২০২৫ সালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনের শিরোনামে ভুক্তভোগীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘ধর্ষিতা কিশোরী’ বা ‘ধর্ষিতা নারী’ হিসেবে। আরেকটি প্রতিবেদনে একজন মাকে বলা হয়েছে ‘ধর্ষিতার মা’। অর্থাৎ, শিরোনামে ভুক্তভোগীকে জায়গা দিতে সংবাদমাধ্যমে ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর সংঘটিত অপরাধনির্ভর অবমাননাকর পরিচয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি একজন মানুষকে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, অপরাধীর দায় আড়াল করে এবং ভুক্তভোগীকে নতুন করে ট্রমার মুখে ফেলে। তাদের মতে, সংবাদমাধ্যমে এই শব্দের ব্যবহার ভুক্তভোগীর প্রতি বৃহত্তর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ২০২০ সালেই ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি সরিয়ে ‘ধর্ষণের শিকার’ করা হয়েছে। তবে দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি এখনো ব্যবহার করছে কি না; করলে তা কেন করছে এবং এ নিয়ে সম্পাদকীয় নীতিমালা কী— সেটাই যাচাই করেছে ডিসমিসল্যাব।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অনলাইনে সর্বাধিক পঠিত ৩০টি বাংলা সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ২৯টির ১৪০টি প্রতিবেদনে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। এরমধ্যে ১২টি প্রতিবেদনে শব্দটি এসেছে শিরোনামেই।
সংবাদমাধ্যমে ‘ধর্ষিতা’ শব্দের ব্যবহার বন্ধের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে, বৈশ্বিক সাংবাদিকতা নির্দেশিকায় জেন্ডার সংবেদনশীলতার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে এ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে পরিবর্তন আসেনি
ডিসমিসল্যাব সংবাদমাধ্যমে পাঠক সংখ্যায় অগ্রগামিতার ভিত্তিতে টিভি, অনলাইন এবং দৈনিক পত্রিকা— এই তিন ধরনের সংবাদমাধ্যমের প্রতিটির ১০টি করে অনলাইন সংস্করণে ২০২৫ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন বেছে নিয়েছিল। প্রতিবেদনগুলো যাচাই করে মাত্র একটি সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রতিবেদনে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি পায়নি ডিসমিসল্যাব। বাকি ২৯টি সংবাদমাধ্যমেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ঢাকা মেইলের ২৫টি এবং ঢাকা পোস্টের ১০টি প্রতিবেদনে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি পাওয়া গেছে। সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে যুগান্তরের ২০টি ও কালবেলার ১৬টি প্রতিবেদনে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। টেলিভিশনের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে চ্যানেল ২৪-এ সর্বোচ্চ ১০টি প্রতিবেদনে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
শুধু প্রতিবেদনের ভেতরেই নয়, শিরোনামেও শব্দগুলোর ব্যবহার লক্ষণীয়। ‘ধর্ষিতা কিশোরী’, ‘ধর্ষিতা নারী’, ‘ধর্ষিতার পাশে দাঁড়ালেন…’, ‘ধর্ষিতার মা’ শিরোনামে ব্যবহার করা হয়েছে।
দেশে সংবাদমাধ্যমে এখনো ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ক্ষতিকর প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ধর্ষিতা’র মতো শব্দ একজন মানুষকে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করে। অপরাধীকে আড়াল করে সামনে নিয়ে আসে ভুক্তভোগীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)- এর লিগ্যাল এক্সপার্ট মনিষা বিশ্বাস জানান, ‘ধর্ষিতা’ শব্দটির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অপবিত্রতা ও লজ্জার ধারণা জুড়ে আছে। এমন ভাষার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব আছে।
মনিষা বিশ্বাস বলেন, “এই শব্দগুলোর ব্যবহার যে ভুক্তভোগী, তাকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে এবং এখানে যে একজন অপরাধী আছে, তাকে পুরো ব্যাপারটা থেকে আড়াল করে ফেলে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদিও এমনটা বলা হয়ে থাকে যে আসলে শব্দের মধ্যে কী? কিন্তু এই শব্দের খেলা একটা বড়সড় ভূমিকা পালন করে। শব্দ একজন নারীকে তার পরিচয় বহনের ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এই জিনিসগুলো আসলে একটা মানুষকে নীরব হতে প্ররোচিত করে।”
ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরীর মতে, এমন তকমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক পরিমণ্ডলে ‘জাজমেন্টের’ শিকার হওয়ার ভয়ে ফেলে দিতে পারে।
প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, “যখন কাউকে বারবার সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত তকমা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, সমাজ তখন তাকে একজন মর্যাদা সম্পন্ন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে ওই বিশেষ ঘটনাটিকেই তার মূল পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। এর ফলে ওই ব্যক্তি মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়ে ভুগতে পারেন।”
মেয়ে নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা তৃষিয়া নাশতারান বলেন, “মিডিয়ার ভাষা এক ধরনের মানদণ্ড স্থাপন করে। কীভাবে ভাবতে হবে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বারবার ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এই ভাষা পাঠক, দর্শক ও শ্রোতার অবচেতন মনে গভীর ছাপ ফেলে।”
তৃষিয়া নাশতারান মনে করিয়ে দিয়েছেন, এমন শব্দ ব্যবহারে একদিকে অপরাধীর দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়, অন্যদিকে ভুক্তভোগীকে নতুন করে অন্যায়ের শিকার হতে হয়। তিনি বলেন,“পুরো অন্যায়ের সামাজিক চাপ অন্যায়ের শিকার নারীর গায়ে এসে পড়ে, তার প্রতি সমাজের ভিকটিম-ব্লেমিং মনোভাবকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, ধর্ষণের শিকার নারীর সামাজিকভাবে বর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে এবং তার উপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কলঙ্ক দৃঢ় হয়। অথচ এখানে নির্যাতনের শিকার নারীটির আদৌ কোনো দায় নেই।”
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক নিশাত সুলতানা বলেন, “যে শব্দগুলো একজন নারীকে আবার দুই, তিনবার মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত করে, সেই শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। এত সংবেদনশীল একটা বিষয়, আমরা গণমাধ্যমের কাছে আশা করি যে প্রথম উদ্বেগটা বা প্রথম সংবেদনশীলতাটা তাদের থেকেই আসবে। গণমাধ্যম আমাদের আওয়াজ। সেখানেই যদি বড় রকমের ভুল থাকে, তাহলে সমাজের ভুল কীভাবে থামাবে?”
নীতিমালায় যা আছে
যৌন সহিংসতার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নির্দেশিকাগুলোয় বলা হয়েছে, ভাষার ব্যবহারে ভুক্তভোগী যেন সমাজে নতুন করে হেয় বা ট্রমার শিকার না হন।
ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইউনেস্কো)রিপোর্টিং অন ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন এন্ড গার্লস নামের নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন’—এ ধরনের শব্দচয়ন পরিহার করতে হবে। কারণ, এভাবে বললে মনে হতে পারে, ওই ঘটনার জন্য ভুক্তভোগীর কোনো দায় রয়েছে। এর পরিবর্তে নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করতে হবে। যেমন, ‘ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’ বা ‘তিনি বলেছেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’।
ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) বলছে, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনায় এমন শব্দচয়ন বা ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা অপরাধীর দায়কে স্পষ্টভাবে সামনে আনে।
ডার্ট সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমার রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীকে যেন আর কোনো হেনস্তার মুখে পড়তে না হয় কিংবা সমাজে তার মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সবকিছু করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।
ডার্ট সেন্টার ইউরোপের রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট নীতিমালায় বলা হয়েছে, যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর বর্ণনা যেন করা না হয়। কারণ, একটি বিষয়বস্তুকে সংবাদমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করে তা মানুষ কীভাবে সে বিষয়টি গ্রহণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনে শব্দ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে কানাডাভিত্তিক গবেষণা ইউজ দ্য রাইট ওয়ার্ডস: মিডিয়া রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন কানাডা-তে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, যৌন সহিংসতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় সঠিক শব্দ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুল শব্দচয়ন অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুক্তভোগীর কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতির এই আশঙ্কার কারণেই সংবাদমাধ্যমগুলোর এমন সাংবাদিকতা-পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা থাকা জরুরি, যা ভুক্তভোগীদের লজ্জিত বা দোষী সাব্যস্ত করে না।
বাংলাদেশেও সংবাদমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীলতা মেনে চলার জন্য বেশ কিছু নীতিমালা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) থেকে প্রকাশিত‘সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার দিগন্তে জেন্ডার’নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘ধর্ষণের ভুক্তভোগী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কী শব্দ ব্যবহার করবেন, সেটা খুব ভাবনাচিন্তার বিষয়। ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সর্বশেষ সংশোধনীতে (২০২০) ‘ধর্ষণের শিকার’ করা হয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম অনেক আগে থেকেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করছে।’
একই সঙ্গে নির্দেশিকাটি আরও একটি প্রশ্ন তুলেছে। ‘ধর্ষণের শিকার’ ব্যবহার করলেও ব্যক্তি মূলত ভুক্তভোগী পরিচয়ের মধ্যেই আবদ্ধ থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘ভুক্তভোগী’ শব্দটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ বিকল্প হতে পারে।
একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত উইমেন অ্যান্ড হিজরাস ইন বাংলাদেশি নিউজ মিডিয়া গবেষণায়, ‘ধর্ষিতা’ শব্দটিকে কটাক্ষরূপে ব্যবহৃত শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রথম আলোর নীতিমালায় ‘যথাসম্ভব’, বাকিদের কিছুই নেই
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতাই ভাষা পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে এবং সেই ভিত্তি তৈরির জায়গাটা সংবাদকক্ষ। এই পরিবর্তন সম্পাদকীয় চর্চার অংশ হওয়া দরকার। ৩০টি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা বা জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রতিবেদনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখেছে ডিসমিসল্যাব।
যাচাইয়ে দেখা যায়, শুধু প্রথম আলোর ওয়েবসাইটেই ধর্ষণ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা পাওয়া গেছে। প্রথম আলোর নারী নীতিমালার ‘ধর্ষণের খবর’ অংশে বলা হয়েছে, ‘ধর্ষিতা’ শব্দটির বদলে আমরা যথাসম্ভব ‘ধর্ষণের শিকার’ কথাটি ব্যবহার করি।”
এই নীতিমালা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন সাংবাদিক ও প্রশিক্ষক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা। সংবেদনশীল এক বিষয়ে ‘যথাসম্ভব’ শব্দটি কেন রাখা হয়েছে, এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “‘যথাসম্ভব’ বলতে মূলত বোঝানো হয়েছে, কোনো প্রতিবেদনে কারও বক্তব্যের মধ্যে যদি ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি থাকে, তাহলে সেটা কোটেশন মার্কের মধ্যে রেখে হুবহু সেভাবেই ব্যবহার করতে হবে। বা কোনো কবিতা বা গল্পের অংশ হলেও সেভাবে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ‘যথাসম্ভব’ রাখা হয়েছে।”
তবে গবেষণায় দেখা যায়, এই নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে প্রথম আলোর ৪টি প্রতিবেদনে ‘ধর্ষিতা’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, “আমরা ব্যবহার করলে সেটা ভুল। দেখলে অবশ্যই আমরা সংশোধন করব।”
দৈনিক প্রথম আলোতে ‘ধর্ষিতা’ শব্দের পরিবর্তে ‘ধর্ষণের শিকার’ লেখার সুপারিশ সংক্রান্ত খবর। ছবি: প্রথম আলোর ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
অন্যদিকে, বাকি ২৯টি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা পাওয়া যায়নি। যে ৬টি ওয়েবসাইটে জেন্ডার ইস্যুর উল্লেখ রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ‘আমাদের সম্পর্কে’ (about us) অংশে থাকা সংক্ষিপ্ত বিবৃতি। সেখানে মানবাধিকার, আইনের শাসন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জেন্ডার ইস্যুর প্রতি অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে।
কুররাতুল-আইন-তাহমিনার মতে এই অনুপস্থিতিই বড় সমস্যা। তিনি বলেন, “প্রথমত কোনো পত্রিকাতেই সম্পাদকীয় নীতিমালাটা প্রকাশ্যে নেই। এটা (জেন্ডার ইস্যুর প্রতি অঙ্গীকার) শুধু ‘আমাদের সম্পর্কে’ লেখা। এই নীতিমালা যে সব পত্রিকায় নেই বা থাকলেও যে তারা প্রকাশ করেনি এটা অ্যালার্মিং। এটা শুধুমাত্র প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার করেছে, তাও অনেক পরে। নীতিমালা না থাকার ফলে আপনি কোনো সংবাদমাধ্যমকে অ্যাকাউন্টেবল করতে পারেন না, কারণ আপনি জানেন না, পত্রিকাটি নীতিমালা মেনে চলছে না কি ভায়োলেট করছে।”
কেন ব্যবহৃত হচ্ছে শব্দটি- সংবাদমাধ্যমের ব্যাখ্যা
গবেষণায় সংবাদপত্র, টিভি এবং অনলাইন- প্রতিটি বিভাগে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা তিন সংবাদমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে ডিসমিসল্যাব। অনলাইন পোর্টাল হিসেবে ‘ঢাকা মেইল’, টিভি মাধ্যমে ‘চ্যানেল ২৪’ এবং পত্রিকার ক্ষেত্রে ‘যুগান্তর’ এর মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়। যুগান্তর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় ডিসমিসল্যাব যোগাযোগ করে শব্দটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চবার ব্যবহার করা ‘কালবেলা’-এর সঙ্গে।
কালবেলার হেড অব অনলাইন অমৃত মলঙ্গী বলেন, “আইন বিষয়ে বা ভাষাগত পলিসি বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, সংবাদ দ্রুত প্রকাশ করার প্রবণতা এবং সম্পাদক দ্বারা প্রতিবেদনের শব্দ যাচাই না করার ফলে এ শব্দগুলো রয়ে যায়।”
চ্যানেল ২৪-এর নিউজ এডিটর ও অনলাইন ইনচার্জ মাজহার খন্দকার বলেন, “শব্দগুলো এত বেশি প্রচলিত যে কিছু কিছু প্রতিবেদনে অসতর্কতাবশত এসেই যায়। এটা অবশ্যই সংবাদমাধ্যমের ত্রুটি।”
ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল বলেন, “সম্পাদনা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। আমরা সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকার চেষ্টা করি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কেবল একটি শব্দের নয়; বরং সংবাদকক্ষের সংস্কৃতি, প্রশিক্ষণ এবং সম্পাদকীয় চর্চার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরীর মতে, দীর্ঘদিনের ভাষাগত অভ্যাস রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। অনেক সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মী এখনো পুরোনো আমলের রিপোর্টিং পদ্ধতি এবং শব্দচয়নেই অভ্যস্ত।
মনিষা বিশ্বাসের মতে, সমস্যার একটি বড় কারণ সংবাদমাধ্যমে পর্যাপ্ত ওরিয়েন্টেশনের অভাব। তিনি বলেন, “হয়তো দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম দিনই তাকে রিপোর্টের জন্য কাজ করতে বলা হলো এবং সেই সঙ্গে সাংবাদিকতার যে কোড অফ কন্ডাক্ট আছে সেটা সম্পর্কে তাদেরকে আসলে ভালোমতো ওরিয়েন্ট করা হয় না। যার কারণে এই জায়গাগুলো যে তাদেরকে মাথায় রাখতে হয় সেগুলো নিয়ে আসলে অনেকটাই চ্যালেঞ্জ বা অনেকটাই ফাঁক থেকে যায়।”
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
আইনের ভাষা বদলালেও সংবাদমাধ্যমের ভাষায় এখনো সেই পরিবর্তন পুরোপুরি কেন আসেনি, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিশাত সুলতানা। তার মতে, সাংবাদিকরা যে পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে বেড়ে ওঠেন, তার চর্চা পেশায় এসেও ছাপ ফেলে, “সাংবাদিকরা তো আসলে ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী না। তারা তো আমাদের মতো মানুষ। সাংবাদিকও একই পেট্রিয়ারক্যাল নর্মস, বিহেভিয়ার প্র্যাকটিসের মধ্যে বড় হয়। এই পরিবর্তনের জন্য পরিবার, শিক্ষাক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্র— তিনটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ দরকার।”
কুররাতুল-আইন-তাহমিনার মতে, এখানে আইনের চেয়ে সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতাই মুখ্য, “আইন এ ক্ষেত্রে ততটা কার্যকর নয়। এমনকি আইনে কোনো ভুল শব্দ ব্যবহার হলে আমরা সেটা পরিবর্তন করতে বলব”। তার মতে, সাংবাদিকতার নৈতিকতাই বাধ্য করে সঠিক শব্দ ব্যবহার করতে, এমন শব্দ এড়িয়ে চলতে যা ভুক্তভোগীকে আরও দোষারোপ করে।
তার মতে, এই নৈতিকতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া দরকার। তাহমিনা বলছেন, প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের একটি কার্যকর স্টাইল গাইড থাকা উচিত, যা স্থির নয়, পরিস্থিতির সঙ্গে বদলায়, “সঠিক শব্দ ব্যবহারের জন্য দরকার স্টাইল গাইড অর্থাৎ ভাষারীতি যা পরিস্থিতি ভেদে পরিবর্তন করতে হবে। যা স্ট্যাটিক হবে না, ডাইনামিক হবে। স্টাইল গাইডটা এফেক্টিভ হতে হবে। এবং প্রয়োজনে কিছু বছর পর পর রিনিউ করতে হবে যেমনটা বিবিসি করে।”
শুধু শব্দ নয়, ভুক্তভোগীর গল্প কীভাবে বলা হচ্ছে সেটাও এই নির্দেশিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি, “একটা প্রতিবেদনে ভিকটিমের সংগ্রামটা তুলে না ধরাটাও নেতিবাচক ফ্রেমিং।”
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলেছেন - নিউজরুমে নিয়মগুলো দৃশ্যমান রাখা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন, নির্দিষ্ট সময় পরপর সতর্কবার্তা দেওয়া এবং একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি রাখা যিনি বিষয়টি নজরে রাখবেন। পাশাপাশি গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা জানে, এই বিষয়ে নজরদারি চলছে।
ব্যারিস্টার প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলছেন, ধীরে ধীরে এই শব্দের ব্যবহার কমে আসছে। নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় দায়বদ্ধতা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে এই পরিবর্তন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আর যার শুরুটা, তার মতে, হতে পারে যেখানে শব্দ নির্বাচন হয়, সেই সংবাদকক্ষে।
লেখক: আ স ম ফেরদৌস রহমান, ডেপুটি ম্যানেজার, ডিসমিসল্যাব এবং নোশিন তাবাসসুম, রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব