জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে নেতৃত্ব বাছাইয়ের জটিলতা। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে, নাকি দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে- এই প্রশ্নেই মূলত শেষ মুহূর্তে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন বলয় থেকে নিজেদের পছন্দের লোককে পদে দেখতে চাওয়ার তৎপরতাও শেষ মুহূর্তে কমিটি ঠিক করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছুটা।
নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলোর ভাষ্য, বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিদায়ী বার্তাও এসেছিল। সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের নাম বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বর্তমান দুই শীর্ষ নেতার সাক্ষাতের পর নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি থাকলেও, তা আর নির্ধারিত সময়ে হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিলম্বের পেছনে কেবল পদপ্রত্যাশীদের নাম নিয়ে মতপার্থক্য নয়; ছাত্রদলকে আগামী দিনের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে কী ধরনের সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা হবে, সেই প্রশ্নও কাজ করছে।
নেতৃত্ব বাছাইয়ে নতুন ভাবনা
নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানায়, প্রথমে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি দেওয়ার চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি শিক্ষার্থীদের মানসিকতা, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে নেতৃত্ব গঠনের পরামর্শ দেন।
এরপর সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের সামনে আনা হবে, নাকি দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা অভিজ্ঞ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে- এ নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভিন্ন ভিন্ন মত আসে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি কে হবেন, সেটি তারেক রহমান মোটামুটি ঠিক করে রেখেছেন। মূল বিবেচনা এখন সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য শীর্ষ পদগুলো নিয়ে। অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ- এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে নেতৃত্ব সাজানোর চেষ্টা চলছে।
তবে অন্য সূত্রগুলো বলছে, শীর্ষ দুই পদে সিনিয়র ও জুনিয়র নেতৃত্বের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা এখনো শেষ হয়নি। কোন পদে কাকে রাখা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরেকটি সূত্রের দাবি, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সভাপতি করতে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বলয়ের একাধিক পক্ষ থেকেও সুপারিশ গেছে। ফলে নেতৃত্ব বাছাইয়ের হিসাব-নিকাশে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া আটকে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তরুণ নেতৃত্বের পক্ষে যুক্তি
বিএনপির নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছে, দলের শীর্ষ পর্যায়ে ছাত্রদলকে আরও তারুণ্যনির্ভর করার পক্ষে মত রয়েছে। সংগঠনটির নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত পুরনো শিক্ষাবর্ষের নেতাদের প্রাধান্য নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনাও আছে।
এমন মতের পক্ষে যুক্তি হলো, বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাদের বয়স ও শিক্ষাজীবনের ব্যবধান কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ভাষা, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সমস্যাগুলো বোঝার সক্ষমতা থাকতে হবে নেতৃত্বের।
ছাত্রদলের সামনে এখনকার চ্যালেঞ্জ আগের সময়ের মতো শুধু সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করা নয়। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার, আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা, চাকরির প্রস্তুতি, শিক্ষার পরিবেশ এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের মতো বিষয়েও সংগঠনকে অবস্থান নিতে হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে- এমন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনায় এসেছে।
তবে ‘তরুণ’ বলতে ঠিক কোন শিক্ষাবর্ষের নেতাদের বোঝানো হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শীর্ষ পদে আগ্রহীদের মধ্যে যেমন: ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নাম রয়েছে, তেমনি ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের নেতারাও আলোচনায় আছেন।
অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়ায় আপত্তি
তরুণ নেতৃত্বের পক্ষে মত থাকলেও দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকা নেতাদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে দলের ভেতরের একটি অংশের।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, গত দেড় দশকের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের অনেক নেতা মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক মোকাবিলার অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কৌশল সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের ধারণা আছে।
এই সূত্রের ভাষ্য, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, তাদের অভিজ্ঞতা একেবারে উপেক্ষা করে শীর্ষ নেতৃত্ব তুলনামূলক জুনিয়রদের হাতে দেওয়া হলে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- এমন মতও তারেক রহমানের কাছে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। শীর্ষ দুই পদে একজন তুলনামূলক সিনিয়র ও আরেকজন জুনিয়র নেতাকে রাখার চিন্তা রয়েছে। সিনিয়র নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্দোলনে সক্রিয়তা এবং সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ডাকসুর ফল কেন আলোচনায়
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টিকে শুধু নিয়মিত কমিটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না বিএনপি। সাম্প্রতিক ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে ছাত্রদলের পারফরম্যান্সও নেতৃত্ব বাছাইয়ের আলোচনায় এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ২০২৫-এর ফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘মার্কার’ হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টিতে জয় পায়। বাকি তিনটি পদে জয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ছাত্রদলের প্যানেল কোনো পদে জয় পায়নি।
শীর্ষ তিন পদেও শিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ভিপি পদে সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট, জিএস পদে এস এম ফরহাদ ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট এবং এজিএস পদে মহিউদ্দীন খান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পান। ছাত্রদলের জিএস প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম পান পাঁচ হাজার ২৮৩ ভোট এবং এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পান পাঁচ হাজার ৬৪ ভোট। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান পাঁচ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়েছিলেন, তবে তিনি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল ও ভোট বর্জন করেছিলেন।
ডাকসু নির্বাচনের এই ফল ছাত্রদলের জন্য সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ক্যাম্পাসে দলীয় পরিচয়ের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং কার্যকর সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি কোথায়- এ প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিএনপির একটি সূত্র বলেছে, নতুন নেতৃত্ব এমন হওয়া দরকার, যারা শুধু দলীয় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখবেন না; বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেও সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবেন।
তবে ডাকসুর ফলকে কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকা, সংগঠনের সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাচনের নতুন বাস্তবতা- সব মিলিয়েই ফলাফলকে বিশ্লেষণ করতে হবে।
শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা
নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের সক্ষমতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজনের মূল্যায়ন, ছাত্রশিবিরে কেন্দ্র থেকে নিচের স্তর পর্যন্ত তুলনামূলক সুসংগঠিত নির্দেশনা ও তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। বিপরীতে ছাত্রদলসহ দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনে নেতা ও পক্ষকেন্দ্রিক গ্রুপ-উপগ্রুপের উপস্থিতি দেখা যায়। তার মতে, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি পরিচালনা করলে হবে না। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও কলেজ পর্যায়ের সংগঠনকেও একই সাংগঠনিক ধারায় পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে।
এ আলোচনায় অন্য সংগঠন থেকে এসে ছাত্রদলে জায়গা করে নেওয়া শিক্ষার্থীদের এবং বিশেষ করে ‘গুপ্ত’ পরিচয়ধারীদের বিষয়টিও রয়েছে। অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার ক্ষেত্রে তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের পক্ষে মত এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিকূল সময়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেতাদের সাংগঠনিক নিবেদনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ঘোষণা তাহলে কবে?
ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার সময় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাতে পারেনি। তবে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া থেমে নেই- এমনটাই বলছে বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্র।
নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, তা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট- ছাত্রদলের জন্য এবারের কমিটি কেবল নিয়মিত সাংগঠনিক পরিবর্তন নয়। বিএনপি সরকারে থাকার সময়ে সংগঠনটি কীভাবে ক্যাম্পাসে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠন করবে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে- নতুন নেতৃত্বের সামনে সেই চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
ফলে শেষ পর্যন্ত কমিটিতে কারা আসছেন, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোন মানদণ্ডে আসলে তাদের বাছাই করা হচ্ছে। তরুণ নেতৃত্ব, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা- এই চারটি বিষয়কে কতটা সমন্বয় করা যায়, সেটিই এখন ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে মূল পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ ব্যাপারে চরচাকে বলেন, “নতুন কমিটি তার স্বাভাবিক গতি-প্রক্রিয়ার মধ্যেই সম্পন্ন হবে, ঘোষণাও হবে। তার আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”