ধরুন একদিন হঠাৎ খেয়াল করলেন আপনার মনে অদ্ভুত আনন্দ ও উদ্দীপনা খেলা করছে। আপনার কাছে দুনিয়ার সবকিছু ভালো লাগছে। মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা করছে মনে। মানুষের সঙ্গে মিশতে বা আড্ডা দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু তারপর দেখলেন–এই ‘অতিমাত্রার সুখানুভূতি’ যেভাবে হঠাৎ করে এসেছিল, সেভাবে হঠাৎ করে উবে গেল।
দ্রুতই আনন্দ মুছে গিয়ে শুরু হয় ভীষণ জ্বর ও অসহ্য মাথাব্যথা। ফুসফুসে পচন ধরে। কফের সাথে বের হয় রক্ত। ডাক্তারের কাছে গেলেন। অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন তিনি। কিন্তু শরীরের অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতি হলো। ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকে কাঁপুনি ও খিঁচুনি। কমতে শুরু করে জীবনীশক্তি। আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর দোরগোড়ায়।
আপনি বুঝতেই পারছেন না আসলে কী হয়েছে। আসলে আপনার বোঝার কথাও নয়। কারণ, অজান্তেই এক ‘শক্তিশালী ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া’ আপনাকে আক্রমণ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবেই আপনার প্রবল ইচ্ছা হয়েছিল মানুষের সঙ্গে মেশার। এভাবেই প্রাণঘাতি জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে আরও অনেক মানুষের মাঝে।
ঠিক এমনই একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট উঠে এসেছে সামরিক বিষয়াদি ও যুদ্ধসংক্রান্ত একাধিক গ্রন্থের লেখক এবং সাংবাদিক অ্যানি জ্যাকবসেনের ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার: আ সিনারিও’ বইতে। বইটি বাজারে এসেছে একমাস হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ আলোচনা হচ্ছে এটি নিয়ে। হবে নাই-বা কেন! নন-ফিকশন বইটিতে জ্যাকবসেন যেভাবে তুলে ধরেছেন বায়োলজিক্যাল ওয়ারের এমন ‘সিনারিও’, যা কেবল হলিউডের কোন ধুন্ধুমার থ্রিলার মুভিতেই দেখা যায়।
তবে বইটি আদতেই একটি বড়সড় সতর্কবার্তা। ঠিক একই রকমের সতর্কবার্তা ছিল জ্যাকবসেনের আরেকটি বইয়ে। ‘নিউক্লিয়ার ওয়ার: আ সিনারিও’ ২০২৪ সালে প্রকাশিত। নাম দেখেই বোঝা যায় নতুন বইয়ের পূর্বসূরী পরমাণু যুদ্ধ নিয়ে লেখা বইটি। বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো যদি পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে দেয় তাহলে কী ঘটবে–সেই ‘হাইপোথেটিক্যাল’ পরিস্থিতিই জ্যাকেবসেন তুলে ধরেন বইটিতে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে একটি কাল্পনিক পারমাণবিক হামলার প্রতি মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছিলেন।
আবার একটু ফেরা যাক ‘বায়োজিক্যাল ওয়ার’-এ। কাল্পনিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সাইবেরিয়ার একটি সংক্রামক ব্যাধি গবেষণা কেন্দ্রে একটি বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে বিজ্ঞানীরা ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসকে আরও বেশি মারাত্মক, সংক্রামক এবং অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী করে তোলার জন্য সেগুলোর জিনগত পরিবর্তন আনছিলেন। সেই বিস্ফোরণে এক বিজ্ঞানী পরিবর্তিত ‘নিউমোনিক প্লেগ’-এ আক্রান্ত হন। ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মার্কিন বিশ্লেষকেরা সম্ভাব্য ল্যাব লিক বা গবেষণাগার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা শুরু করেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করা হয়, কিন্তু তার হাতে বিকল্প ছিল খুবই সামান্য। জ্যাকবসেন লিখেছেন, “কোনো জীবাণু যখন গবেষণাগার থেকে ছিটকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, ততক্ষণে নিশ্চিতভাবেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন ল্যাবেই তৈরি করা সম্ভব মারণঘাতী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস। ছবি: রয়টার্স
রুশ কর্মকর্তারা বিষয়টি ঢাকার চেষ্টা করেন এবং ‘অস্বাভাবিক নিউমোনিয়া-সদৃশ রোগের’ প্রাদুর্ভাবের জন্য একটি দূষিত মারমোটের মাংসকে দোষারোপ করেন (এটি বইটির এমন অনেক অনুচ্ছেদের একটি যা পাঠকদের কোভিড-১৯ এর কথা মনে করিয়ে দেবে)। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের জৈব-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সনাক্তকরণ প্রযুক্তিগুলো ব্যর্থ হয়। ৩৪ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে মাত্র ১০০টি আইসোলেশন বেড রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো এক সংস্থা অন্য সংস্থার সাথে শেয়ার করে না। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিফোর্নিয়ার গৃহহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্লেগের প্রাদুর্ভাবকে ভুলবশত মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবন (ওভারডোজ) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ‘সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি)-কে তা জানানো হয় না। ভুক্তভোগীদের ওপর প্লেগের প্রভাবের বিবরণ অত্যন্ত গা শিউরে ওঠার মতো বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে।
দ্রুতই জরুরি সেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আতঙ্ক উসকে দেয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। জারি করা হয় সামরিক শাসন। শুরু হয় সহিংস বিশৃঙ্খলা। সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য বা সরকারের যা অবশিষ্ট আছে তা টিকিয়ে রাখতে, ক্যাবিনেট কর্মকর্তাদের দূরবর্তী গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। জ্যাকবসেন লিখেছেন, “বায়োলজিক্যাল ওয়ারকে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক করে তোলে, শুধু বিপুলসংখ্যক হতাহত ও মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা না; বরং অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সক্ষমতা।”
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বইটি টানটান উত্তেজনার ও বেশ বিশ্বাসযোগ্যও এবং নীতি নির্ধারকদের উচিত এর সতর্কবার্তাগুলোতে কান দেওয়া। অবশ্য এমন সতর্কবার্তা যে জ্যাকবসেন প্রথমবার দিয়েছেন ব্যাপারটি এমন নয়।
অ্যানি জ্যাকবসেনের আলোচিত বই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার: আ সিনারিও’। ছবি: সংগৃহীত
কোভিড মহামারির অন্তত ৫ বছর আগে মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে আয়োজিত টেড টক-এ বলেছিলেন, “যদি আগামী কয়েক দশকে ১ কোটি মানুষ মারা যায়, তবে তা যুদ্ধ বা পারমাণবিক বোমার কারণে না হয়ে বরং খুব সংক্রামক কোনো ভাইরাসের কারণে হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং অণুজীবই হবে বড় হুমকি।”
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন বলছে, এর ঠিক ২ বছর পরে জার্মানিতে আয়োজিত মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে আবারও বিষয়টি নিয়ে বিশ্বনেতাদের আরেকটু ‘হেডস-আপ’ দেন। তিনি বিশেষ করে জৈবাস্ত্র ও জৈবসন্ত্রাস (Bioterrorism) এবং জিনগত রূপান্তর ঘটানো জীবাণুর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম ভাইরাস তৈরি করে, তবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া সেই জীবাণু এক বছরের কম সময়ে চোখের নিমিষেই কোটি কোটি মানুষ হত্যা করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গেটস বলেন, “দ্রুত সংক্রমণশীল একটি সংস্করণের সঙ্গে দ্রুত প্রাণঘাতী একটি সংস্করণের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ফ্লুয়ের নতুন কোনো ধরন জিনগতভাবে তৈরি করা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। পারমাণবিক যুদ্ধের মতো নয়, এই ধরনের ব্যাধি একবার ছড়িয়ে পড়লে কিন্তু এর সংক্রমণ বা মৃত্যু থামবে না।”
মিউনিখ কনফারেন্সে গেটস বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অপ্রস্তুতির প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন। যেমন–ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারগুলোর সমন্বয়হীনতা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব এবং সামরিক বাহিনীগুলোর সম্ভাব্য জৈব হুমকি মোকাবিলায় সাড়া দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা না করা।
এখন মনে হতে পারে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের এই যুগে কেউ কি এই ‘হুমকির’ কথা নিয়ে একটুও চিন্তা করেনি? উত্তর হলো–করেছে। পৃথিবীতে এখনো বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশন (বিডব্লিউসি) বলে একটা ‘কিছু’ আছে।
মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বহু আগে থেকে জৈব সন্ত্রাস নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। ছবি: রয়টার্স
বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশন (বিডব্লিউসি) হলো মানব ইতিহাসের প্রথম বহুপক্ষীয় সমন্বিত চুক্তি, যার মাধ্যমে এক বিশাল শ্রেণির গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে (জৈবাস্ত্র) আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি জাতিসংঘের অফিস ফর ডিসআর্মামেন্ট (নিরস্ত্রীকরণ) অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনওডিএ) অধীনস্থ।
১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত এবং ১৯৭৫ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তির মূল লক্ষ্য–কোনো দেশ যেন ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস বা বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার করে মানবজাতি, প্রাণী বা উদ্ভিদের ক্ষতি করার মতো কোনো অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহার করতে না পারে।
ইউএনওডিএ-এর অফিশিয়াল ওয়েবাসাইট ঘেঁটে জানা যায় বিডব্লিউসি মূলত ১৯২৫ সালের জেনেভা প্রোটোকলকে আরও শক্তিশালী ও পরিপূর্ণ করে তোলে, যেখানে কেবল বায়োলজিক্যাল ওয়েপন ‘ব্যবহার’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বিডব্লিউসি-এ অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো যেকোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসাগত, সুরক্ষামূলক বা শান্তিপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া কোনো প্রকার ক্ষতিকর অণুজীব, বিষাক্ত উপাদান বা টক্সিন তৈরি, সংগ্রহ ও মজুত না করার অঙ্গীকার করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধের ময়দানে বা শত্রুভাবাপন্ন উদ্দেশ্যে এসব উপাদান প্রয়োগের জন্য তৈরি করা সমস্ত অস্ত্র, সরঞ্জামসহগ যেকোনো ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করার দায়বদ্ধতা মেনে নিয়েছে।
কিন্তু এখানে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পারমাণবিক বা রাসায়নিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে আইএইএ ও ওপিসিডব্লিউ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি সংস্থা থাকলেও বিডব্লিউসি-এর অধীনে এমন কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো দেশ গোপনে জীবাণু অস্ত্র তৈরি করছে কি না, তা সরাসরি ল্যাবে গিয়ে পরিদর্শনের বিষয়টিও এই চুক্তির আওতায় পড়ে না।
বর্তমানের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্যাথোজেন বা জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন করার সহজলভ্য প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ–পাঁচ দশক পুরনো বিডব্লিউসি চুক্তিটিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং রসায়ন ও জীববিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই নিত্যনতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়ায় চুক্তির সেই ফাঁকফোকর ও দুর্বলতাগুলো এখন আরও স্পষ্টভাবে ভেসে উঠছে।
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ-এর গ্লোবাল বায়োলজিক্যাল পলিসি অ্যান্ড প্রোগ্রামস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট জাইমি ইয়াসিফ মার্কিন গণমাধ্যম ভক্সকে বলেন, “এটি মূলত প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন এবং আমাদের বায়ো-সিকিউরিটি ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের দৌড় প্রতিযোগিতা, যার লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি ভুল হাতে যাওয়ার আগেই সুরক্ষাবলয় তৈরি করা।”
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশনের নবম পর্যালোচনা সম্মেলনে দেশগুলো নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে, এই চুক্তিকে আরও শক্তিশালী করা দরকার, যাতে বর্তমানের বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
আবারও জ্যাকবসেনের বইয়ে ফিরে আসা যাক। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে বইটি বেশ বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু জ্যাকবসেন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘মিস’ করে গেছেন। তা হলো–কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অনুপস্থিতি। জ্যাকবসেনের বর্ণিত প্রেক্ষাপটের প্যাথোজেন বা জীবাণুটি স্নায়ুযুদ্ধের যুগের একটি স্মারক, যা সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছিলেন। তবে ভাইরোলজি এবং ব্যাকটেরিওলজি-সংক্রান্ত তথ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এআই মডেলগুলো এখন যেকোনো আনাড়ি মানুষকেও জৈবাস্ত্র প্রস্তুতকারকে পরিণত করতে পারে। সামনের সারির ল্যাবগুলো স্বীকার করেছে যে, এআই টুলগুলো প্যাথোজেন বা জীবাণুর নকশা তৈরিতে দিন দিন আরও দক্ষ হয়ে উঠছে।
এই ধরুন মার্কিন গণমাধ্যম ভক্সের এক প্রতিবেদনে একটি ভয়ানক ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানী শন একিন্স ও তার দল বিরল রোগের ওষুধ খোঁজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার ‘মেগাসাইন’ (MegaSyn)-কে ভিন্নভাবে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষতিকর উপাদান এড়িয়ে চলার বদলে তারা এআইটিকে মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগের নকশা তৈরির নির্দেশ দেন। প্রায় ২০ লাখ অণুর উন্মুক্ত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই মডেলটি মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে ভেনমাস এজেন্ট এক্স বা ভিএক্স-এর মতো মারাত্মক স্নায়ুঘাতী বিষসহ (নার্ভ এজেন্ট) প্রায় ৪০ হাজার প্রাণঘাতী আণবিক কাঠামোর ডিজিটাল নকশা তৈরি করে ফেলে।
পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ছিল এবং কোনো বাস্তব রাসায়নিক যৌগ তৈরি করা হয়নি। তবে উন্মুক্ত প্রযুক্তি ও সাধারণ ডেটাবেস ব্যবহার করে এত সহজে প্রাণঘাতী রেসিপি তৈরি হওয়া দেখে বিজ্ঞানীরা শিউরে উঠেছেন। একিন্স বলেন, “আমরা যদি এটা করতে পারি, তবে অন্য কাউকে এটি করা থেকে আটকাবে কে?”
ভিএক্স-এর মতো কেবল হত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ রাসায়নিক যৌগের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকলেও, প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ভাইরাস বা ডিএনএ-এর মতো দ্বৈত ব্যবহৃত (ভালো ও মন্দ উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত) উপাদানগুলোকে এআইয়ের মাধ্যমে প্রাণঘাতী জৈবাস্ত্রে রূপান্তর করা অত্যন্ত সহজ ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই ধরনের অণুজীব জিনগতভাবে তৈরি করার সরঞ্জামগুলোর দ্রুত উন্নতি ঘটছে এবং সরকারগুলো তা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার উচ্চ-সক্ষমতাসম্পন্ন ল্যাব আছে, যেখানে সহজে প্রবেশাধিকার মেলে না। এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোও চাইলেই এসব ল্যাবে প্রবেশ করতে পারে না। অর্থাৎ, এক রকম নড়বড়ে তদারকির মধ্যেই এসব ল্যাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্যাথোজেন নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এদিকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আছে ২০২৫ সালে জৈব-প্রতিরক্ষার জন্য ফেডারেল বাজেটের বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশের সংকোচন।
কোনো দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক জৈবাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা সৃষ্টিকর্তার কৃপায় খুবই বিরল। তবে ভবিষ্যতে যে হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়?
জ্যাকবসেন সোভিয়েত ইউনিয়নের জৈবাস্ত্র কর্মসূচির অন্যতম রূপকার ইগর ডোমারাদস্কির মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “জিনগত প্রকৌশলের (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং) আবির্ভাবের সাথে সাথে জৈবাস্ত্রের ভয়াবহ অনিশ্চয়তা সাই-ফাইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।”
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি এখন ‘ভয়ানক’ সত্য। পাঁচ দশকের পুরনো জৈবাস্ত্র রোধের দুর্বল চুক্তি আর জৈব-প্রতিরক্ষায় বাজেট ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত বিশ্বকে দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এআইয়ের সহজলভ্যতা এবং জিন প্রকৌশলের অভাবনীয় অগ্রগতি এখন যেকোনো বিপজ্জনক অণুজীবকে বানিয়ে তুলতে পারে মানবজাতি ধ্বংসের ব্যর্থ হাতিয়ার।
সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আমরা যেন, কেরোসিনে ভেজা এক চিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছি। খালি একটা দেশলাইয়ের অপেক্ষা। এই দেশলাই আসার আগে কী বিশ্বনেতাদের ঘুম ভাঙবে? নাকি আমরা এমন এক ‘হারানো’ সভ্যতায় পরিণত হব, যারা নিজেদের প্রযুক্তি দিয়ে নিজেদের ধ্বংস করেছে?