যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে উদারপন্থী (ডেমোক্র্যাট) ও রক্ষণশীল (রিপাবলিকান)—এই দুই ভাগে বিভক্ত একটি দ্বিমুখী লড়াই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাস্তবে সাধারণ আমেরিকান ভোটারদের রাজনৈতিক মতামত এই দুটি নির্ধারিত দলীয় লেবেলের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও বৈচিত্র্যময়। অধিকাংশ ভোটার পুরোপুরি উদারপন্থী কিংবা পুরোপুরি রক্ষণশীল নন। তাদের চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিক মতামতের মধ্যে এমন একটি মিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়, যা বর্তমান আমেরিকার কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নেতার মধ্যে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভোটারদের এই বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘হেটেরোডক্সি’-কে উপেক্ষা করার ফলেই আজকের মার্কিন ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ওপর চরম বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট।
আজকের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রায় সব বিষয়েই উদারপন্থী অবস্থান গ্রহণ করে এবং রিপাবলিকান পার্টি গ্রহণ করে তার ঠিক বিপরীত রক্ষণশীল অবস্থান। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেন এমন ডেমোক্র্যাট কিংবা বন্দুক রাখার অধিকারের বিরোধিতা করেন এমন রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ বর্তমানে বিরল। রাজনৈতিক চিন্তার এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ বা খাঁটি দলীয় আনুগত্য কেবল চার বছরের কলেজ ডিগ্রিধারী নির্দিষ্ট কিছু ভোটারের মধ্যে বেশি দেখা যায়, সাধারণ জনগণের মধ্যে নয়। এই বাস্তবতার কারণেই বর্তমান মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জনসমর্থন প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি এবং রিপাবলিকান পার্টির সমর্থনের হার তার চেয়েও নিচে নেমে গেছে।
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রতীক। ছবি: রয়টার্স
ডেমোক্র্যাট-ঘনিষ্ঠ থিঙ্ক ট্যাংক সার্চলাইট ইনস্টিটিউট ১০০ জন আত্মপরিচয়দানকারী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান ভোটারের মতামত পর্যালোচনা করে একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। এই জরিপে দেখা যায়, যখন ভোটারদের দুটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আলাদাভাবে প্রশ্ন করা হয় যেমন সরকারি স্কুলে সম্মিলিত প্রার্থনা বা প্রার্থনার অনুমতি দেওয়া এবং প্রকাশ্যে গৃহহীনদের তাঁবু খাটিয়ে থাকার অনুমতি দেওয়া—তখন একটি নির্দিষ্ট দলীয় ধারা পরিলক্ষিত হয়। সরকারি স্কুলে প্রার্থনার পক্ষে মূলত রক্ষণশীল বা রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখা যায় এবং প্রার্থনার বিপক্ষে উদারপন্থী বা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন থাকে। অন্যদিকে, গৃহহীনদের জনপরিসরে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পক্ষে রক্ষণশীলদের (২৮%) প্রাধান্য এবং সমর্থন জানানোর পক্ষে উদারপন্থীদের (২৪%) উপস্থিতি দেখা যায়।
কিন্তু যখন এই দুটি ভিন্ন ইস্যুকে একত্রে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন ভোটারদের অবস্থান আর কোনো নির্দিষ্ট একমুখী দলীয় ছকে থাকে না। তখন দেখা যায় যে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেক (৫০%) দলীয় ধারার বাইরে গিয়ে ‘হেটেরোডক্স’ বা মিশ্র মতামত পোষণ করছেন। তারা একটি উদারপন্থী ও একটি রক্ষণশীল অবস্থানকে একসঙ্গে গ্রহণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘স্কুলে প্রার্থনা নিষিদ্ধ করা’ (উদারপন্থী অবস্থান) এবং একই সঙ্গে ‘জনপরিসরে গৃহহীনদের ক্যাম্পিং নিষিদ্ধ করা’ (রক্ষণশীল অবস্থান)—এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত মিশ্র অবস্থানটি জরিপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে উঠে এসেছে (৩০%)।
একই ধরনের মতাদর্শগত বৈচিত্র্য ধরা পড়ে ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের ঋণ মওকুফের ইস্যুতেও। যদিও এই ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ উদারপন্থী (৩৪%) এবং পূর্ণাঙ্গ রক্ষণশীলদের (২৮%) সংখ্যা কিছুটা বেশি, তবুও প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার মিশ্র মতামত ধারণ করেন। তাদের মধ্যে ১৯ শতাংশ ভোটার লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা পরিবর্তনের পক্ষে কিন্তু ঋণ মওকুফের বিপক্ষে, এবং ২০ শতাংশ ভোটার লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার পক্ষে কিন্তু ঋণ মওকুফের সমর্থক।
গত কয়েক দশকে মার্কিন রাজনৈতিক দলগুলো আরও বেশি মেরুকৃত এবং তাদের নিজস্ব আদর্শে কঠোর হয়ে উঠেছে। অতীতে কংগ্রেসে গর্ভপাত-বিরোধী ডেমোক্র্যাট বা গর্ভপাতের অধিকার সমর্থক রিপাবলিকানদের উপস্থিতি দেখা গেলেও আজ তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। এর ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক মিশ্র মতাদর্শের ভোটারদের প্রতিনিয়ত এমন দুটি দলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে, যার কোনোটিই তাদের পূর্ণ চাহিদা বা বিশ্বাস পূরণ করতে পারে না।
আমেরিকানরা বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিষয়ে কীভাবে উদারপন্থী ও রক্ষণশীল মতের মিশ্রণ ঘটায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় স্বাস্থ্যসেবা নীতিতে। ডেমোক্র্যাট ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় স্বাস্থ্যসেবা। সার্চলাইটের জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন সরকারের উচিত বয়স বা আয় নির্বিশেষে সকল নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা, যা একটি উদারপন্থী অবস্থান। তবে একই সঙ্গে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে, প্রতিবন্ধী না হলে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য কাজ করা বা কাজ খোঁজা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, যা একটি রক্ষণশীল নীতি। এই দুই ইস্যুকে যখন একত্রিত করা হয়, তখন ‘সকলের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবীমা এবং কাজের বাধ্যবাধকতা’—এই মিশ্র অবস্থানটি সর্ববৃহৎ একক দল হিসেবে উঠে আসে (৪৩%)। অর্থাৎ, আমেরিকানরা চায় সরকার সবাইকে সাহায্য করুক, কিন্তু তারা এটাও চায় যে সেই সহায়তার পেছনে কিছু শর্ত থাকুক যাতে কাজের উৎসাহ বাড়ে এবং জালিয়াতি বন্ধ হয়।
রিপাবলিকানদের পছন্দের শীর্ষ ইস্যু—সরকারি ব্যয় ও কর নীতির ক্ষেত্রে। ছবি: রয়টার্স
একই চিত্র দেখা যায় রিপাবলিকানদের পছন্দের শীর্ষ ইস্যু—সরকারি ব্যয় ও কর নীতির ক্ষেত্রে। প্রায় ৭৩ শতাংশ আমেরিকান পাবলিক প্রোগ্রামের খরচের জন্য ধনীদের ওপর উচ্চ কর আরোপের পক্ষে, যা উদারপন্থী অবস্থান। কিন্তু ৬৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে, নতুন সরকারি কর্মসূচির অর্থায়নে নতুন কর আরোপ না করে বিদ্যমান অন্যান্য কর্মসূচির বাজেট থেকে অর্থ স্থানান্তর করা উচিত, যা রক্ষণশীল অবস্থান। এখানেও সবচেয়ে বড় গোষ্ঠীটি হলো তাদের, যারা উচ্চ কর এবং বিদ্যমান অর্থ পুনর্বণ্টন দুটিকেই সমর্থন করে (৪২%)। সারসংক্ষেপ হলো: অধিকাংশ আমেরিকান ধনীদের ওপর উচ্চ কর চান, কিন্তু একই সঙ্গে তারা সরকারি ব্যয়ের অপচয় নিয়েও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
জননিরাপত্তা, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও ভোটারদের এই ধরনের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। সার্চলাইট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন ভোটারদের মূলত নয়টি ভিন্ন ক্যাটাগরি বা শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যা নির্দেশ করে যে একক ব্যক্তির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বহুমুখী।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এই বৈচিত্র্যময় মতামতকে ধারণ করার উপযোগী করে গড়ে ওঠেনি। দ্বিদলীয় কাঠামো মানুষকে এমনভাবে দলবদ্ধ হতে বাধ্য করে যা প্রায়শই সাধারণ যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। যেমন—কেন একজন ব্যক্তি যিনি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সমর্থন করেন, তাকে একই সঙ্গে উদার অভিবাসন নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপ এবং ইউক্রেনে মার্কিন সাহায্য বৃদ্ধি করার মতো সমস্ত বিষয়ে একমত হতে হবে? এগুলো প্রতিটি আলাদা বিষয় এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে এমন কোনো নেতার উপস্থিতি নেই যা এই জটিল মতামতকে এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের ব্যবস্থা এর চেয়ে ভিন্ন এবং অধিক কার্যকর হতে পারে। নেদারল্যান্ডস, আইসল্যান্ড, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া বা স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলোতে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা ভোটারদের প্রকৃত মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটায়। সেখানে প্রাণী অধিকার, প্রতিবন্ধীদের অধিকার বা নির্দিষ্ট সামাজিক স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল রয়েছে, যারা সংসদে আসন লাভ করে এবং সরকার গঠনে প্রভাব ফেলে।
আমেরিকায় এই ধরনের নমনীয়তা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, যার মধ্যে প্রধান সংস্কার হতে পারে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ অনুযায়ী আইনসভায় আসন লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দল ৫ শতাংশ ভোট পেলে তারা ৫ শতাংশ আসন পাবে। তবে স্বল্পমেয়াদে এই পরিবর্তন সম্ভব না হলেও প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের উচিত তাদের গত কয়েক দশকের চরম ও আপসহীন অবস্থান থেকে সরে আসা। অতীতে এই দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন মতকে গ্রহণ করে একটি বিস্তৃত জোট বা কোয়ালিশন হিসেবে কাজ করত। আমেরিকান জনগণের জটিল ও বৈচিত্র্যময় মতাদর্শিক বাস্তবতাকে সম্মান জানিয়ে দল দুটির আবারও সেই নমনীয় ও সমন্বিত রাজনৈতিক মডেলে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।