আমানত ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক গ্রুপে নিজেদের আটকে থাকা টাকা ফেরত পেতে আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন তারা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আন্দোলন শুরুর পাশাপাশি তারা দেশের বিভিন্ন জেলায়ও কমিটি গঠনের প্রস্তাব করছেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় ব্যাংক থেকে নিজেদের আমানতের টাকা তুলতে পারছেন না তারা। কেউ ছোট অঙ্কের টাকা তুলতেও ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন, আবার বড় অঙ্কের আমানত আটকে থাকায় অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেকেই। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করছেন তারা।
অবশ্য ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, বড় অঙ্কের চেকের ক্ষেত্রে ব্যাংককে তারল্য ব্যবস্থাপনার কথা ভাবতে হলেও, ছোট অঙ্কের চেকের টাকা উত্তোলনে তেমন সমস্যা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত ফেব্রুয়ারিতে ন্যাশনাল ব্যাংককে তারল্য সংকট ব্যবস্থাপনায় জরুরি সহায়তা হিসেবে এক হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। তবে এখন থেকে ন্যাশনাল ব্যাংক বা এমন তারল্য সংকটে পড়া কোনো ব্যাংককেই আর নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আন্দোলনের ডাক ফেসবুকে
সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট বা কমেন্টে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষোভ ও হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। গ্রাহকদের একটি অংশ এরই মধ্যে আন্দোলনে নামার প্রস্তাব দিয়েছে। সুজন সরকার নামের একজন গ্রাহক ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আন্দোলন শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার সঙ্গে একমত পোষণ করে মেঘলা ও আওলাদ হোসেনসহ কয়েকজন গ্রাহক ‘কঠোরভাবে মাঠে নামার’ কথা বলেছেন। ইব্রাহিম খন্দকার নামে একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মহিউদ্দিন নামে এক গ্রাহক ফেসবুকে লিখেছেন, “সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক উদ্যোগ না থাকায় দেশের সব জেলায় কমিটি গঠন করে লাগাতার আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।”
মো. নুরুজ্জামান নামে এক গ্রাহক ব্যাংকের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। দিলীপ নামে আরেকজন আমানতকারীদের সুরক্ষাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রবাসী গ্রাহকরা সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা জানাচ্ছেন। সাকিব স্বাধীন নামে এক প্রবাসী গ্রাহক লিখেছেন, “বিদেশে থাকার কারণে সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিতে পারছি না। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে দেশে থাকা অর্থ সরিয়ে নিব, নাগরিকত্ব ত্যাগ করব এবং রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করব।”
তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ না এলে আন্দোলন করেও ফল পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। আবদুস শহীদ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, “ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে সমাধানের উদ্যোগ না নিলে কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা কঠোর অবস্থান না নিলে আন্দোলনের ফল শূন্য হতে পারে।”
নিজেদের একটা অংশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও অবশ্য ক্ষোভ রয়েছে আমানতকারীদের অনেকের। ডা. মুশফিকুর রহমান এক মন্তব্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছেন।
গ্রাহকদের সব অভিযোগ টাকা তোলা নিয়ে
গ্রাহকদের আন্দোলনের প্রস্তুতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে বারবার উঠে আসছে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে ভোগান্তির কথা। মো. লোকমান নামে এক গ্রাহক চরচাকে বলেছেন, “ন্যাশনাল ব্যাংকে আমার এক কোটি ৭০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যাংকে যোগাযোগ করেও তুলতে পারছি না।”
ফিরোজ আল মামুন নামে আরেক গ্রাহক বলেন, “২০২০ সালে তিনি ব্যাংকটিতে ৫ লাখ টাকা রেখেছিলেন। সেই টাকা ফেরত পাব কি না, তা বুঝতে পারছি না।”
শুধু বড় অংকের টাকাই নয়, অনেকে জানিয়েছেন, দিনে দুই হাজার টাকার বেশি তুলতে পারছেন না তারা। অনেকের অভিযোগ, মাত্র ১০ হাজার টাকা তুলতে দিনের পর দিন ব্যাংকে ঘুরতে হচ্ছে। অনেকে এক টাকাও তুলতে পারেননি বলে জানাচ্ছেন। এটিএম বুথ থেকেও নিয়মিত টাকা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখার এক গ্রাহক সাইদুল ইসলাম বলেন, “প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে স্যালারি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছি।” সাইদুলের অভিযোগ, “বেতন জমা হওয়ার পরও অনেক সময় এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারিনি। অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকেও সীমিত পরিমাণ টাকা তোলা গেছে।”
হোসাইন সাজ্জাদ নামে আরেক গ্রাহক বলেন, “সম্প্রতি ১৫ হাজার টাকার একটি চেক ক্যাশ করার জন্য গুলশান শাখায় গিয়ে দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে দীর্ঘ বাগবিতণ্ডার পর টাকা তুলতে পেয়েছি।”
তবে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আহমেদ চরচাকে বলেন, “ন্যাশনাল ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা তুলতে দিচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। তবে বড় অঙ্কের টাকা একসঙ্গে তুলতে চাইলে ব্যাংককে তারল্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।” তার দাবি, “ছোট অঙ্কের টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের সমস্যা নেই।”
এক হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা
তারল্য সংকট সামাল দিতে সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংককে এক হাজার কোটি টাকার জরুরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৯০ দিনের জন্য ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ডিমান্ড প্রমিসরি বা ডিপি নোটের বিপরীতে এই অর্থ দেওয়া হয়। এর মধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২৫০ কোটি টাকা এবং এর চার দিন পর বাকি ৭৫০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। মূলত আমানতকারীদের টাকা তোলার চাপ সামাল দিতেই এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আহমেদ অবশ্য বলেন, “প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকের জন্য এক হাজার কোটি টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। মূলত আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনে সহায়তার জন্যই এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে এই সহায়তার খবর প্রকাশ্যে আসার পর উল্টো ব্যাংকে টাকা তোলার চাপ বেড়েছে।” তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, “আমরা ধীরে ধীরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছি।”
ন্যাশনাল ব্যাংকের এই দশা কেন?
ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক হলেও কয়েক বছর ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন ও পুনর্গঠন করা হলেও ব্যাংকটির আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদেও গত কয়েক বছরে একাধিক পরিবর্তন এসেছে। শাহ সৈয়দ আবদুল বারী ২০২১ সালের এপ্রিলে এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। এরপর ডিএমডি সৈয়দ রইস উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি মো. তৌহিদুল আলম খান এমডি হিসেবে যোগ দেন। তিনি পদত্যাগ করেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। এরপর ২০২৫ সালের ৭ জুলাই আদিল চৌধুরী এমডি হিসেবে যোগ দেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে তিনি পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে ইমরান আহমেদ ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের ৫৩৯তম বোর্ড সভায় অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গত ১৩ আগস্ট ব্যাংকের ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভাতেও তিনি সভাপতিত্ব করেন।
প্রশাসনে এত বদলের পরও ব্যাংকটির আর্থিক সংকট কাটছে না। ন্যাশনাল ব্যাংকের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো- বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়। এর সঙ্গে বড় প্রভিশন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট তো আছেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা।
বিপুল খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট মিলিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি বেশ নাজুক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক হাজার কোটি টাকার সহায়তা তাৎক্ষণিক নগদ সংকট সামাল দিতে কিছুটা সহায়তা করলেও, দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন শক্তিশালী করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
আর সহায়তা করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তারা ন্যাশনাল ব্যাংক বা এমন কোনো ব্যাংককেই আর তারল্য সহায়তা দেবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নিয়ে কোনো ব্যাংকই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। ন্যাশনাল ব্যাংককে খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে জোর দিতে হবে, যাতে আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়।”
তারল্য সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে ব্যাপারে আরিফ হোসেন খান বলেন, “শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকই নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর কোনো ব্যাংকে তারল্য সহায়তা করবে না। যদি কোনো ব্যাংকের সমস্যা হয়, তাহলে শেয়ারহোল্ডারদের নিজেদের অর্থ দিয়ে তারল্য সংকট মেটাতে হবে।”