আমের মৌসুম শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তারপরও নওগাঁর আমের বাজার মাতিয়ে রেখেছে কাটিমন। নতুন এই জাতের আমের সরবরাহ থাকায় জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার সাপাহারে কৃষক ও ক্রেতাদের আনাগোনা এখনও চলছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, সাপাহার বাজারজুড়ে কাটিমন আমের ভালো সরবরাহ রয়েছে। কৃষকরা বাগানের তাজা কাটিমন আম ভ্যানে করে নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে মৌসুম শেষ হয়ে গেলেও নতুন আম পেয়ে ক্রেতারাও খুশি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাটিমনের কারণে বাজারের চিত্র অনেকটা মূল আমের মৌসুমের মতোই। মৌসুমি আমের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর সাধারণত বাজারে আমের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে কাটিমন সেই চিত্র বদলে দিয়েছে।
সাধারণত আগাম জাত হিসেবে বাজারে আসে আম্রপালি। এরপর নাক ফজলি, হিমসাগর, হাড়িভাঙা, গোবিন্দভোগ, ল্যাংড়া ও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম বাজারে ওঠে। জুনের শেষ দিকে নিয়মিত মৌসুম শেষ হলে আমের সরবরাহও কমে যায়। তবে কাটিমনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বছরে একাধিকবার ফলন দেওয়ার সক্ষমতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নওগাঁয় বাণিজ্যিকভাবে এই জাতের চাষ দ্রুত বাড়ছে।
পাঁচ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন হারিপুরের কৃষক মনসুর আলী। তিনি বলেন, “প্রতি মণ আমের দাম আট হাজার টাকা। তবে ব্যবসায়ীরা ছয় হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব দিয়েছেন। সাত হাজার টাকা হলে বিক্রি করব। আমের মানভেদে দাম কম-বেশি হয়।”
বালুকাডাঙ্গার কৃষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “এ সময় অন্য জাতের আম বাজারে না থাকায় কাটিমনের চাহিদা বেশি। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে।”
স্থানীয় ক্রেতা প্রদীপ বলেন, “অফ-সিজনে কাটিমনের এত বড় বাজার আগে কখনো দেনিনি। এ সময় সাধারণত বাজারে আম পাওয়া যায় না। সুন্দর আম দেখে বাড়ির জন্য কিনতে ইচ্ছা হচ্ছে।”
সরগডাঙ্গার কৃষক হাফিজুর রহমান ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রতি মণ আম প্রায় ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, “বাগানের গাছগুলোতে এখনও মুকুল রয়েছে। ফলে নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর পর্যন্ত আমের সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে প্রায় সারা বছরই এই জাতের আম পাওয়া সম্ভব।”
হাফিজুর রহমান বলেন, “২০১৯ সালে অনলাইনে একটি ভিডিও দেখে কাটিমন চাষে আগ্রহী হই। ২০২১ সালে গাছে প্রথম ফলন আসে। বর্তমানে বাগানে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করে।”
নিশ্চিন্তপুরের কৃষক নাসির উদ্দিনও ২০১৯ সালে ইউটিউবে ভিডিও দেখে কাটিমনের চারা রোপণ করেন। গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে চাষ করলেও এ বছর তা বাড়িয়ে ৩৭ বিঘা করেছেন তিনি। বাগানে নয়জন মানুষের কাজ করেন।
নাসির উদ্দিন বলেন, “কাটিমন চাষ লাভজনক হলেও এতে প্রচুর পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ রয়েছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আম ছয় হাজার ৩০০ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।”
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী সমর সাহা বলেন, “অফ-সিজনে কাটিমন আমের এমন জমজমাট বেচাকেনা আগে দেখিনি। অন্য জাতের আমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না থাকায় কাটিমন তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। পোরশা, ধামইরহাট ও পত্নীতলাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও কাটিমন আম নিয়ে সাপাহার বাজারে আসছেন।”
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সাপাহারের পাশাপাশি নওগাঁর পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, রাণীনগরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কাটিমনের চাষ বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাপলা খাতুন বলেন, “বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হচ্ছে। আগে এর পরিমাণ ছিল ৯৭ হেক্টর। কৃষকরা ভালো দাম পাওয়ায় এ জাতের আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কাটিমন সারা বছর ফলন দিতে পারে বলে মৌসুম ছাড়াও ভোক্তারা আম খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।”
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, “জেলায় কাটিমন চাষের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২৫৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ১৯০ হেক্টর।”
তিনি বলেন, “চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কাটিমন গাছ থেকে বছরে দুই থেকে তিনবার আম সংগ্রহ করা যায়। এটিই অন্যান্য জাতের সঙ্গে কাটিমনের মূল পার্থক্য। অন্য অধিকাংশ জাতের নির্দিষ্ট একটি মৌসুমে ফলন হলেও কাটিমন একাধিকবার ফলন দেয়।”
রেজাউল করিম আরও বলেন, কাটিমনের স্বাদ প্রচলিত জাতগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। তবে মৌসুমের বাইরে বাজারে পাওয়া যাওয়ায় এর বাজার সম্ভাবনা বেড়েছে। নওগাঁ থেকে অন্যান্য কৃষিপণ্যের পাশাপাশি কাটিমন আমও বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতি হেক্টরে কাটিমনের ফলন হচ্ছে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টন। ২৫৫ হেক্টর জমি থেকে মোট ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রতি কেজি কাটিমন আম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গড় দাম প্রায় ১৮০ টাকা। চলতি দাম ও সম্ভাব্য উৎপাদনের ভিত্তিতে এ বছর কাটিমন আমের আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।
সাধারণত জুনের মধ্যেই দেশে আমের মূল মৌসুম শেষ হয়ে যায়। তবে আশ্বিনা, বারি-৪, গৌড়মতি ও কাটিমনের মতো দেরিতে ফলন দেওয়া জাতগুলো এরপরও বাজারে আসে।
মৌসুমি আমের বাজার যখন অনেকটাই স্তিমিত, তখন কাটিমনের দীর্ঘ সময়ের ফলন নওগাঁর কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভালো দাম, একাধিকবার ফলন এবং সারা বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় জেলার কৃষকেরা এখন ক্রমেই কাটিমন চাষের দিকে ঝুঁকছেন।