ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কেমন হবে, তা নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। গাড়ি আকাশে উড়বে, রোবট চিকিৎসা করবে, ড্রোনের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে যাবে ভোক্তার কাছে–না জানি আরও কত কিছু হবে! তবে একটি বিষয় নিশ্চিত – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI সেই ভবিষ্যতের প্রধান চালিকাশক্তি। ২০৩০ সাল এবং তারপরের পৃথিবীতে AI শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজ এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে আমূল বদলে দেবে। কিন্তু এই বিশাল পরিবর্তনের রাশ কাদের হাতে থাকবে? কোন প্রতিষ্ঠানগুলো AI-এর ওপর নির্ভর করে বিশ্বজুড়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার করবে? তাদের বর্তমান প্রভাব, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, গবেষণার গভীরতা, বাজার এবং বিভিন্ন শিল্পে AI প্রয়োগের সম্ভাবনা কতটা? এমনই ১০টি প্রতিষ্ঠানের গল্প বলবো আজ, যারা আগামী দিনের বিশ্বকে চালিত করবে।
আধিপত্যের দৌড়ে এগিয়ে যারা
মাইক্রোসফট: একসময় ডেস্কটপ সফটওয়্যারের রাজা হিসেবে পরিচিত মাইক্রোসফট এখন AI-এর দৌড়ে এক নম্বর খেলোয়াড়। OpenAI-এর সাথে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব (ChatGPT, DALL-E 3, Sora-এর মতো যুগান্তকারী মডেলগুলোর পেছনের শক্তি) তাদের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। Azure ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে AI ক্ষমতা যুক্ত করার মাধ্যমে তারা বিশ্বের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে AI সমাধান দিচ্ছে। GitHub Copilot এবং Microsoft 365 Copilot-এর মতো উদ্ভাবনী পণ্যগুলো কর্মীদের কাজের পদ্ধতিকে ইতিমধ্যেই বদলে দিয়েছে। এর ফলে মাইক্রোসফট ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
গুগল: AI গবেষণায় গুগলের নেতৃত্ব দীর্ঘদিনের। তাদের AI ক্ষমতা সার্চ ইঞ্জিন থেকে শুরু করে অ্যান্ড্রয়েড, ইউটিউব এবং ক্লাউড পরিষেবা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূলে প্রোথিত। জেমিনাই (Gemini) মডেলটি তাদের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সংযোজন, যা AI-এর ক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। Google Cloud-এর Vertex AI প্ল্যাটফর্ম এবং তাদের নিজস্ব TPU বা Tensor Processing Unit হার্ডওয়্যার AI মডেল প্রশিক্ষণের জন্য অপরিহার্য, যা গুগলের উদ্ভাবনী গতিকে সচল রাখবে। গুগলের ভান্ডারে থাকা বিশাল ডেটা এবং সার্চ ইঞ্জিনের ক্ষমতা তাদের AI-কে আরও তীক্ষ্ণ ও কার্যকর করে তুলছে।
এনভিডিয়া: AI হার্ডওয়্যারের অবিসংবাদিত সম্রাট এনভিডিয়া। জেনারেটিভ AI মডেল প্রশিক্ষণের জন্য অপরিহার্য তাদের GPU বা Graphics Processing Unit। NVIDIA-র H100 এবং নতুন B100 GPU-গুলো ডেটা সেন্টার এবং AI গবেষণার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। AI-এর ভবিষ্যৎ হার্ডওয়্যার নির্ভর আর সেখানেই NVIDIA-র আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের সফটওয়্যার ফ্রেমওয়ার্কগুলো AI-এর উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে তুলছে।
ওপেনএআই: ChatGPT, DALL-E এবং Sora-এর মতো যুগান্তকারী জেনারেটিভ AI মডেলের স্রষ্টা হিসেবে OpenAI। তারা AI শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাদের গবেষণা সরাসরি কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (AGI) তৈরির দিকে লক্ষ্য রাখে। মাইক্রোসফটের বিপুল বিনিয়োগ তাদের গবেষণা এবং পণ্যগুলিকে আরও বিস্তৃত করতে সাহায্য করছে। আর তাদের উন্মুক্ত মডেল এবং API-র দ্রুত AI-এর ব্যবহারকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাজন: অনলাইন খুচরা ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্যের পাশাপাশি আমাজন এখন AI-এর জগতেও এক শক্তিশালী খেলোয়াড়। আলেক্সা (Alexa), আমাজন গো স্টোর (Amazon Go Store) এবং তাদের শক্তিশালী রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিন–এ সবই AI চালিত। Amazon Web Services , যা আসলে AWS নামে পরিচিত। এই সেবা ক্লাউড কম্পিউটিং বাজারে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তারা তাদের ক্লাউড পরিষেবাগুলোতে AI কার্যকর করেছে ব্যাপকভাবে। এটি বিশ্বের অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের AI অবকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করবে।
মেটা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটি এখন জেনারেটিভ AI এবং ওপেন-সোর্স AI মডেলে প্রচুর বিনিয়োগ করছে। তাদের LLaMA (Large Language Model Meta AI) মডেল AI গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের বিপুল ব্যবহারকারীর ডেটা AI মডেল প্রশিক্ষণের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। মেটা তাদের মেটাভার্সকেও AI দিয়ে চালাতে চায়। যা আসলে ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
টেসলা: টেসলাকে কেবল একটি গাড়ি কোম্পানি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি AI এবং রোবোটিক্স কোম্পানি। তাদের চালকবিহীন ড্রাইভিং প্রযুক্তি AI-এর সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক প্রয়োগগুলোর মধ্যে অন্যতম। টেসলার গাড়ির বিশাল ডেটা সেট এবং Dojo সুপারকম্পিউটার AI মডেল প্রশিক্ষণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী। ভবিষ্যতে অপটিমাস (Optimus) রোবটের মতো তাদের AI চালিত রোবটগুলোও শ্রম বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে। এটা টেসলাকে AI-এর একটি প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
পালান্টিয়ার টেকনোলজিস: Palantir তাদের AI-চালিত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ইন্টিগ্রেশন প্ল্যাটফর্ম Foundry এবং Gotham-এর জন্য পরিচিত। তারা সরকারি সংস্থা, প্রতিরক্ষা এবং বড় এন্টারপ্রাইজগুলিকে জটিল ডেটা সেট বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তাদের AIP বা Artificial Intelligence Platform নিরাপদ ডেটার ওপর লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLMs) প্রয়োগের সুযোগ দেয়, যা তাদের একটি অনন্য অবস্থানে রেখেছে।
আইবিএম: আইবিএম দীর্ঘদিন ধরে AI গবেষণায় জড়িত এবং তাদের Watson প্ল্যাটফর্ম কথোপকথনমূলক AI, মেশিন লার্নিং এবং অটোমেশনে শক্তিশালী। তারা এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড AI সমাধান প্রদানে মনোনিবেশ করছে, যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের কর্মপ্রবাহ স্বয়ংক্রিয় করতে এবং ডেটা থেকে অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সাহায্য করে। হাইব্রিড ক্লাউড এবং AI-এর সমন্বয়ে আইবিএম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল রূপান্তরে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।
অ্যানথ্রপিক: OpenAI-এর সাবেক গবেষকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত Anthropic, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক AI মডেল, যেমন Claude তৈরি করছে। তারা AI-এর নৈতিক দিক এবং নিরাপত্তার ওপর বিশেষ জোর দেয়, যা ভবিষ্যতে AI-এর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিস্তারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের গবেষণা ও মডেলগুলো AI ইকোসিস্টেমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে
এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, বিশাল ডেটা এবং বিভিন্ন শিল্পে AI প্রয়োগের দক্ষতার কারণে আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী AI-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করবে। তাদের উদ্ভাবন শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকেই নয়, বরং অর্থনীতি, সমাজ এবং মানবজীবনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। AI-এর এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে টিকে থাকতে হলে এবং নেতৃত্ব দিতে হলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বোঝা অপরিহার্য। ভবিষ্যতে AI কীভাবে আমাদের জীবনকে আরও বদলে দেবে, তা দেখার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।