দুপুর ১২টা। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগ। হাসপাতালের নিচতলার মেইন গেটের সামনে ভিড়। রোগীরা ঢুকছেন, বের হচ্ছেন। গেটের এক পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি। এদিক-ওদিক দেখছেন আর মাঝে মাঝে রোগীদের হাত থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে চেক করছেন। ডাক্তার কোন ওষুধ লিখলেন, তার কোম্পানির ওষুধ কয়টা লিখেছেন, অন্য কোম্পানির কয়টা- তাদের যত আগ্রহ এ নিয়েই।
একজন বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে প্রথমে রাজি হলেন না। অনেক অনুরোধের পর কিছু বলতে রাজি হলেন। জানালেন, তার নাম রবিউল ইসলাম। তার স্বার্থ বিবেচনায়ই তার কোম্পানির নাম গোপন রাখা হলো। প্রতিদিন সকাল ১০টায় তিনি এখানে আসেন। তার ডিউটি হলো- এখানকার কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, ডাক্তার কোন কোন কোম্পানির ওষুধ লিখলেন- সেটা নোট করা এবং ডাক্তারদের তার কোম্পানির ওষুধ লিখতে অনুরোধ করা। তবে মুখের কথায় এখানেও চিড়া ভেজে না, এখানেও থাকে কিছু লেনদেনের সম্পর্ক।
লেনদেনের হিসাব কেন আসছে? রবিউল ইসলাম চরচাকে কিছু ধারণা দিলেন এ ব্যাপারে, “বাংলাদেশে বহু ওষুধ কোম্পানি আছে। তারা প্রায় একই ধরনের ওষুধ উৎপাদন করে। তাহলে অন্যগুলো বাদ দিয়ে তিনি আমার কোম্পানির ওষুধ কেন প্রেসক্রাইব করবেন? আমাদের কোম্পানির ওষুধের মান ভালো, এই জন্য? সেটাও না। এখানে স্যার (ডাক্তার) ও কোম্পানির মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। স্যার যদি আমাদের দিকে একটু দেখেন, আমরাও তার দিকটা দেখব। বাকিটা আপনি বুঝে নেন।”
একই ঘটনা দেখা গেল তার পাশের ভবনে, অর্থাৎ হাসপাতালের দ্বিতীয় ভবনের নিচতলায়। সেখানেও একই রকম পরিস্থিতি। প্রধান গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি। এখানেও প্রথমে কিছু বলতে রাজি না হওয়া একজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হলো অনেক অনুরোধের পর। এই বিক্রয় প্রতিনিধির নাম আনিসুজ্জামান খান। তার কোম্পানির নামও গোপন রাখা যাক। তিনিও মাঝে মাঝে রোগীদের প্রেসক্রিপশন চেক করছেন এবং দেখছেন, তার কোম্পানির ওষুধ কয়টি লেখা হয়েছে।
আনিসুজ্জামান খান চরচাকে বলেন, “এখানে আমাদের দাঁড়ানো নিষেধ। দেখুন, আশপাশে আনসার সদস্যরা ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু আমি যদি আমার কাজ না করি, তাহলে কোম্পানি আমার কমিশন দেবে না। তাই যেভাবেই হোক, আমাকে আমার কাজ করতেই হবে। নয়তো মাসিক টার্গেট পূরণ করতে পারব না।”
শুধু রবিউল ও আনিসুজ্জামানই নয়, সারা দেশে এমন হাজারো বিক্রয় প্রতিনিধি ডাক্তারদের পেছনে ধরনা দিচ্ছেন তার কোম্পানির ওষুধ যেন প্রেসক্রাইব করা হয়, সেটা নিশ্চিত করতে। এর জন্য ডাক্তারদের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য যা যা করা লাগে, বা যা দেওয়া লাগে, তার ব্যবস্থা কোম্পানির মাধ্যমে করতে তারা প্রস্তত।
তবে চমকে ওঠার মতো একটা তথ্য দিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিক্রয় প্রতিনিধি। জানালেন, শুধু ছোটখাটো গিফট বা টাকা-পয়সাই নয়, নিজেদের ওষুধ প্রেসক্রাইব করানোর জন্য কোনো কোনো ডাক্তারকে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট পর্যন্ত উপহার দেয় কিছু কিছু কোম্পানি। কারণ, এসব ডাক্তার মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রিতে এতটাই প্রভাব রাখেন যে, এই টাকা তুলে আনতে কোম্পানির খুব বেশি সময় লাগে না। দেশে কোন ওষুধ বেশি চলবে, আর কোনটা চলবে না- সেটা নির্ভর করছে এসব ডাক্তারের ওপর। তারা যে ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন, সেটাই খেতে বাধ্য হবেন রোগী।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মো. শফিকুল বারী। জানালেন, বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। “আমি সব সময় এসব কোম্পানি ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। আমার চেম্বারের আশপাশে তাদেরকে আসতে দিই না। অনৈতিক কিছু গ্রহণ করার তো প্রশ্নই ওঠে না”, চরচাকে বলেন ডা. শফিকুল বারী।
তবে দেশের অনেক ডাক্তারের ক্ষেত্রে সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধের নাম লেখার অভিযোগ একেবারে নাকচও করছেন না ঢামেকের এই ডাক্তার, “যেহেতু প্রসঙ্গটি উঠছে, তার মানে হয়তো বিষয়টার সত্যতা আছে। সেই বিষয়ে আমি জানি না। আমার বলাও ঠিক হবে না। আমি শুধু আমার বিষয়েই বলতে পারব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক অধ্যাপক ও ওষুধপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. সীতেশ চন্দ্র বাছারও অবশ্য এই অভিযোগ ঢালাওভাবে করার ব্যাপারে রাশ টানতে চাইলেন। চরচাকে তিনি বলেন, “যে অভিযোগটা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে উঠছে, সেটা কিছুটা সত্য। কিছু ডাক্তার আছেন, যারা এই কাজটি করেন। তবে সব ডাক্তার সেটা করেন না।”
কিন্তু কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে তাদের ওষুধ লিখে দেওয়ার কাজটা কীভাবে হয়? এ ক্ষেত্রে আসলে করণীয় কী আর ‘সুবিধাভোগী’ ডাক্তাররা কী করেন, সে ব্যাপারে ধারণাও দিলেন ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার, “মনে করুন, একজন রোগীর জ্বর হয়েছে। ডাক্তার ওষুধের নাম লিখলেন ‘নাপা’। কিন্তু এটা না লিখে তিনি লিখতে পারতেন ‘প্যারাসিটামল’। নাপা একটা কোম্পানির ওষুধের নাম। আর প্যারাসিটামল হলো সেই ওষুধের গ্রুপের নাম। তিনি যদি প্যারাসিটামল লিখতেন, তাহলে ফার্মেসিতে গিয়ে যেকোনো কোম্পানির ওষুধ রোগী কিনতে পারতেন। তিনি (ডাক্তার) সেটা না করে একটা কোম্পানির ওষুধ বিক্রির জন্য তিনি সেই কোম্পানির ওষুধের নাম লিখেছেন। এটা অনৈতিক।”
এই জায়গায় অবশ্য শুধু ডাক্তারদেরই সব দায় দিতে রাজি নন ড. সীতেশ। ফার্মেসির কর্মীদের অদক্ষতার কথাও টেনে আনলেন তিনি, “আমাদের দেশের ফার্মেসির কর্মীরাও অদক্ষ। তাই প্রেসক্রিপশনে যা লেখা আছে, তিনি সেটাই দিচ্ছেন। তিনি যদি সেই গ্রুপ অনুযায়ী ওষুধ সাজেস্ট করতেন, তাহলে ডাক্তাররা এই অনৈতিক কাজ করতে পারবেন না।”
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপকের কথা মানতে রাজি নন রাজধানীর খিলগাঁওয়ে অবস্থিত মোল্লা মেডিকেল হল ফার্মেসির কর্ণধার হোসাইন। তিনি পুরো দায় ডাক্তারদের ওপরই চাপিয়েছেন। চরচাকে হোসাইন বলেন, “যত যা-ই বলা হোক না কেন, ডাক্তাররা যদি অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ওষুধ লিখেন, তাহলে আর কোনোভাবে এটাকে প্রতিহত করা যাবে না। কারণ, ধরুন আমি সেই গ্রুপ অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করলাম রোগীর কাছে। রোগী যখন পরে আবার সেই ডাক্তারের কাছে যাবেন এবং ডাক্তার যখন দেখবেন তিনি যে ওষুধ লিখে দিয়েছেন, সেটা না কিনে রোগী অন্য কোম্পানির ওষুধ কিনেছেন, তখন তার চিকিৎসা করবেন না তিনি। তাহলে বিষয়ট কী দাঁড়াল? এখানে ডাক্তাররাই সব। তারা যদি সৎ না হন, তাহলে অন্য কোনো কিছু করে লাভ নাই।”
ডাক্তারদের পেশাদারত্বের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন চরচাকে বলেন, “কোনো ডাক্তার যদি কোম্পানির কাছে থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ভুল ওষুধ বা বাড়তি ওষুধ লিখে থাকেন, তার বিরুদ্ধেও অডিটের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আর সবাই তো এটা করে না, কিছু অসাধু ডাক্তার হয়তো এটা করতে পারে। তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা থাকা দরকার।”
কমিশন যত বেশি, ওষুধের বিক্রিও তত বেশি?
দেশের ওষুধ বিক্রির পরিমাণ অনেকাংশে নির্ভর করে কমিশনের ওপর। ফার্মেসির লাভের হিসাবই তো কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া কমিশনের ওপর দাঁড়িয়ে, ডাক্তারদের অনেকেও কোম্পানির ওষুধের নাম লেখার বিনিময়ে লোকচক্ষুর অগোচরে কমিশন পান। যেসব কোম্পানির ওষুধের কমিশন বেশি, সেসব ওষুধ ডাক্তাররাও প্রেসক্রাইব করেন, আবার ফার্মেসিও সেই ওষুধ বিক্রি করতে বেশি উৎসাহ পান। ফার্মেসির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একেক কোম্পানির কমিশন একেক রকম। কোনো কোম্পানির কমিশন ১২ শতাংশ। আবার কোনো কোম্পানির কমিশন ১৩, ১৪ বা ১৫ শতাংশ। আবার মাঝে মাঝে একেক ওষুধের ওপর একেক ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, জরুরি ওষুধ ও সাধারণ ওষুধের কমিশন আলাদা নয়। তবে অনেক সময় জরুরি ওষুধ না থাকলে ফার্মেসিগুলো সাধারণ ওষুধ বিক্রি করে। তখন লাভ বেশি হয়। কারণ, জরুরি ওষুধগুলো সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে বাধ্য কোম্পানিগুলো। কিন্তু এই তালিকার বাইরে থাকা ওষুধগুলোর দাম কত হবে, সেটা সেই কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। এখানে সরকারের বাঁধাধরা নিয়ম থাকে না।
এখানেও ডাক্তারদের প্রসঙ্গ চলে আসে। অভিযোগ আছে, অনেক ডাক্তারের সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে কমিশনের গোপন চুক্তি থাকে। ওই কোম্পানির ওষুধ ‘চুক্তিবদ্ধ’ ওই ডাক্তার যে পরিমাণে প্রেসক্রাইব করবেন, সেই পরিমাণ হিসাব করে কমিশন পাবেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন চরচাকে বলেন, “বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে অনলাইনে প্রেসক্রিপশন লেখা হয়। এতে যে ডাক্তার যে রোগের জন্য যে ওষুধ লেখেন, তার একটা ডকুমেন্ট থাকে। যদি কখনো এই রোগীর কোনো সমস্যা হয়, তখন সেটা নিয়ে অডিট করার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশেও এই সিস্টেমটা চালু করা দরকার।”