চলতি সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের সামনে এমন একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি আশা করছেন ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি তার দল রিপাবলিকান পার্টি জয়লাভ করে, তবে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের একটি ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ বা লভ্যাংশ দেবেন।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রিপাবলিকান দলের জনমত জরিপের সূচক নিচের দিকে নামছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টতই কিছু নগদ অর্থের বিনিময়ে সেই পরিস্থিতির সমাধান খুঁজছেন। তবে তার এই প্রস্তাব ঘোষণার সাথে সাথেই অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি নিজের দলকে জেতানোর জন্য ভোটারদের সরাসরি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু তিনি কি সত্যিই তা করছেন? এর উত্তর বেশ জটিল। একদিকে, নির্বাচনী প্রার্থীরা প্রায়শই ভোটারদের আর্থিক লাভের আশ্বাস দিয়ে করব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয়ে নানা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। উপরন্তু, ট্রাম্প এই লভ্যাংশ কেবল তার নিজের ভোটারদের নয়, বরং প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে দেওয়ার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের বক্তব্যের ধরণ ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি এই অর্থপ্রদানকে সঠিক পক্ষে ভোট দেওয়ার একটি পুরষ্কার বা ইনসেনটিভ হিসেবে চিত্রিত করছেন। নিজের দলের রাজনৈতিক জয় ছাড়া অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিগত বা পলিসিগত লক্ষ্যের সাথে তিনি এই প্রস্তাবকে যুক্ত করেননি। এছাড়া, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংস্থানের কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে নেই এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া তা কার্যকর করার মতো আইনি অধিকারও তাদের নেই।
এই সমস্ত উপাদানকে একসাথে যুক্ত করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপটি একটি সাধারণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে বরং একটি ‘ঘুষ’ বা উৎকোচ প্রদানের প্রচেষ্টার মতোই বেশি দেখাচ্ছে।
মদ্যপান ও ব্যালটের অতীত ইতিহাস
মার্কিন রাজনীতিতে ঘুষের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং অতীতে এটি ছিল আরও অনেক বেশি প্রকাশ্য ও বেপরোয়া।
উপনিবেশিক যুগে এবং পরবর্তীকালে আমেরিকার শুরুর ইতিহাসে নির্বাচনগুলো ছিল সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের (যেহেতু তৎকালীন সময়ে অন্য কারও ভোটাধিকার ছিল না) এক স্থানে সমবেত হওয়ার বিরল এক উপলক্ষ।
এই গণজমায়েতগুলো প্রায়শই মদ-উৎসবের মতো আনন্দঘন উদ্যাপনে পরিণত হতো, যা তৎকালীন দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রার্থীদের মাথায় একটি বুদ্ধি বুদ্ধি এনে দিয়েছিল: হয়তো ভোটারদের মদ খাইয়ে মাতাল করে নিজেদের পক্ষে ভোট আদায় করে নেওয়া সম্ভব!
খোদ জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৫৮ সালে যখন ভার্জিনিয়ার ঔপনিবেশিক আইনসভার একটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন তিনি এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তৎকালীন নথিপত্র থেকে জানা যায়, তিনি ভোটারদের জন্য ৩৫ গ্যালন ওয়াইন, ৪৩ গ্যালন কড়া বিয়ার ও সাইডার এবং অবিশ্বাস্য ৯৫ গ্যালন অ্যালকোহলযুক্ত পাঞ্চ পরিবেশন করেছিলেন। যদিও তিনি তার ক্যাম্পেইন ম্যানেজারকে চিঠি লিখে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিলেন যে তারা হয়ত পর্যাপ্ত পরিমাণ মদ পরিবেশন করতে পারেননি। তবে তার দুশ্চিন্তা ছিল অনর্থক—তিনি বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন।
রাজনীতির এই খেলায় অংশ নিতে অস্বীকার করার ফল হতো নিশ্চিত পরাজয়। ১৭৭৭ সালে ভার্জিনিয়া অ্যাসেম্বলির একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় জেমস ম্যাডিসন ঘোষণা করেছিলেন যে, নির্বাচনী প্রতিযোগিতাটি মদ-চালিত কোনো বিশৃঙ্খলা হওয়ার বদলে ‘নৈতিক ও গণতান্ত্রিক নীতির বিশুদ্ধতা’ প্রতিফলিত করা উচিত। কিন্তু পরিণতিতে তিনি সেই নির্বাচনে হেরে যান—একজন বারটেন্ডারের কাছে, যিনি ভোটারদের জন্য মদের ট্যাপ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
নগদ অর্থ ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
প্রার্থীরা ভোটারদের কেবল অ্যালকোহল দিয়েই প্রলুব্ধ করতেন না, বরং তারা সরাসরি অর্থ বা নগদ টাকাও দিতেন।
মার্কিন ইতিহাসের একটি বড় সময়জুড়ে ভোট প্রদান প্রক্রিয়াটি আজকের মতো গোপন বিষয় ছিল না, যা এই আর্থিক লেনদেনকে আরও উৎসাহিত করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাররা হয় মৌখিকভাবে তাদের পছন্দের কথা জানাতেন, অথবা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধিত্বকারী একটি উজ্জ্বল রঙের টিকিট জারে ফেলে দিতেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্যে ঘটত, যার ফলে যারা ভোট কিনত তারা তাদের বিনিয়োগের সঠিক রিটার্ন বা ফলাফল নিশ্চিত করতে পারত।
কিছু কিছু স্থানে এই চর্চা বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। ১৯১০-এর দশকে ওহিওর অ্যাডামস কাউন্টিতে এক তদন্তে দেখা যায় যে, কিছু কিছু এলাকায় ভোট বিক্রি প্রায় সার্বজনীন রূপ নিয়েছিল। সেখানকার একজন চতুর ভোটার তো একই নির্বাচনে তিনজন ভিন্ন প্রার্থীর কাছে তার ভোট বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তদন্ত শেষ হওয়ার পর যখন দোষীদের সাময়িকভাবে ভোটদানে নিষিদ্ধ করা হয়, তখন দেখা যায় যে কয়েকটি টাউনশিপে নিবন্ধিত কোনো ভোটারই আর অবশিষ্ট ছিলেন না।
উনিশ শতক জুড়ে নির্বাচনী সংস্কারকেরা গোপন ব্যালট ব্যবস্থা চালুর জন্য আন্দোলন করেছিলেন, যাকে আজ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই পরিবর্তনের অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর গতিসম্পন্ন। যদিও অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য ১৯০০ সালের মধ্যেই এই গোপন ব্যালট ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটিয়েছিল, কিন্তু শেষ অঙ্গরাজ্য হিসেবে সাউথ ক্যারোলিনা কেবল ১৯৫০ সালে এসে এই নিয়ম চালু করে।
ভোটের বিনিময়ে নীতি?
গোপন ব্যালট প্রথা চালু হওয়ার ফলে প্রকাশ্যে ভোট কেনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এই প্রাচীন চর্চাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তবে পরবর্তীতে যখন অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন রাজনৈতিক এজেন্ডায় প্রাধান্য পেতে শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ও জটিল কর ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তখন রাজনীতিবিদরা প্রায়শই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীন নগদ অর্থ বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ তুলতে শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি বারাক ওবামার কাছে তার পরাজয়ের জন্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ওবামার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ‘উপহার’ বা সুবিধাগুলোকে দায়ী করেছিলেন।
কিন্তু সরকারি পেনশন সুবিধা বা আয়করের হারে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর কোনো ভোটারকে নির্দিষ্ট পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য এক গ্যালন মদ বা ১০ ডলারের একটি নোট হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। ভোটের বিনিময়ে নীতিগত পরিবর্তনের অফার দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূলসার।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যান্য উপকরণের মতোই এটিকেও বিকৃত ও অপব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটছে কি না, তা নির্ভর করে প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাজনৈতিকভাবে চরম মেরুকৃত একটি দেশে। এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন।
এর অর্থ হলো, ট্রাম্প আবারও গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক ধূসর বা অনিশ্চিত অঞ্চলে প্রবেশ করেছেন এবং মনে হচ্ছে তিনি এর পূর্ণ সুযোগ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি এতে সফল হবেন নাকি ব্যর্থ হবেন, তা এখন শুধুই দেখার বিষয়।