অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের জন্য শিশুর মৃত্যুর তথ্য গোপন করে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে।
এমন অভিযোগ এর আগেও বীর উত্তম সিআর দত্ত রোডের হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল।
রক্তে সুগার কমে যাওয়া ও উচ্চ ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর ৯ মাস বয়সী শিশু আয়ান আব্দুল্লাহকে পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কনসালটেন্ট ডা. মো. আতিকুর রহমানের অধীনে হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল শিশুটি।
গতকাল রোববার হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, সোমবার শিশুটিকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া হবে। তবে রোববার হঠাৎ রাত ৯টা ১৭ মিনিটের দিকে জরুরি ডেকে নিয়ে স্বজনদের জানানো হয়, শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া প্রয়োজন। এ সময় স্বজনরা জোর করে পিআইসিইউতে ঢুকে শিশুটির নিথর দেহ দেখতে পান। তখন শিশুটির দেহও শক্ত ছিল। এমন একটি ভিডিও এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। রোববার মধ্যরাতে এক যুবক ফেসবুক লাইভে এসে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন।
শিশু আয়ানের স্বজনদের দাবি, শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়ে শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তথ্য গোপন রেখে চিকিৎসার নামে দুই লাখ টাকার বেশি বিল আদায় করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
স্বজনদের অভিযোগ, যখন তারা জোর করে পিআইসিইউতে ঢুকেন তখন সেখানে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। কেবল এক-দুইজন আয়া প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি শিশু রোগীর দায়িত্বে ছিলেন।
চিকিৎসকের চরম অবহেলার অভিযোগ তুলে আয়ানের মা সুমাইয়া রহমান বলেন, ‘‘আমার বাচ্চার পেট ফুলে গেছে, সারা শরীরে নীল নীল ছোপ ছোপ, মুখ একদম কালো—মনে হয় যেন শরীর থেকে কেউ রক্ত চুষে নিয়েছে। একটা বাচ্চা যদি মাত্রই শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়, তাৎক্ষণিকভাবে তার শরীর কখনোই এমন হতে পারে না। আমার বাচ্চা অনেক আগেই মারা গেছে। চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার কারণেই আমার সন্তানকে হারিয়েছি।’’
আয়ানের নানা আসিফ হাসান বলেন, ‘‘হাসপাতালে দুই লাখ টাকার বেশি বিল করা হয়েছে, কিন্তু পিআইসিইউতে কোনো ডাক্তার ছিল না। শুধু একটা আয়া আর নার্স ছিল। শত ডাকাডাকি করলেও কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলেনি।’’
এছাড়া প্রতিবাদ করায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন বহিরাগত ডেকে স্বজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, কলার ধরে মারধরের চেষ্টা চালায় এবং ‘কথা বললে ছিঁড়ে ফেলব’ বলে ধমক দেয় বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা।
গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার হাসপাতালের
হাসপাতালের দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুল হক দাবি করেন, ‘‘রাত ৮টা পর্যন্ত শিশুটির অবস্থা স্বাভাবিক ছিল। রাত ৯টার দিকে হঠাৎ তার শ্বাসকষ্ট বা গ্যাসপিং রেসপিরেশন (সাধারণত মস্তিষ্কে অক্সিজেন বা রক্তের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেলে দেখা দেয়) শুরু হয় এবং বাচ্চাটা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে চলে যায়। তখন আমরা প্রথম অবস্থাতেই গিয়ে তাকে আম্বু ব্যাগ ভেন্টিলেশন (জরুরি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস পদ্ধতি) দিলাম, তারপর সিপিআর দিয়েছি।’’
শিশুটির মূল চিকিৎসক মো. আতিকুর রহমান একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘আমি ডিউটি স্টাফদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার আসা লাগবে কি না। তারা বলেছে, না স্যার, তেমন কিছু না, আমরা দেখতেছি।’’
হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম অনিক বলেন, ‘‘আমাদের সেখানে ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার ও নার্স দায়িত্বে থাকেন। চিকিৎসায় কোনো অবহেলা থাকলে তা তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ এসময় শিশুর স্বজনেরা হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তদন্তের কথা বলছে পুলিশ
কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ বলেন, ‘‘জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমরা পদ্মা হাসপাতালে যাই। এখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। শিশুটি ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে সে ভর্তি হয়েছিল।’’
ভভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান এসআই আরিফ।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
আজ সোমবার সকালে পদ্মা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। তিনি বলেন, ‘‘শিশুটির জন্ম থেকেই খাদ্যনালীতে ত্রুটি ছিল। খাদ্যনালীতে কিছু একটা থাকা অবস্থায় শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল (রোববার) রাতে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে শিশুটির সমস্যা শুরু হয়। দায়িত্বরত চিকিৎসক সাথে সাথেই এসেছিল। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ১৫-২০ মিনিট দেরি হয়।’’
এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘‘৩ থেকে ৪ কর্মদিবসের মধ্যে এই প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। আপাতত ম্যাজিস্ট্রেট আর পুলিশ ঘটনা খতিয়ে দেখছেন।’’
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিও নিয়ে ডা. জাহিদ বলেন, ‘‘যেভাবে লাইভ করা হয়েছে, সেই কারণে পিআইসিইউর অন্য বাচ্চারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতো।’’
পদ্মা হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন না
এনআইসিইউ ও পিআইসিইউতে চিকিৎসার নামে জালিয়াতির অভিযোগ পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে এবারই প্রথম নয়। ২০১৬ সালে জান্নাতুল নাঈমা নামে আট বছরের এক শিশুর এনআইসিইউতে মৃত্যুর পরও তথ্য গোপন রেখে স্বজনদের কাছ থেকে চিকিৎসার বিল আদায় করছিল হাসপাতালটি।
তৎকালীন র্যাব-২-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং অননুমোদিত শয্যা পরিচালনা, নিবন্ধনহীন নার্স ও পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকার দায়ে হাসপাতালটিকে সাড়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিল।