নোয়াখালীর সদর উপজেলার অশ্বদিয়া ইউনিয়নে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার পর দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ ঘটনা আবারও সামনে এনেছে কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনটির পুরনো সংকট। সেই সংকট হলো পদ পাওয়া ও পদবঞ্চিতদের বিরোধ সংক্রান্ত।
গত শনিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অশ্বদিয়া ইউনিয়নের দিনমণি বাজার থেকে ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা পর্যন্ত কয়েক দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১৫ জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কমিটিতে জায়গা পাওয়া নেতাদের আনন্দ মিছিল এবং পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ২৬ আগস্ট অশ্বদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ইয়াছিন আলমকে আহ্বায়ক এবং আব্দুল্লাহ আল বিন মাহিদকে সদস্য সচিব করা হয়। তবে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ তার অনুসারীরা এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবি জানাতে থাকেন।
এই একটি স্থানীয় কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে, তা শুধু অশ্বদিয়াকেন্দ্রিক কয়েকটি পদ নিয়ে বিরোধ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, নিজেদের ‘ত্যাগী’ দাবি করা অসংখ্য নেতার পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত কমিটি পুনর্গঠনের সময় তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। আর এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। নতুন কমিটি দেওয়ার বিষয়টি ঘিরেই ঘটছে নানা অঘটন।
আগস্টে নতুন কমিটির আশায় গুড়ে বালি
আগস্টের শুরু থেকেই ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল। রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ ফেব্রুয়ারির শেষেই শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ এই নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়েছিল। পরে ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
জুলাইয়ের শেষ দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নতুন কমিটি ‘যেকোনো সময়’ ঘোষণা হতে পারে এমন খবর প্রকাশিত হয়। আগস্টের শুরুতে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। গত ১৪ আগস্ট পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ী বার্তাও দেন।
ফলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ ধরে নিয়েছিল, আগস্টেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হবে। সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকাতেও এমন প্রত্যাশার ‘ভিড়’ দেখা যায়। সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে নিজেদের রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ বা পছন্দের নেতারা জায়গা পাবেন এমন প্রত্যাশায় বেশ কিছু নেতাকর্মী আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। টিএসসিতে অপেক্ষায় থাকা একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছিলেন, ওই রাতেই নতুন কমিটি ঘোষণা হবে এমন নিশ্চিত খবর পেয়েই সেখানে এসেছেন।
কিন্তু সেই রাতেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। বরং এরপর থেকেই পরিস্থিতি কিছুটা বদলে যায়।
কেন আটকে গেল ঘোষণা, হবে কবে?
দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা শেষ পর্যায়ে গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সদ্য স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পাওয়া একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “একটি খসড়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে রয়েছে এবং তার অনুমোদনের পরই ঘোষণা হতে পারে। আমার ধারণা, ঘোষণা দিতে দিতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় লেগে যেতে পারে। কিংবা সামনে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরেই ঘোষণা হবে, এমন আলোচনাও আছে।”
কেন এত দেরি- এ প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, “মূল্যায়ন তো সহজ জিনিস না। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে অনেক কিছুই বিবেচনা, পর্যালোচনা করতে হয়।”
স্থায়ী কমিটির এই নেতাসহ দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার শুধু কে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হবেন- সেই প্রশ্ন বিবেচনায় নেই। বরং কে থাকবেন, কে বাদ পড়বেন এবং বাদ পড়া নেতাদের কীভাবে সামলানো হবে, সেগুলোও বড় বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘ত্যাগী’ সবাই, কিন্তু পদ সীমিত
ছাত্রদলের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা সম্ভবত এখানেই। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে থাকায় সংগঠনটির বহু নেতা নিজেদের আন্দোলন-সংগ্রামের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে দাবি করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও ছাত্রদলের ভূমিকা ছিল- এমন দাবি করে আসছেন সংগঠনটির নেতারা।
কিন্তু নেতৃত্বের জায়গা সীমিত। একজন সভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছে নির্দিষ্টসংখ্যক পদ। অথচ প্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক। ফলে ‘ত্যাগ’ বা ‘আন্দোলনে ভূমিকা’ এসব কাউকে পদ দেওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করছে না।
সাম্প্রতিক আলোচনায় ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি আনুগত্য, নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা এসেছে। অর্থাৎ, মূল্যায়নের বিষয়টি এখন একমাত্রিক নয়।
এ বিষয়ে ছাত্রদলেরই একজন সাবেক সভাপতি চরচাকে বলেন, “একজন নেতা হয়তো দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিতর্ক আছে। অন্য একজন সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু আন্দোলনে তার ভূমিকা তুলনামূলক কম। কেউ নিয়মিত শিক্ষার্থী, কেউ আবার শিক্ষাজীবনের নির্ধারিত সময় পার করে ফেলেছেন। কেউ তৃণমূলে জনপ্রিয়, আবার কারও সাংগঠনিক যোগাযোগ শক্তিশালী কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। এই সব সমীকরণ একসঙ্গে মেলাতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে তালিকা বদলানোর সুযোগও থাকে। আর সেখানেই সৃষ্টি হচ্ছে অপেক্ষা।”
পদবঞ্চিতদের বিশৃঙ্খলা নিয়ে দুশ্চিন্তা
কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার আগেই তৃণমূলে ছোট ছোট কমিটি নিয়ে বিরোধের ঘটনাগুলো ঘটছে নিয়মিতই। এসব ঘটনাকে তাই আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নোয়াখালীর অশ্বদিয়া তার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। সেখানে নতুন কমিটিতে পদ না পাওয়া সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনের অনুসারীরা কমিটি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছিলেন। অন্যদিকে নতুন কমিটিকে ঘিরে আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। দুই পক্ষের কর্মসূচি একই এলাকায় হওয়ায় সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ ধরনের বিরোধের পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও কাজ করে। একজন নেতা বছরের পর বছর একটি সংগঠনের সঙ্গে থাকলে তার এমন প্রত্যাশা তৈরি হয় যে- পরবর্তী কমিটিতে তিনি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবেন। তার অনুসারীরাও ধরে নেন, ‘বড় ভাই’ পদ পেলে তাদেরও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। ফলে একটি কমিটিতে একজনের পদ পাওয়া মানে অন্য কারো জন্য পদ হারানোর আশঙ্কা।
আর যখন সেই পদটি প্রত্যাশিত ব্যক্তির বদলে অন্য কাউকে দেওয়া হয়, তখন সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত বঞ্চনা হিসেবে দেখা হয় না। অনেক সময় সেটিকে একটি গ্রুপের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর আঘাত হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তখনই শুরু হয় কমিটি বাতিলের দাবি, বিক্ষোভ, পাল্টা কর্মসূচি বা কখনো সংঘর্ষও।
স্থানীয় থেকে কেন্দ্র- সমস্যা একটাই
ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াতেও এমন চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার অপেক্ষার পাশাপাশি তৃণমূলেও কমিটি পুনর্গঠনের একটি বড় প্রক্রিয়া চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে এসব নতুন কমিটি দেওয়া নিয়েও ঝামেলা হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘদিন পর কমিটি হওয়ায় প্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়েছে, কোথাও আবার পুরনো নেতৃত্বের অনুসারীদের বাদ পড়া নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হচ্ছে- একদিকে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতাদের মূল্যায়ন, অন্যদিকে সংগঠনের ভবিষ্যতের জন্য নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি। আর সেই জায়গায় পুরনো গ্রুপিং, ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং স্থানীয় প্রভাবের হিসাবও পুরোপুরি বাদ দেওয়া সহজ নয়।
‘গ্যাঞ্জাম’ একটা হবেই?
১৪ আগস্ট রাতে টিএসসিতে অপেক্ষায় থাকা নেতাকর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে পরে আবার কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট- নতুন কমিটি ঘোষণার পর পদ পাওয়া নিয়ে যেমন আনন্দ হবে, তেমনি বাদ পড়া অংশের প্রতিক্রিয়াও বেশি হতে পারে।
সে দিন রাতে আনন্দ মিছিলে অংশ নিতে যাওয়া ছাত্রদলের এক নেতা চরচাকে বলেন, “ঝামেলা তো একটা হয়ে গেছে। আমরা যাদের রাজনীতি করি, তারা তো ১০০ তে ১০০ কনফার্ম ছিল। এখন কিছু গ্যাঞ্জাম সামনে আসছে। তাই একটু রিস্কে পড়ে গেছে। ভাই না শুধু, ওই সেশনেরই কাউকে রাখা হবে না কমিটিতে- এমনটাই শুনতেছি। একদম ধরা খেয়ে গেলাম।”
পছন্দের নেতা কমিটিতে না এলে একদমই ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন এই নেতা। তিনি বলেন, “ভাইরে না দিলে, একটা গ্যাঞ্জাম তো হবেই মাস্ট।”
নোয়াখালীর অশ্বদিয়া কিংবা এর আগে বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধগুলো সেই আশঙ্কারই বাস্তব উদাহরণ কি না- এ নিয়ে অবশ্য সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ঘটনাগুলো অন্তত একটি বিষয় দেখাচ্ছে- কমিটি ঘোষণা মানেই সংগঠনের ভেতরের বিরোধের সমাধান নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটিই বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্য কী?
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির চরচাকে বলেন, “দেখেন, দলের জন্য সবারই ভূমিকা আছে। কারো কম, কারো বেশি। সবাই ত্যাগী। কিন্তু দলের একটা কাঠামো আছে। সবাইকে তো পদ দেওয়া যাবে না। আবার পদ দিলেও কাঙ্ক্ষিত পদটিই যে পাবে, তা না। যেমন সভাপতি তো একজনই হবে। তাই এই মূল্যায়নের জায়গাটা আসলেই কঠিন।”
ছাত্রদলের এই শীর্ষ নেতা বলেন, “দলের প্রতি যাদের আনুগত্য আছে, তাদের উচিত দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া।”
নাছিরের ভাষায়, “আর ছোটখাটো যে ঘটনা সামনে আসে, সেটা সাময়িক। মান-অভিমান থেকে এমনটা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠিক হয়ে যায়।”
তাহলে মূল্যায়ন হবে কীভাবে?
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে যে কয়েকটি মানদণ্ড সামনে এসেছে, সেগুলো মোটামুটি এভাবে দেখা যায়- প্রথম মানদণ্ডটি হলো আন্দোলনে ভূমিকা। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কে কী ভূমিকা রেখেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিষয়টি সাংগঠনিক দক্ষতা। শুধু মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিতি নয়, সংগঠন পরিচালনা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কর্মী ধরে রাখার সক্ষমতাও বিবেচনায় আসছে।
তৃতীয় মানদণ্ড ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি। বিতর্ক, মামলা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার সংকট থাকলে তা পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক হতে পারে এমন কথাও আলোচনায় রয়েছে।
চতুর্থটি হলো শিক্ষার্থী পরিচয় ও শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। ছাত্র সংগঠন হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাস্তব যোগাযোগ কতটা, সেটিও নতুন বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পঞ্চম মানদণ্ড হলো সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা হলো, এই শেষ বিষয়টিই সবচেয়ে কঠিন। কারণ কমিটিতে সবাইকে পদ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে ‘ত্যাগী’দের মধ্য থেকেই কাউকে বেছে নিতে হবে, কাউকে বাদ দিতে হবে।
সামনে বড় পরীক্ষা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণা এখন শুধু দুই শীর্ষ পদে কারা আসছেন- সেই প্রশ্নে আটকে নেই। বরং নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পর সংগঠনটি কতটা সহজে পুরনো ও নতুন নেতৃত্বকে একসঙ্গে রাখতে পারে, সেটিই হয়ে উঠতে পারে বড় পরীক্ষা।
কারণ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বদলালে তার প্রভাব পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিতেও। একটি ইউনিটে নতুন নেতৃত্ব এলে পুরনো নেতৃত্বের একটি অংশ বাদ পড়ে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন মুখ এলে একইভাবে তাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়। আর সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে ক্ষোভও তৈরি হয়।
ফলে কেন্দ্রীয় কমিটি যত দেরিতে হবে, ততই অনিশ্চয়তার সময় দীর্ঘ হবে। আর অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হয়, ততই বাড়ে- কে আসছেন, কে বাদ পড়ছেন, কার ‘সিন্ডিকেট’ শক্তিশালী, কার সঙ্গে কার সমীকরণ মিলছে- এসব আলোচনা। আগস্টে কমিটি হবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হওয়ার পরও তা না হওয়ায় সেই অপেক্ষা এখন আরও দীর্ঘ হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি কবে ঘোষণা হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু নোয়াখালীর অশ্বদিয়া যে প্রশ্নটি সামনে এনেছে, সেটি হলো- যারা থাকবেন না, তাদের কীভাবে সাথে রাখবে ছাত্রদল?
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে প্রায় প্রতিটি স্তরে একাধিক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতার দাবির কারণে তাই ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। সেই সাথে এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গঠিত কমিটির প্রতি সবার আনুগত্য থাকা এবং ঐক্য বজায় রাখা সম্ভবত তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ।