এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্রে মোবাইল নম্বর লিখে রাখা এক পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে এনে টাকার বিনিময়ে পুনরায় উত্তরপত্রে লিখিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের এক পরীক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত শিক্ষক সেকেন্দার আলী রাজশাহীর হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর এলাকায় অবস্থিত আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের ছাত্র মেহেদী হাসান এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের উত্তরপত্রে নিজের মোবাইল নম্বর লিখে রেখেছিল।
খাতা মূল্যায়নের সময় নম্বরটি চোখে পড়লে গত সোমবার সকালে ওই পরীক্ষার্থীকে ফোন করে নিজের বাসায় ডাকেন প্রভাষক সেকেন্দার আলী।
পরীক্ষার্থী মেহেদী জানান, শিক্ষকের বাসায় গিয়ে সে দেখে তাকে দেওয়া হয়েছে ২৫ নম্বর। পরবর্তীতে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে উত্তরপত্রে পুনরায় লেখার সুযোগ দেওয়া হয়। উত্তরপত্রের যেসব উত্তর ভুল ছিল তা সংশোধন এবং যেগুলো লেখা হয়নি, সেগুলো খালি জায়গায় লিখে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে তার প্রাপ্ত নম্বর দাঁড়ায় ৫০-এর ওপরে।
পুরো ঘটনাটির সত্যতা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছে পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান নিজেই।
দেখা করার আগে প্রভাষক সেকেন্দার আলীর সাথে মেহেদীর মোবাইলে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। রেকর্ডে শোনা যায়, শিক্ষক সেকেন্দার আলী টাকা নিয়ে তাকে আসার নির্দেশ দেন এবং বিষয়টিকে অভিভাবকদের জানাতে নিষেধ করেন। তখন মেহেদী বলে, “অভিভাবককে না জানিয়ে এত টাকা পাওয়া সম্ভব নয়।” এর জবাবে পরীক্ষক মন্তব্য করেন, একজন ভিক্ষুকে কাছেও ২-১০-২০ হাজার টাকা থাকে। মেহেদী তখন বলে, “স্যার আমরা তো বেকার ছেলে, ভিক্ষুক তো নই।” তখন পরীক্ষক বলেন, “ঠিক আছে, অন্যান্য ক্যান্ডিডেটদেরও নিয়ে আসো।”
পরবর্তীতে ১৪ আগস্ট সকালে মেহেদী তার পাঁচ বন্ধু ইমন, সৌরভ, রুহুল, সোহাগ ও সামিকে নিয়ে রাজশাহীর বিনোদপুর বাজারে যায়। কিছুক্ষণ পর একটি মোটরসাইকেলে চেপে আসেন ওই পরীক্ষক। সেখান থেকে তিনি মেহেদী ও রুহুলকে নিয়ে নিজের বাসায় যান। বাসায় গিয়ে মেহেদীর খাতাটি সহজেই পাওয়া গেলেও তার অন্য বন্ধুদের খাতা পাওয়া যায়নি। উত্তরপত্রে লেখা শেষ হলে পরীক্ষক নিজেই তাদের পুনরায় বিনোদপুর বাজারে রেখে আসেন এবং যাওয়ার আগে মেহেদীর মোবাইল থেকে নিজের নম্বরটি মুছে দেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৪ আগস্ট পরীক্ষক যে মোটরসাইকেলে এসেছিলেন, সেটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ‘রাজশাহী-হ ১৫-২৪০৫’। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী গাড়িটি সুজন কুমার বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হলেও পরবর্তীতে তিন হাত বদল হয়ে রফিকুল ইসলাম সেন্টু নামের এক ব্যক্তি এটি কেনেন। সেন্টু প্রভাষক সেকেন্দার আলীর আত্মীয় এবং চারঘাট উপজেলার কাকালকাটি গ্রামের বাসিন্দা। গত ৫ সেপ্টেম্বর সেন্টুর বাড়ির সামনে মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দারা ছবি দেখে শিক্ষক সেকেন্দার আলীকে শনাক্ত করেন। সেকেন্দার আলীর মূল বাড়ি চারঘাটের বেলঘরিয়া গ্রামে।
অভিযোগের বিষয়ে সেকেন্দার আলীর বাড়িতে গিয়ে সরাসরি অডিও রেকর্ড ও ছবি দেখালে তিনি শিক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে টাকার বিনিময়ে লেখানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
তবে অডিও রেকর্ডে প্রভাষক সেকেন্দার আলীর কণ্ঠ শনাক্ত করে হাজী জমির উদ্দীন সাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল বলেন, “সেকেন্দার আলী দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন করছেন। এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. শামীম আরা চৌধুরী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়াবহ। শিক্ষা বোর্ডে এ ধরনের কোনো অপরাধ বরদাস্ত করা হবে না। অভিযোগের সত্যতা সাপেক্ষে জালিয়াতির সাথে যুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”