সকালে দাদি মাহফুজা বেগমের কাছে গিয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘মা, তোমার নাতিকে জামাকাপড় পরিয়ে দাও। ওকে নিয়ে বাজারে একটু ঘুরতে যাব।’
দেড় বছরের শিশু মুসাকে সাজিয়ে দেওয়ার পর তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বাবা মো. মারুফ। কিন্তু দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও বাবা-ছেলের কেউ আর বাড়িতে ফেরেননি।
উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা শুরু করেন খোঁজাখুঁজি। এরপর তাদের সামনে আসে আরও বিস্ময়কর এক অভিযোগ—আইফোন কেনার জন্য নিজের দেড় বছরের শিশুপুত্রকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন মারুফ।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের মুন্সিবাড়ি এলাকায় গতকাল শনিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত মারুফ ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে এবং পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি।
শিশুটির দাদি ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, গতকাল শনিবার সকাল ৮টার দিকে মারুফ মুসাকে নিয়ে বাজারে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। দীর্ঘ সময়েও তাদের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু করেন। একপর্যায়ে মারুফের মামা বাহাদুর মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রথমে তিনি শিশুটির বিষয়ে কিছু স্বীকার করেননি বলে পরিবারের দাবি।
তবে পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মারুফ স্বীকার করেন যে, আইফোন কেনার জন্য তিনি তার ছেলে মুসাকে দশমিনা উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের রোমানাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে এক লাখ টাকায় লিখিতভাবে বিক্রি করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য, শিশুটিকে বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিয়ে ঢাকায় গিয়ে একটি পুরোনো আইফোন বদলে নতুন একটি আইফোনও কিনেছেন মারুফ।
শিশুটির দাদি মাহফুজা বেগম বলেন, প্রায় চার বছর আগে সাভার থেকে বৃষ্টি নামে এক তরুণীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন মারুফ। প্রায় তিন বছর পর তাদের ঘরে মুসার জন্ম হয়।
মাহফুজা বেগম জানান, ‘‘প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিষয় নিয়ে মারুফ ও তার স্ত্রীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হলে বৃষ্টি বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর কিছুদিন বাড়িতে থেকে মারুফ ঢাকায় চলে যান। গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগে তিনি বাড়িতে ফেরেন।
শিশুটির দাদি বলেন, ‘‘শনিবার সকালে মারুফ আমাকে বলে, মা, তোমার নাতিকে জামাকাপড় পরিয়ে দাও। আমি ওকে নিয়ে বাজারে একটু ঘুরতে যাব। এরপরে পরে সন্ধ্যা হয়ে গেলেও ছেলে ও নাতির কোনো খোঁজ পাইনি।’’
মাহফুজা বেগম জানান, তারা খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারেন, আইফোন কেনার জন্য এক লাখ টাকার বিনিময়ে মুসাকে বিক্রি করেছেন বলে মারুফ স্বীকার করেছেন। এই বৃদ্ধা বলেন, ‘‘আমি আমার নাতিকে ফিরে পেতে চাই। প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।’’
অন্যদিকে, শিশুটিকে কেনার অভিযোগ উঠেছে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি জানান, মারুফ দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে শিশুটিকে দেওয়ার কথা বলে আসছিলেন।
ইমরান জানান, তার শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণেই মারুফের সঙ্গে আলোচনা করে এক লাখ টাকার বিনিময়ে লিখিতভাবে শিশুটিকে নিয়েছেন। পরে শিশুটিকে তার শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে এসেছেন বলেও জানান ইমরান।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক বছর আগে মারুফ সাভার থেকে এক তরুণীকে বিয়ে করে বাড়িতে আনেন। পরে পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তারা দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ সরেজমিনে কাজ করছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’’