ভারী কিছু তোলার কথা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চওড়া কাঁধ আর পেশীবহুল পুরুষের ছবি। অন্যদিকে নারীদের ফিটনেস বলতে দীর্ঘদিন ধরেই মনে করা হত হালকা দৌড়ানো, হাঁটা বা ট্রেডমিলে সময় কাটানো। তবে সম্প্রতি ওয়েলনেস ট্রেন্ডে নারীদের ভারোত্তোলন বা ওয়েট লিফটিং অনেক জনপ্রিয়। এ নিয়ে ওয়েলনেস ইনফ্লুয়েন্সাররা বেশ সরব। বিভিন্ন গবেষণায় উঠেছে এসেছে যে, নারীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ওয়েট লিফটিং অনেক বেশি কার্যকর ব্যায়াম। অনেক চিকিৎসক দাবি করেছেন যে, নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য (বিশেষ করে হাড় ও হরমোন) এর চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারে না!
ওজন তুললে হাড় ও পেশীতে ঠিক কী ঘটে?
ভারোত্তোলন কিন্তু একই সঙ্গে রেজিস্ট্যান্স ও স্ট্রেংথ ট্রেনিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখন আমাদের শরীরে ঠিক কী ঘটে যখন আমরা একটি রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধকের বিরুদ্ধে পেশীকে সক্রিয় করি, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বুঝে নেওয়া যাক। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ভারোত্তোলন হলো এমন ধরনের ব্যায়াম যেখানে শরীরের পেশীগুলোকে কোনো বাহ্যিক ভার (ডাম্বেল, কেটেলবেল, বারবেল) কিংবা নিজস্ব শরীরের ওজনের (পুশ-আপ বা স্কোয়াট) বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়।
জার্নাল অব স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং রিসার্চ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমরা যখন কোনো ওজন তুলি, তখন পেশীর তন্তুতে ‘মাইক্রো-টিয়ার’ হয়। পরবর্তীতে সঠিক বিশ্রাম ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমে শরীর যখন এই পেশীতন্তুগুলোকে মেরামত করে, তখন পেশীগুলো পূর্বের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
শারীরিক পরিশ্রম কীভাবে হাড়ে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন (এসিএসএম)-এর ২০০৪ সালের অফিসিয়াল দিকনির্দেশনায় উঠে এসেছে একই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল পরিচিত নিয়ম আছে— ‘উলফ’স ল’। এর মূল কথা হলো, হাড়ের ওপর যখন কোনো যান্ত্রিক চাপ বা ভার প্রয়োগ করা হয়, তখন হাড় নিজের সুরক্ষার জন্যই পুনর্গঠিত হতে শুরু করে। এর ফলে হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড়ের ক্ষয় কমায়।
বার্ধক্য প্রতিরোধে ওয়েট লিফটিং
নারীদের জীবনের স্বাভাবিক গতিপথে পেশী ও হাড়ের সুরক্ষায় ভারোত্তোলনের মতো স্ট্রেংথ ট্রেনিং বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। গবেষক ই. ভোলপি ও তার সহযোগীদের গবেষণা অনুযায়ী, ৩০ বছর বয়সের পর থেকে সাধারণত মানবদেহে প্রতি দশকে ৩ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত স্বাভাবিক পেশী ক্ষয় হতে পারে। ওয়েট লিফটিং পেশীর এই স্বাভাবিক ক্ষয় রোধ করে শরীরকে সবল রাখতে সাহায্য করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ বা অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই নারী। আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন (এসিএসএম)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং হাড়ের ঘনত্ব রক্ষা করে এবং বৃদ্ধ বয়সে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে।
এছাড়া পেশী শরীরের রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে না, এটি শরীরের বৃহত্তম বিপাকীয় অঙ্গ হিসেবেও কাজ করে। যখন একজন নারীর শরীরে পেশীর পরিমাণ বজায় থাকে, তখন তার বিশ্রামের সময়ের বিপাক হার বাড়ে। বিজ্ঞানী ডব্লিউ. এল. ওয়েস্টকটের একাধিক গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং রক্তের শর্করার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।
মেনোপজের জটিলতা প্রতিরোধে
নারীদের জীবনের একটি বিশেষ শারীরিক রূপান্তর ঘটে পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের (রজোনিবৃত্তি) সময়ে। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমতে শুরু করে। ইস্ট্রোজেন হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখা এবং পেশী মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাড়ের সার্বিক যত্ন ও অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন (এনওএফ)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, ইস্ট্রোজেনের ক্ষয়ের ফলে মেনোপজের প্রথম ৫-৭ বছরে একজন নারী তার মোট হাড়ের ঘনত্বের প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে ওয়েট লিফটিং হাড়ের জন্য এক ধরনের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা হরমোনজনিত ক্ষয়কে কিছুটা ধীর করে দেয়। ফলে বার্ধক্যে পা পিছলে পড়ে যাওয়া কিংবা হাড় ভাঙার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
প্রচলিত কুসংস্কার বনাম বিজ্ঞান
নারীদের ওয়েট লিফটিং নিয়ে ফিটনেস জগতে কিছু বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে নিরসন করা প্রয়োজন।
নারীদের ওয়েট লিফটিং নিয়ে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। ছবি: ম্যাগনেফিক
প্রথমত, অনেকেই মনে করেন ওজন তুললে নারীরা পুরুষদের মতো পেশীবহুল ও চওড়া হয়ে যাবেন। তবে বিজ্ঞানী জে. ই. আর্প ও তার সহযোগীদের গবেষণা বলছে, পেশীর বৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে টেস্টোস্টেরন নামক হরমোনের ওপর। একজন নারীর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের তুলনায় অনেক কম (প্রায় ১০ থেকে ১৫ গুণ কম) টেস্টোস্টেরন থাকে। ফলে একজন নারী প্রফেশনাল অ্যানাবলিক স্টেরয়েড বা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অ্যাথলেটিক প্রশিক্ষণ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে সাধারণ ওয়েট লিফটিং করে পুরুষের মতো পেশীবহুল ফিগার তৈরি করতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, ভারী ওজন তোলা বিপজ্জনক কি না— এই প্রশ্নে জে. ডব্লিউ. কিও ও পি. ডব্লিউ. উইনউডের পর্যালোচনা বলা হয়েছে, সঠিক কৌশল শেখার পর ধীরে ধীরে ওজন বাড়ানো হলে ওয়েট লিফটিংয়ের আঘাতের হার দৌড়ানো বা অন্যান্য লাফঝাঁপজাতীয় ব্যায়ামের তুলনায় বেশ কম।
তৃতীয়ত, বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিমিত রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং ঋতুচক্রের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। তবে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত ফিমেল অ্যাথলেট ট্রায়াড কোয়ালিশনের সর্বসম্মত ঘোষণা অনুযায়ী, মাত্রাতিরিক্ত ব্যায়াম এবং যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ক্যালরি গ্রহণ না করা হয়, তবে হাইপোথ্যালামিক অ্যামেনোরিয়া বা ঋতুস্রাব বন্ধ হতে পারে। এর জন্য ভারোত্তোলন দায়ী নয়। দায়ী মারাত্মক পুষ্টির ঘাটতি।