প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য অনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতি এবং তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় বহুমাত্রিক এক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশের অর্থনীতির এসব বহুমুখী ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৫৬ শতাংশ মানুষ সরাসরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিচু ভূখণ্ড, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দারিদ্র্যের কারণে তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং প্রতি দুই থেকে তিন বছর পর আঘাত হানে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদনের জন্য সার ও জ্বালানির ওপর চরম নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ কাঠামোগতভাবেই খাদ্য নিরাপত্তার ধাক্কার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এপ্রিল ২০২৬’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি ও সরকারি কোষাগারের ঘাটতি যথাক্রমে জিডিপির শুন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বিগত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। টানা তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ব্যাংকিং খাতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নির্ধারিত সর্বনিম্ন ১০ শতাংশের অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
সীমিত কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ২০২৫ সালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বাহ্যিক ধাক্কার কারণে ২০২৬ সালে প্রত্যাশিত ১৭ লাখের পরিবর্তে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। ছবি: বাসস
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “যে ধরনের ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে, সে তুলনায় ছয় লাখ মানুষের সংখ্যা ছোট। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে এই যে আমাদের বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংকট কাটাতে না পারলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এগুলোই এখন সবচেয়ে বড় কনসার্ন।”
খাতভিত্তিক প্রধান ঝুঁকি
এ ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতে বিশেষভাবে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-
জ্বালানি খাত
দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ৫০ শতাংশের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫-৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সংঘাতের ফলে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। খোলা বাজারে এলএনজির দাম দ্বিগুনেরও বেশি বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪-২৮ ডলারে পৌঁছেছে। এতে ২০২৬ অর্থবছরে জ্বালানি ভর্তুকির বোঝা দাঁড়াবে ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ), যা বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা এবং সামাজিক খাতের ব্যয় সংকুচিত করছে।
খাদ্য ও কৃষি খাত
কৃষি উপকরণের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। হেক্টরপ্রতি সারের ব্যবহার ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুনেরও বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, যা বাজারে ইউরিয়ার দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। উপকরণ ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
স্বাস্থ্য খাত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ছয় হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে প্রায় শুন্য দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ব্যবহার্য সামগ্রীর ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিকৃত এবং এর ওপর ৩৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। এই পরিচালন সংকটের মাঝেই ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে ৪০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বেসরকারি খাত ও শ্রমবাজার
২০২৫ অর্থবছরে বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে গড়ে ২৬ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখোমুখি হয়, যাতে বার্ষিক বিক্রয়ের ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন চাকরির ৭০ শতাংশই ছিল নিম্ন উৎপাদনশীল কৃষি খাতে। ২০২১ সালের মে মাস থেকে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতের সংকট মূলত অন্য খাতগুলোর সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। একদিকে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হওয়া, অন্যদিকে কৃষির জন্য জরুরি বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বেকারত্ব বাড়ছে। ছোট ছোট উদ্যোগ পড়ছে সংকটে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন চরচাকে বলেন, “শুধু সংখ্যা দিয়ে বেকারত্বের তীব্রতা বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশের অনেক মানুষ আছে, যারা দিন আনে দিন খায়। সংকট সমাধানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে। আমরা নানা রকম উদ্যোগ দেখেছি। অনেক উত্তম চর্চাভিত্তিক আইন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এগুলো হচ্ছে সম্মিলিত ব্যর্থতার কারণে। করপোরেট গভর্ন্যান্স, রেগুলেটর গভর্ন্যান্সের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝামেলাগুলো হয়েছে। ওই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন না আসলে সংকট সমাধান সম্ভব না। চিকিৎসা কীভাবে করতে হয় আপনি জানেন, কিন্তু চিকিৎসা প্রয়োগ করতে গিয়ে আমাদের ঝামেলা হচ্ছে।”
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট ও পূর্বাভাস
বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস জুন-২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের ঘাটতি তৈরি করেছে এবং জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যে ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতি সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বা তার নিচেই রয়েছে। তবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়েই রয়েছে এবং মুদ্রানীতি কঠোর অবস্থায় আছে।
সংঘাতের তীব্রতা হ্রাস পাওয়ার পর অঞ্চলের আর্থিক পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হলেও কয়েকটি দেশে তা যুদ্ধের আগের তুলনায় এখনও জটিল অবস্থায় রয়েছে এবং কিছু মুদ্রার ওপর চাপ অব্যাহত আছে। অনেক দেশে- বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। পর্যটনে ব্যাঘাতও আর্থিক খাত ও বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য আরও নষ্ট করেছে, যার মধ্যে মালদ্বীপও রয়েছে।
সংঘাত-সংক্রান্ত উচ্চ অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতে এই বছরের প্রথম দিকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম মজবুত ছিল, যার পেছনে রয়েছে স্থিতিশীল অভ্যন্তরীণ চাহিদা। গ্রামীণ এলাকায় বিশেষ করে ব্যক্তিগত ভোগ শক্তিশালী ছিল এবং শহুরে চাহিদা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বিক্রয় থেকে কর সংগ্রহও ক্রমাগত বেড়েছে। উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং কৃষিপণ্য- বিশেষ করে সারের ঘাটতির কারণে সৃষ্ট মূল্যচাপ মোকাবিলায় ভারতে জ্বালানি কর হ্রাসসহ কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও নেপালে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমেছে, কিন্তু দুর্বল বিনিয়োগকারী মনোভাবের কারণে বেসরকারি কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। এই দেশগুলোতে আর্থিক খাত এখনো ভঙ্গুর। কারণ এখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী এবং সম্পদের মান অবনতি হচ্ছে। বিপরীতে, ২০২৫ সালের শেষে ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ-এর ব্যাঘাতের পর শ্রীলঙ্কায় কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে। ভুটানেও নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা সহায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিরূপ প্রভাব- যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস এবং রেমিট্যান্স ও পর্যটনে ব্যাঘাত। তবে জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সামান্য বাড়ানো হয়েছে। এর কারণ কয়েকটি অর্থনীতিতে আগের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মজবুত অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি।
দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারত বাদে অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশে বিনিয়োগ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে জানুয়ারির তুলনায় বাংলাদেশসহ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির অনুমান কমানো হয়েছে। ২০২৭-২৮ সালে সংঘাত কমলে প্রবৃদ্ধি গড়ে ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
রাজস্ব ও বৈদেশিক ভারসাম্য ২০২৬ সালে অবনতি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে। মূল্যস্ফীতি এ বছর বাড়লেও ২০২৭-২৮ সালে কমে আসতে পারে।