বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেওয়া সংস্থাগুলোর প্রতি মানুষের সমর্থন অব্যাহত থাকলেও বিশ্ব নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকায় মানুষের আস্থা কমেছে বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা বেড়েছে।
রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ৩৪টি দেশে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের ওপর চালাানো এক নতুন জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত ২১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, গত এক বছরে বিশ্ব পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ঠিক আগে জরিপটি প্রকাশ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই জরিপ করা হয়েছে। ওই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় সব দেশের আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করায় এক বছর ধরে চলা অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জরিপের ফলাফল বলছে, বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা বাড়লেও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করার পক্ষে সমর্থন বেড়েছে। জরিপে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছে, নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কিছু বিষয়ে আপস করতে হলেও দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত। গত বছর এ মতের পক্ষে ছিলেন ৫৫ শতাংশ।
তবে অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশা তুলনামূলকভাবে কম। আগামী পাঁচ বছরে নিজেদের দেশের অর্থনীতি উন্নত হবে বলে মনে করেন মাত্র জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ মানুষ।
জরিপের তথ্য বলছে, বিশে দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারত ও চীনেও অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ কমেছে। ভারতে এই হার ২৬ শতাংশ কমে ৫০ শতাংশে এবং চীনে ১৬ শতাংশ কমে ৫৬ শতাংশে নেমেছে।
প্রকাশিত এই জরিপে বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব নিয়ে মানুষের উদ্বেগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার পরিবর্তনও পরিষ্কার হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতৃত্বে কমেছে স্বস্তি
রকফেলার ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা গেছে, বৈশ্বিক নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলক কম স্বস্তির চিত্র পাওয়া গেছে। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির কোনো একটির অংশগ্রহণ ছাড়াই দেশগুলো আন্তর্জাতিকভাবে একসঙ্গে কাজ করবে-এমন ব্যবস্থাকে ৬১ শতাংশ মানুষ সমর্থন করেছে।
বৈশ্বিক নেতৃত্বে কানাডার ভূমিকা নিয়ে ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা স্বস্তি প্রকাশ করেছে। এরপর জাপান ৫৮ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৫৫ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫৫ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ৫৪ শতাংশ এবং জাতিসংঘ ৫২ শতাংশ।
অন্যদিকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ৩৯ শতাংশ এবং চীনের ক্ষেত্রে এই হার ৩৭ শতাংশ। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই হার আরও কম-২৬ শতাংশ।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা চীনের নেতৃত্বে স্বস্তি প্রকাশ করলেও, ধনী দেশগুলোতে এই হার ২৩ শতাংশ। রাশিয়ার ক্ষেত্রে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য ২৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আস্থা বেড়েছে
জরিপে গত বছরের তুলনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে বলে উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি আস্থা ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে।
গত বছরের জরিপে ব্যর্থতার গ্রেড পাওয়া বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ক্ষেত্রেও আস্থা বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতি আস্থা ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশ, আইএমএফের প্রতি ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫১ শতাংশ এবং আইসিসির প্রতি ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশ হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিও আস্থা ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-চীন হুমকি!
নিজেদের দেশকে হিসাবের বাইরে রেখে জরিপে অংশ নেওয়া ৪২ শতাংশ মানুষ রাশিয়াকে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে বড় হুমকি হিসেবে দেখেছেন ৩৪ শতাংশ এবং চীনকে ৩০ শতাংশ। ১৪টি দেশে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে রাশিয়াকে নিয়ে উদ্বেগের হার সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে ১৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় ৭৩ শতাংশ, ব্রাজিলে ৫৯ শতাংশ, মেক্সিকোতে ৫৮ শতাংশ এবং তুরস্কে ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রকফেলার ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক পেলোফস্কির মতে, জরিপের ফলাফল বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থাহ্রাসের প্রতিফলন। তার মতে, মানুষ এখন বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করছে; সেখানে ‘আমেরিকানরা কী মনে করে’-এই প্রশ্নটি আগের মতো কেন্দ্রে নেই। তিনি পরিস্থিতিটিকে ‘একটি বড় ধাক্কা’ হিসেবে আখ্যা দেন।