ছোটবেলায় আমার বেড়ে ওঠা শহরে। নানু মারা যাবার পর আমার নানা ঢাকা শহরেই ছিলেন। সুতরাং গ্রামের স্মৃতি তেমন একটা মনে নেই আমার। খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের বাংলোয় চুলা আর ওভেন ছিল ইলেকট্রিক। মাটির চুলায় রান্না করার একটা গোপন শখ ছিল আমার। খুব ছোট্টবেলায় বাসা থেকে আলু আর চাল নিয়ে মাঠে গিয়ে আমি আর সুজন বহু চেষ্টা করেছি দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাঁধতে। পারিনি। ছোট ছোট হাঁড়ি–পাতিল থাকলেও ছোট মাটির চুলা কেউ আমাকে বানিয়ে দেয়নি।
স্কুলে থাকতে বছরে একদিন পিকনিক হতো নিউজপ্রিন্ট মিলের সিনিয়র কলোনিতে। ক্লাবের পেছনে মাটির চুলা বানিয়ে রান্না হতো। কেমন স্বপ্নিল একটা ব্যাপার। তবু রান্নার আশেপাশে আমি ঘেষতে পারিনি। স্কুলে থাকতে একবার বান্ধবীদের সাথে পিকনিক করার অনুমতি পেয়েছিলাম বহু কান্নাকাটির পর, তাও আব্বুর কারণে। আম্মি দেবে তো নাই, তাও আবার জাম কালারের শাড়ি পরে পিকনিক।
বাংলোয় ফায়ার প্লেস থাকলেও দেশে এতটা শীত কোনো দিন ছিল না যে, সেটা জ্বালানো হবে। সুইডেন বা আমেরিকায় এখন সব গ্যাসের। কাঠও পাওয়া যায়, তবে এখন ঝামেলা কম করে যত থাকা যায় এই মানসিকতা।
মাস কয়েক আগে বন্ধুরা বসে গল্প করছি একজনের কাব্যিক ব্যাক ইয়ার্ডে। কাব্যিক বলার কারণ তার বাসাটা পুরোনো ইংরেজি সিনেমার মতো। সামনে পেছনে বাগান। চমৎকার পাথরের সারি যে জায়গায়, সেখানে থেরাপিউটিক কোনো সুবিধা আছে কি না দেখতে খালি পায়ে হাঁটতে চেষ্টা করে পায়ে কাঁটা ফুটিয়ে ফেলেছিলাম প্রায়। যাক সেদিন অল্প আলোয় বন্ধুরা বলল, কাঠের চুলায় রান্না করে পিকনিক করি চল।
ক্রিয়েটিভ ফারহাত আপু বললেন, বেশ।
তারপর এই শনিবারে হলো সেই পিকনিক। ইট বসিয়ে চুলা বানিয়ে সমস্ত ফায়ার সেফটি মেনে পিকনিকটা আসলেই যে হবে, সেটা আমার কল্পনায় ছিল না। প্রস্তুতির ছবিগুলো দেখছিলাম। এক প্যাচে শাড়ি, মাথায় খোঁপা করবে সবাই। মনে হচ্ছিল সেই কোন ছোটবেলায় ফিরে গেছি আমি। আব্বুর পেছন পেছন ঘুরছি। আব্বু আমি পিকনিকে যেতে চাই। আম্মি শাড়ি দেবে না, একটু বলে দেন।
কাজের উইকেন্ড ছিল সেদিন। দ্রুত কাজ শেষ করে শাড়ি পরে খোঁপা জাতীয় কিছু মাথায্ বেঁধে হুড়াহুড়ি করতে গিয়ে হাতে ব্যাথা পেয়ে কোনোরকম পৌঁছালাম আপুর বাসায়। গিয়ে দেখি সব পরিরা হাঁটছে। ব্যাক ইয়ার্ডে ইটের চুলায় ডাল আর গরুর মাংস রান্না হচ্ছে। জিলাপি আর বেগুন ভাজা হচ্ছে। একপাশে আম ভর্তা, জাম ভর্তা, চানাচুর মাখা, পেঁয়াজু।
আলো আর ফুলে ভরা একটা বিকেল। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। বন্ধুদের সাথে অনেক ছবি তুললাম। খুন্তি নিয়ে রান্নার ভান করলাম।
সন্ধ্যার পর আমরা খেলেছি। কোনো দল হারার পাত্র না। মা মেয়ে নাচল গানের সাথে। কী অপূর্ব কিছু সময়। আপু আমাকে গাইতে বলেছিলেন লীলাবালি। গাইলাম। চুলায় রান্না করা খাবার খেলাম। পরদিন কাজ না থাকলে আরও অনেকক্ষণ হয়তো বসে থাকতাম। আপুর ফাল্গুন অনুষ্ঠান বা অন্য যেকোনো কিছু মন ছোঁয়া হয়। আর্কিটেক্ট বলেই হয়তো। ব্যস্ত জীবনে এমন আনন্দের ছোঁয়া ঘুরে ঘুরে আসুক সবার।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগো প্রবাসী