অনেকটা সময় ধরেই নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ধরা হয় নিগার সুলতানাকে। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়কও তিনি। তবে এশিয়া কাপে ভরাডুবির পর একই সঙ্গে দলে তার ভূমিকা এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের ভেতর তো বটেই, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেও (বিসিবি) নিগারকে নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল সোনার পদক জিতলেও তার পক্ষে অধিনায়কত্ব ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
এশিয়া কাপে সহজ গ্রুপ থেকে টেনেটুনে সেমিফাইনালে গেলেও ভারতের কাছে হারার আগেই হেরে বসে বাংলাদেশ। এই ম্যাচের পর তাই কাঠগড়ায় নিগার, যাকে নিয়ে অতীতেও সমালোচনা হয়েছে বেশ। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্রমেই সিনিয়রদের একে একে দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। যে তালিকায় আছেন সালমা খাতুন, রুমানা আহমেদ, জাহানারা ইসলামের মতো নারী ক্রিকেটের শুরুর দিকের তারকারা। তবে দল ভালো করছিল, নিগারও ব্যাট হাতে পারফর্ম করছিলেন বলে বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয়নি।
তবে নিগারের বিরুদ্ধে গ্রুপিং বা ‘দলের মধ্যে দল’ করার গুঞ্জন নানা সময়ই ছিল। সাবেক ক্রিকেটারদের কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, নিগার তার পছন্দের কয়েকজন ক্রিকেটারকে নিয়ে গ্রুপিং করেন দলের মধ্যে। সেই খেলোয়াড়েরা বাজে খেললেও দল থেকে বাদ পড়েন না। আর যারা দলাদলির মধ্যে নেই, তারা এক-দুই ম্যাচ খারাপ করলেই দলের বাইরে চলে যান।
২০১৮ এশিয়া কাপজয়ী দলের সদস্য রুমানা ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছেন অভিমানে। বাংলাদেশ দল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন। চরচাকে তিনি বলেছেন ড্রেসিংরুমের অস্বস্তিকর পরিবেশের কথা, “দলের অনেকের সঙ্গেই তো কথা হয়। কয়েকজন নিজে থেকেই যোগাযোগ করে। এমন অনেক কথাই কানে আসে, যা প্রকাশ্যে বলার মতো না।
একটা পেশাদার দল এভাবে চলতে পারে না। বোর্ড তো তাদের সব সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা চায় তাই দিচ্ছে। তবুও উন্নতি নেই। কেন নেই, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় হয়েছে।”
বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, নিগারকে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে সরিয়ে দেওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়ানডেতে এখনো তার গুরুত্ব রয়েছে বলে আপাতত তিনি টিকে যাচ্ছেন। তবে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ব্যাট হাতে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং দলের ভেতরে নানা অসন্তোষের খবরে বিরক্ত কয়েকজন পরিচালক। এশিয়ান গেমসেই তাই শেষ সুযোগ পাচ্ছেন নিগার।নেতা হিসেবে নিগার বছর দুয়েক আগেও ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম।
তবে সময় যত গড়িয়েছে, তিনি সেই জায়গা থেকে ক্রমেই সরে গেছেন। দলের তরুণ ক্রিকেটারদের চাপের মুখে আগলে রাখার বদলে তিনি মাঠের মধ্যে এমনভাবে আক্রমণ করে বসেন, তাতে সেই ক্রিকেটারের পক্ষে সেরাটা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্ট্যাম্প মাইকের কল্যাণে প্রায়ই উইকেটের পেছন থেকে নিগারকে তার সতীর্থদের এমনভাবে আক্রমণ করে কথা বলতে শোনা যায়, যা একটি দলের জন্য ভালো বার্তা বহন করে না।
নিগারকে প্রায়ই দেখা যায় কেবল সতীর্থদের ক্যাচ মিস, ফিল্ডিং মিস বা একটা বাউন্ডারি হজমে চিৎকার করে শাসন করতে। অথচ একজন আদর্শ নেতার কাজ কঠিন সময়েই দলের অন্যদের পিঠ চাপড়ে দেওয়া।
অধিনায়ক নিগার কেমন, এই প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার চরচাকে বলেন, “আপনি দলের অন্যদেরও জিজ্ঞাসা করেন, এভাবে বকাবকি কারোরই ভালো লাগে না। অধিনায়ক হয়েছে বলে কেউ যদি অন্যদের সারাক্ষণ শাসনের মধ্যে রাখে আর বকাবকি করে, সেটা তো ভালো লাগার মতো না। জুনিয়র মেয়েরা ভুল করলে ওদের সাহস না দিয়ে ক্যাপ্টেন উল্টা বকা দেয়। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করে না। এই দলের অনেকেই ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বাধ্য না হলে কথা বলতে চায় না। কিছু হলেই দল থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেয়।”
নিগার যদি সত্যিই এভাবে কাউকে স্রেফ তার বাধ্যগত না হওয়ার কারণে দল থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়ে থাকেন আর সেটার প্রমাণ মেলে, তাহলে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগও আসতে পারে। কারণ একজন অধিনায়ক কোনো ক্রিকেটারকেই এভাবে বাদ দেওয়ার ভয় দেখাতে পারেন না। তাছাড়া একটা দল থেকে বাদ পড়ার আতঙ্ক নিয়ে সেই ক্রিকেটার কতটা ভালো করতে পারবেন, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চরচার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল নিগার সুলতানার সঙ্গে। এই প্রতিবেদক তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করলেও তিনি ধরেননি। টেক্সট মেসেজ দিলে তিনি উত্তর লিখে পাঠান ‘‘ নো কমেন্টস”।
এমন স্পর্শকাতর কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্নে বিসিবির উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবু গত শনিবার বলেছেন, “মাত্র এশিয়া কাপ শেষ হলো। ওরা ওখান থেকে সরাসরি এশিয়ান গেমসে খেলতে যাবে। যেহেতু দল আগেই দেওয়া হয়ে গেছে, অধিনায়কও চূড়ান্ত, তাই এখন এই দলটাই খেলতে যাবে। আর এই মুহূর্তে যে সব কথা শোনা যাচ্ছে, আমরাও শুনেছি। তবে টুর্নামেন্টের পরে আমরা এগুলো নিয়ে আলোচনা করব।”
এশিয়া কাপে বাংলাদেশ চার ম্যাচের মধ্যে যে দুটিতে জেতে, সেগুলো ছিল দুর্বল ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে। বোলাররা কিছুটা মান রাখলেও নিগারসহ ব্যাটসম্যানরা গোটা আসরেই ছিলেন অসফল। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১৫০ রান তাড়া করতে নেমে যেভাবে ব্যাট করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা, সেটাই যেন দলের সামর্থ্যের প্রতীকী রূপ ছিল।
বিসিবি তাই এশিয়ান গেমস পর্যন্ত নিগার এবং বাংলাদেশ দলকে সুযোগ দিলেও সেটা কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে নারী ক্রিকেটে নিগারের একচেটিয়া আধিপত্যের শেষের শুরু হতে পারে এই টুর্নামেন্ট দিয়েই।