নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। এই আকস্মিক বন্যা মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাটবদ্ধ মাটি গলে গিয়ে একটি পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে থাকতে পারে।
বার্তা সংস্থা এপি জানায়, আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)।
তবে গবেষকরা বলছেন, গত ২৬ আগস্টের এই দুর্যোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র কারণ ছিল না। ২০১৫ সালের নেপালের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ওই এলাকার শিলাস্তরকে দুর্বল করে দিয়ে কয়েক বছর পরের এই ধসে ভূমিকা রাখতে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক এবং বিশ্লেষণের অন্যতম অবদানকারী বেন ক্লার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, “এই দুর্যোগ কোনো চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ছিল না। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট।”
নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি বিশাল শিলাখণ্ড ও তার ওপর থাকা হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হন। এর ফলে পানি, বরফ, বিশাল পাথর ও পলির প্রবল স্রোত ত্রিশুলি নদীর করিডোরজুড়ে বিভিন্ন জনপদে আছড়ে পড়ে। এতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর জীবিতদের উদ্ধারে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: রয়টার্স
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ পিছু হটছে এবং দীর্ঘদিন ধরে জমাটবদ্ধ মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাচ্ছে। এই পারমাফ্রস্ট ভঙ্গুর ও ফাটল ধরা পাহাড়ি শিলাকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপপ্রবাহ বা অতিবৃষ্টির মতো আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না; এটি পাহাড়ের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে। এর ফলে সংকীর্ণ নদী উপত্যকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তবে গবেষণায় নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি যে জলবায়ু পরিবর্তন না হলে ওই পাহাড়ি ঢালটি ধসে পড়ত কি না। গবেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে উষ্ণায়নের ফলে সংঘটিত বিভিন্ন প্রক্রিয়া ঢালটির অস্থিতিশীলতা বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে চিহ্নিত অন্যতম স্পষ্ট জলবায়ুগত পরিবর্তন হলো বরফ জমে থাকার সীমার উচ্চতা বৃদ্ধি।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যে উচ্চতার ওপরে মাটি নিয়মিতভাবে জমাটবদ্ধ থাকে, সেই সীমা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার (৩২৮ ফুট) করে ওপরে উঠছে। ফলে ক্রমবর্ধমান উচ্চতার শিলাস্তর দীর্ঘ সময় ধরে হিমাঙ্কের ওপরে থাকছে। এতে পারমাফ্রস্ট গলছে, বরফের মধ্যে ফাটল তৈরি হচ্ছে এবং নিচের শিলাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইউনিভার্সিটি অব গ্রাৎসের ভূবিজ্ঞানী ইয়াকব স্টাইনার ২০০৬ সাল থেকে হিমালয় অঞ্চলে কাজ করছেন। তিনি এই বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। স্টাইনার বলেন, “প্রায় পাঁচ হাজার মিটার (১৬ হাজার ৪০৪ ফুট) উচ্চতায় স্থাপিত পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম থেকে এখন দেখা যাচ্ছে, কিছু শিলা ও মাটি আর সারা বছর জমাট অবস্থায় থাকছে না।”
তিনি বলেন, “এর অর্থ হলো, শত শত বা হাজার বছর ধরে বরফের নিচে থাকা ভূমি এখন উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে।”
হিমবাহ পিছু হটাকেও পাহাড়ের অস্থিতিশীলতার আরেকটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো প্রতি বছর গড়ে অর্ধ মিটারেরও বেশি পুরুত্ব হারাচ্ছে। গত মাসের দুর্যোগস্থলের কাছে থাকা লাংটাং লিরুং হিমবাহটি ১৯৯০-এর দশক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার (০.৩ মাইল) পিছু হটেছে। এতে আগে বরফে ঢেকে থাকা শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
মেরু অঞ্চল বাদ দিলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তুষার ও বরফের ভাণ্ডার রয়েছে হিমালয় অঞ্চলে। সেখানে ৬৩ হাজারের বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো এশিয়ার অন্তত ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থায় পানি সরবরাহ করে। এসব নদী কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার মিটার (১৪ হাজার ৭৬৩ থেকে ১৯ হাজার ৬৮৫ ফুট) উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ এলাকার প্রায় ৭৮ শতাংশই উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে হিমবাহগুলো প্রতি বছর গড়ে ২৬৭ বিলিয়ন টন বরফ হারিয়েছে। এই পরিমাণ প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০টি গিজার গ্রেট পিরামিডের সমান ভরের।
হিমবাহ পিছু হটলে আশপাশের শিলাপ্রাচীরের ওপর আগে যে চাপ বা সহায়তা ছিল তা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে গলিত পানির পরিমাণও বাড়তে পারে।
গত ২৬ আগস্টের ধসের আগে সময়টিও ছিল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট স্থানীয়ভাবে রেকর্ড করা সময়ের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই ও আগস্ট ছিল।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, “ভূমিকম্পের মতো ভূতাত্ত্বিক কারণগুলো যদি ভূগর্ভস্থ শিলাকে দুর্বল করে থাকে, তাহলে অন্যান্য সব কারণই মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র হয়েছে।”
এই বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কিছু ঝুঁকি এত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে তৈরি হতে পারে যে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা সেগুলো ঠেকাতে সক্ষম নাও হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপাল দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু গবেষকদের মতে, ধসের ব্যাপকতা ও গতির কারণে এসব ব্যবস্থা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিখোঁজ। ছবি: রয়টার্স
বৃষ্টিজনিত বন্যার ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন আগে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু প্রত্যন্ত উচ্চ পার্বত্য এলাকায় বড় ধরনের ভূমি বা পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়া হঠাৎ ঘটতে পারে এবং তা পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
অটো বলেন, “সমতল এলাকার মানুষের তুলনায় পাহাড়ি পরিবেশ ও সেখানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও ভূমির স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, স্যাটেলাইট ও অন্যান্য ভূ-পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করলে কিছু ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয়ের যেসব উপত্যকায় নদীর তীরে বসতি, সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, সেখানে অভিযোজনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহ ও পারমাফ্রস্ট তাপমাত্রার পরিবর্তনে কয়েক দশক ধরে প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই উষ্ণায়নের কারণে পাহাড়ের অস্থিতিশীলতার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার কিছু অংশ ইতোমধ্যে স্থায়ীভাবে এগিয়ে গেছে।
ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, “এই অঞ্চলের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করা।”
তার মতে, পারমাফ্রস্ট ও হিমবাহ গলার মতো প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং এ ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।