লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। গত বৃহস্পতিবার সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলায় পাইপলাইনটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় রিয়াদ।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৬ মাইল। এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। পাইপলাইনটি দিয়ে সৌদির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন করা তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয়। পরে তেল ট্যাংকারে ভরে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনার পর ‘সতর্কতামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা লোহিত সাগর এলাকায় হামলা জোরদার করেছে। সেখানেও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে হুতিরা। এ প্রণালিটিও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া বিশ্ববাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ক্ষয়ক্ষতি কতটা, কবে চালু হবে
হামলায় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কতটা ক্ষতি হয়েছে, এখনো জানা যায়নি। পাইপলাইনটির কার্যক্রম কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সেটা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে।
ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন রয়টার্সকে জানান, মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগেই পাইপলাইনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবের কর্মকর্তারা আল জাজিরাকে জানান, রিয়াদ ও পবিত্র মদিনার কাছে দুটি এলাকায় ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।
এর আগে গত মার্চে ইয়ানবুতে সৌদির জাতীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস ভিত্তিক কোম্পানি আরামকো এবং বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি এক্সন মোবিলের তেল শোধনাগারের কাছে হামলা হয়েছিল। এতে লোহিত সাগরের বন্দরটি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ট্যাংকারে তোলার কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
ওই হামলার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়েনি। কয়েক দিনের মধ্যেই তেল পরিবহন স্বাভাবিক হয়। তবে ওই হামলা ইঙ্গিত দিয়েছিল যে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোগুলো হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়।
কত তেল পরিবহন হয়
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত। এটি ১৯৮১ সালে নির্মাণ করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন হওয়া জ্বালানি তেল পুরো আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়ার জন্য এটি চালু করা হয়। হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করা ছিল এটি চালুর উদ্দেশ্য।
পাইপলাইনটি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা যায়। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ পাইপলাইন ব্যবহার করে জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ অনেকটা কমেছে।
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে। জানুয়ারির পর এই পাইপলাইন দিয়ে আগস্টেই সবচেয়ে কম জ্বালানি পরিবাহিত হয়েছে। হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে লোহিত সাগরের এ পথে জ্বালানি তেল পরিবহন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার পরও বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কল্যাণে পণ্যটির রপ্তানি অব্যাহত রাখার সুযোগ পেয়েছিল।
আল জাজিরার তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব এ পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়েছিল। তখন প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে পরিবহন করা হতো। এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের চার থেকে পাঁচ শতাংশ।
বাজারে প্রভাব কতটা
অত্যন্ত কঠিন একটি সময়ে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের এক-পঞ্চমাংশের বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছিল। এর পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এখন এ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন হচ্ছে। অর্থাৎ জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ পথের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বেছে নিয়েছিল লোহিত সাগরকে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল পাঠাচ্ছিল তারা। যদিও পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া নির্ভর করে পাইপলাইন, মজুতাগার ও তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপর। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এসব অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে।
ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ইয়ানবুতে এরই মধ্যে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তা দিয়ে পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পারবে সৌদি আরব।
এ ছাড়া মিসরের আইন সোখনা ও সিদি কেরিরে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখান থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে আরও কয়েক দিন রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে সৌদি আরব। তাই বলা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি সরকার কিছুটা সময় হাতে পাচ্ছে।
সরবরাহ ও দাম নিয়ে শঙ্কা
তবে বিশ্ব জ্বালানি তেলের মজুত এরই মধ্যে অনেকটা কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার জের ধরে গত মাসে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
আইইএ জানিয়েছে, এ বছর বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। এ পরিমাণ বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ।
সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে। এ কারণে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়েনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ যত কমে আসবে, মজুতও তত কমবে। কারণ, মজুত কমতে থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করবে।
গত জুনে আইইএ সতর্ক করে বলেছিল, কৌশলগত মজুত থেকে এভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ চালু রাখা হলে তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, মজুত অস্বাভাবিক কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
আল জাজিরা বলছে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেই সঙ্গে ইয়ানবু বন্দর ও সেখানকার তেল পরিবহন পথে হামলার হুমকি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকলে, সৌদি আরবের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কমে যাওয়া জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াটাও কঠিন হতে পারে।
হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গাভেকাল রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, হুতিদের ড্রোন হামলার হুমকির কারণে ইয়ানবু কেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ে, তবে তা বিশ্বের জন্য ‘ভয়াবহ বিপর্যয়’ হবে।