ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ায় চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আক্রান্ত হওয়ার সাথে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। বন্দরনগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বও সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
এর সাথে অনিয়মিত বৃষ্টি, বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অধিক ঘনবসতির বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বর্ষাকালে সৃষ্ট জলাবদ্ধতাও এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরিতে সহায়তা করছে।
এতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে এ জ্বর নিয়ে সচেতন হওয়ার সাথে মশার প্রজননস্থান নির্মূল করা এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত সময় এবং প্রতি বছরই এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সবচেয়ে বাড়ে। গত দুই বছরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও চলতি বছরে সেপ্টেম্বরের অর্ধেকেরও কম সময়ে আক্রান্ত রোগী গত বছরের একই সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। সে কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রার্দুভাব বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে সরকারি হিসেবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ৮৪৭ জন। এ সময়ে মারা গেছে সাতজন রোগী।
অথচ গত বছরের পুরো সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ৯৩৫ জন এবং মারা যায় ৪ জন। ২০২৪ সালে ৯০৭জন আক্রান্ত এবং মারা গেছে ১১জন। অপর দিকে ২০২৩ সালে সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৯২জন এবং মারা যায় ২১ জন।
চলতি বছরে সেপ্টেম্বর শেষে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আগের দুই বছরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল র্সাজন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান চরচাকে বলেন, “জেলায় চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এ জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু রোগীর জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে সিট বাড়ানোর পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলায় চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে মোট ২ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৫৩৬ এবং আগস্ট মাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ২০২ জন। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে মোট মারা গেছে ১২ জন।
গত বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৬৪জন। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৪৩০, আগস্টে ৯৩৫, সেপ্টেম্বরে ৯৩৫ এবং অক্টোবরে ৯৯০জন আক্রান্ত ছিল। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ২৭ জন।
২০২৪ সালে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মোট মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৫ জন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই বছর ১৪ হাজার ৮৭ জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃত্যু হয় সর্বোচ্চ ১০৭ জনের।
ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে র্দীঘদিন ধরে গবেষণার সাথে যুক্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ চরচাকে বলেন, “আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস এডিস মশা প্রজননের পিক সিজন। এটি নভেম্বর পর্যন্তও হয়ে থাকে। এ সময় সাধারণ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্তও হন সবচেয়ে বেশি। চলতি সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।”
তার মতে, এ সময়ে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বাতাসের আর্দ্রতা বাড়তি থাকা এবং দিনের তাপমাত্রার তারতম্য এডিস মশার বেশি করে বংশ বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার পরেই চট্টগ্রাম সবচেয়ে বড় শহর। চট্টগ্রাম শহরে যত্রতত্র অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজ হচ্ছে, যেখানে সেখানে রাস্তা কাটা হচ্ছে। বৃষ্টির ফলে ওইসব জায়গায় পানি জমে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়ছে। এছাড়া বিভিন্ন বাসা-বাড়ির খোলা জায়গা ও গাছের টবেও জমে থাকা পানিতে মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে।
ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতার বিকল্প নেই মন্তব্য করে ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, “সরকারি ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির বাইরে সাধারণ মানুষকে এ নিয়ে সচেতন হতে হবে। নিজের আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার সাথে নিজেদের সতর্কও হতে হবে। বাসাবাড়ি বা আশপাশে জমানো পানি তিন দিনের বেশি জমিয়ে রাখা যাবে না। নালা-নর্দমা পরিচ্ছন্ন রাখার সাথে এডিস মশার প্রজননস্থল নিশ্চিহ্ন করতে হবে।”
ডেঙ্গু থেকে প্রতিকারের উপায় নিয়ে তিনি বলেন, “ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা নিয়েও মানুষকে সচেতন হতে হবে। অনেকেই সিরিয়াস পর্যায়ে গেলে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যান। পিক সিজনের কয়েক মাসে এ নিয়ে জ্বর হলে ঘরে বসে থাকা যাবে না। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।”
তার মতে, ডেঙ্গুতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আক্রান্ত হলেও ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশু, ষাট বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক লোক এবং ডায়াবেটিস, ক্যানসার, লিভার রোগে আক্রান্ত রোগীদের এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাদের জ্বর হলে অবশ্যই দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
শুধু জেলা হিসেবে নয়, চট্টগ্রাম বিভাগেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনে ২ হাজার ৭৩৩ জন, গত আগস্ট মাসে ২ হাজার ৮৭৫ জন এবং জুলাই মাসে ১ হাজার ৬৮৫জন আক্রান্ত হয়েছেন। এই সাড়ে আট মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৫ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ হাজার ৬৩৩ জন আক্রান্ত এবং মারা গেছেন ৩১ জন। ২০২৪ সালে ১৫ হাজার ৪৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যু হয় ৫৫ জনের। এছাড়া ২০২৩ সালে ৪৪ হাজার ৫১৫ জন আক্রান্তের মধ্যে মধ্যে মারা গেছে ১২৬ জন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বী চরচাকে বলেন, “ডেঙ্গুতে ঢাকার পরে চট্টগ্রামে প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রামে ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মিলেছিল। সে সময় মৃত্যুও ছিল সবচেয়ে বেশি। গত দুই বছরের তুলনায় এবারে পিক সিজনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতেও বেড অনুযায়ী রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।”
এ কারণে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতলগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শহরের তুলনায় উপজেলা পর্যায়ে যাতে ডেঙ্গুর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যায় সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শহরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে। এ ছাড়া ডেঙ্গু আরও খারাপ অবস্থার দিকে গেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর রেলওয়ে হাসপাতাল ও সিটি করপোরেশন পরিচালিত মেমন হাসপাতালকে বিশেষায়িত হিসেবে ব্যবহার করা হবে।”
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে করা এক জরিপে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। জরিপে মোট ৯টি ওর্য়াডকে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উচ্চ ঝুঁকির্পূণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জরিপে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে বৈরি আবহাওয়ার কারণে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি এ বছর বেশি হতে পারে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তাকে চিঠিও দেয়া হয়।
ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বলেন, “এবারে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া বেশিরভাগই নারী। ডেঙ্গু মা ও শিশুর জন্য খুবই ঝুঁকির্পূণ। সাধারণত জ্বর হলে তাদের অবহেলা করা হয়। এ সময়ে জ্বর হলেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে, হাসপাতালে যেতে হবে।”
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক বলেন, “আমরা সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে এবং চিকিৎসা সেবাও অব্যাহত আছে। সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করছি।”
এ দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নির্মূলে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। জেলা প্রশাসনও নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।