জরুরি ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করে দেওয়ায় সেসব ওষুধের দাম বেশি রাখতে পারছে না ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো। তাই তারা এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। তারা সরকারি তালিকায় থাকা এসব জরুরি ওষুধের সঙ্গে অন্য উপাদান মিশিয়ে নতুন নামে ওষুধটি বাজারজাত করছে এবং চড়া দামে বিক্রি করছে।
এই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জরুরি ওষুধের দাম সরকার এমনভাবে নির্ধারণ করেছে, যেটা দিয়ে উৎপাদন খরচই উঠছে না। তাই অন্য ওষুধ উৎপাদন করে টিকে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তারা বলছেন, জনগণের পকেট কাটার জন্য কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল হাতে নিচ্ছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) সূত্রে জানা যায়, প্রায় প্রতিটি কোম্পানিরই এসব জরুরি ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার জন্য লাইসেন্স নেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে তারা তা উৎপাদন করছে না। তারা সেই মূল উপাদান বা জেনেরিকের সঙ্গে আরেকটা উপাদান মিলিয়ে নতুন ওষুধ উৎপাদন করছে। আর যখন এটা করা হচ্ছে, তখন সেটা আর সরকারি তালিকার জরুরি ওষুধ থাকছে না। তখন এর দাম নিজেদের মতো করে নির্ধারণ করতে পারছে কোম্পানিগুলো। অনেক সময় দেখা গেছে, মূল জেনেরিকের উৎপাদিত ওষুধের দাম যেটা, তার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ-চারগুণ বা কখনো ১০ গুণ দাম ধরা হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে প্যারাসিটামলের কথাই ধরা যাক। প্যারাসিটামলকে যদি মূল ড্রাগ ধরা হয়, তাহলে তার সঙ্গে বিভিন্ন সাধারণ ড্রাগ মিলিয়ে নতুন কম্বিনেশনের ওষুধ তৈরি করছে কোম্পানিগুলো। এটি মূলত ওষুধ কোম্পানিগুলোর অভিনব কৌশল। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছে।
যেমন জ্বর বা শরীরে সাধারণ ব্যথার জন্য প্যারাসিট্যামল ৫০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। সরকার একে জরুরি ওষুধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তাই কোম্পানিগুলো চাইলেই এর দাম বাড়াতে পারে না। এর প্রতি ট্যাবলেটের খুচরা দাম নির্ধারণ করা আছে ১ টাকা ২০ পয়সা। ১০ টি ট্যাবলেটের এক পাতার দাম ১২ টাকা। এই নিয়ন্ত্রিত দামের কারণে কোম্পানিগুলোর মুনাফা কম হয়। ঠিক এই কারণেই তারা কম্বিনেশন ওষুধের কৌশলটি বেছে নেয়।
তীব্র মাথাব্যথার ক্ষেত্রে ভালো কাজ করবে–এই অজুহাত দেখিয়ে কোম্পানিগুলো ৫০০ মিলিগ্রাম প্যারাসিটামলের সঙ্গে ৬৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন মিশিয়ে দেয়। এরপর তারা বাজারে এক্সট্রা বা প্লাস নামে নতুন ওষুধ ছাড়ে। নামমাত্র মূল্যের এই ক্যাফেইনটুকু মেশানোয় ট্যাবলেটের দাম একলাফে বাড়িয়ে ২ টাকা করা হয়। দশটি ট্যাবলেটের এক পাতার দাম তখন দাঁড়াচ্ছে ২০ টাকা। সামান্য একটু ক্যাফেইন যোগ করার কৌশলে কোম্পানিগুলো মূল প্যারাসিটামলের চেয়ে প্রায় ১.৭ গুণ বেশি দাম নিচ্ছে।
বেশি দামের বিকল্প ওষুধের চাহিদা বাড়ছে, বিপাকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। ছবি: চরচা
একইভাবে মাইগ্রেনের ব্যথা এবং বমি ভাব দূর করার নাম করে কোম্পানিগুলো ৫০০ মিলিগ্রাম প্যারাসিটামলের সঙ্গে ২০ মিলিগ্রাম ডমপেরিডন ড্রাগটি মিশিয়ে দেয়। ডমপেরিডন শুধু কাঁচামাল হিসেবে দাম দাঁড়ায় ২০ থেকে ৩০ পয়সা, একটি পূর্ণাঙ্গ ট্যাবলেট হিসেবে ডমপেরিডনের দাম ১.৫ টাকা বা তার কিছু বেশি হতে পারে। প্যারাসিটামলের সাথে যখন যুক্ত করার কথা আসে, তখন কিন্তু ডমপেরিডন কাঁচামালই যুক্ত হয়। কিন্তু এভাবে যুক্ত করে যে কম্বিনেশন বানানো হয়, তার প্রতি পিস ট্যাবলেটের দাম রাখা হয় ৩ টাকা থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সা। সামান্য এই মিশ্রণের অজুহাতে রোগীদের কাছ থেকে মূল প্যারাসিটামলের চেয়ে প্রায় আড়াই থেকে ৩ গুণ বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।
আরও বেশি দাম নেওয়া হয় সর্দি, নাক বন্ধ বা কাশির সমস্যার কথা বলে। কোম্পানিগুলো প্যারাসিটামলের সঙ্গে ক্লোরফেনিরামিন ম্যালেট এবং ফেনাইলেফ্রাইনের মতো সস্তা ও সাধারণ কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন ড্রাগ মিলিয়ে দেয়। এরপর বাজারে কোল্ড বা ফোর্ট ট্যাবলেট ছাড়ে। রোগীদের একাধিক ওষুধ আলাদাভাবে কেনার ঝামেলার কথা বুঝিয়ে কোম্পানিগুলো এক ট্যাবলেটের ভেতরেই এগুলো পুরে দেয়। এর ফলে প্রতি পিসের দাম হাঁকায় ৩ টাকা থেকে ৪ টাকা। এর মাধ্যমে তারা সুকৌশলে সাধারণ ও জরুরি ওষুধ প্যারাসিটামলের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বা ৪ গুণ বেশি দাম নিচ্ছে।
প্যারাসিটামলের সঙ্গে ডেক্সট্রোপ্রোপ্রক্সিফেন বা অন্য তীব্র ওপিয়ড কম্বিনেশনে আরও বেশি দাম রাখা হয়। স্নায়ুর তীব্র ব্যথা বা ক্যানসারের ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত এই ধরনের কম্বিনেশন ক্যাপসুল বা ট্যাবলেটগুলোর প্রতি পিসের দাম ব্র্যান্ডভেদে ১২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা মূল প্যারাসিটামলের চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি।
প্যারাসিটামল একটা উদাহরণমাত্র। এমন জরুরি প্রায় ১১৭টি ড্রাগসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এতে ওষুধগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে কেমিস্ট ল্যাবরেটরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম সারওয়ার চরচাকে বলেন, “সরকার বহু বছর আগে এসব জরুরি ওষুধের দাম নির্ধারণ করেছে। আর বর্তমানে ডলারের দাম, কাঁচামালের দামসহ অন্য সবকিছুর দাম বেড়েছে। এই সময়ে এসে আমরা জরুরি ওষুধ উৎপাদন করে টিকে থাকতে পারব না। এসব ওষুধে লাভ হয় না। অনেক ওষুধে লস হয়। সরকারের বিষয়টি চিন্তা করা উচিত।”
মূল জেনেরিকের সঙ্গে অন্য জেনেরিক মিশিয়ে নতুন ওষুধ তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে একেক কোম্পানির পলিসি একেক রকম। কেউ যদি মনে করে একটা ড্রাগের সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দিলে রোগীর কোনো জটিল রোগ সারবে, তাহলে তারা তা করতে পারে।”
সরকারের তালিকাভুক্ত ১১৭টা জরুরি ওষুধ কেমিস্ট ল্যাবরেটরিজে উৎপাদন হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কিছু ওষুধ উৎপাদন করি। আর কিছু করি না। যেগুলো করি সেগুলোতে লাভ থাকে না।”
ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে ভোক্তারা বলছেন অন্য কথা। তারা বলছেন, রোগীদের পকেট কাটতেই তারা বিভিন্ন অজুহাত দিচ্ছে। ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা আব্দুর রহিম চরচাকে বলেন, “চোর কি কখনো বলে যে, আমি চুরি করেছি? কখনো কোনো ব্যবসায়ী বলেছে যে, তার অনেক টাকা লাভ হচ্ছে? তারা যত লাভ করতে পারবে, তত আরও লাভ করার জন্য, মানুষের পকেট কাটার জন্য নতুন নতুন কৌশল হাতে নিবে।”
্রাররজধানীসহ বিভিন্ন জেলার ফার্মেসি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোম্পানির প্রতিনিধিরা ওষুধ বিক্রির জন্য ফার্মেসি মালিকদের সঙ্গে কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। যেমন, যখন কোনো কোম্পানি একটা ওষুধ বেশি বিক্রি করতে চায়, তখন সেই ওষুধে বেশি কমিশন দিয়ে দেয়, ফার্মেসি মালিকদের বিভিন্ন গিফট দেয় ও পাঁচ বক্সের সঙ্গে এক বক্স ফ্রি–ইত্যাদি কৌশল নেয়। তখন যে ফার্মেসি ওষুধটা বিক্রি করে, তার লাভ বেশি। ফলে ফার্মেসি থেকেও ওষুধগুলো গ্রাহককে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে মোল্লা মেডিকেল হল ফার্মেসির কর্ণধার হোসাইন চরচাকে বলেন, “মূলত একেক কোম্পানির ওষুধে একেক রকম কমিশন থাকে। কমিশন থাকে ১২ শতাংশ থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। জরুরি ওষুধের কমিশন ও কম্বিনেশনে তৈরি ওষুধের কমিশন আলাদা, এমনটা না। তবে কোম্পানিগুলো মাঝে মাঝে একেক ওষুধের ওপর এক্সট্রা বোনাস ও বাই ওয়ান গেট ওয়ান টাইপের সুযোগ দেয়। যেমন, ৫ বক্স একসঙ্গে নিলে ১ বক্স ফ্রি। তখন আমরাও একটু লাভ বেশি করার জন্য সেই ওষুধটা বিক্রি করার চেষ্টা করি।”
একই কথা বলেন রাজশাহীর মনিরুল ফার্মেসির কর্ণধার মনিরুল ইসলাম। তিনি চরচাকে বলেন, “সব ওষুধের কমিশন একই, কিন্তু বিক্রির কৌশল আলাদা। একেকটা ওষুধে কোম্পানি একেক রকম সুবিধা দেয় ফার্মেসি মালিকদের। আর মূল জরুরি ওষুধের চেয়ে কম্বিনেশনে তৈরি ওষুধের দাম সব সময়ই বেশি। আর যখন দাম বেশি হয়, তখন শতাংশ হিসাব করলে আমাদের লাভও বেশি হয়। তখন আমরা সেটা বিক্রি করার চেষ্টা করি।”
আইন কঠিন নয়, নাকি তদারকি নেই?
১৯৯৪ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিতে স্পষ্ট করে এটা বলে দেওয়া আছে যে, প্রতিটি নিবন্ধিত ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে তাদের মোট উৎপাদনের অন্তত ৩০ শতাংশ রাখতে হবে অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস ক্যাটাগরির ওষুধ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তদারকি ও আইনি প্রয়োগের অভাবে এই ৩০ শতাংশ উৎপাদনের নিয়মটি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
দেশে প্রায় ২ শতাধিক নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানি থাকলেও অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগসের মূল সরবরাহ করে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি। ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোর কাছে লাইসেন্স বা ডিএআর থাকলেও, লোকসানের অজুহাতে তারা এগুলোর উৎপাদন পুরোপুরি স্থগিত রেখে অনিয়ন্ত্রিত ক্যাটাগরির কম্বিনেশন ওষুধ তৈরিতে কারখানা ব্যবহার করছে।
কেউ খরচ দেখে, কেউ দাম
শসাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাতে চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগস’ ক্যাটাগরিতে আরও ১৩৬টি নতুন উপাদান যুক্ত করে। এতে অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস ক্যাটাগরিতে মোট উপাদানের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৫টি। অর্থাৎ, এই ২৯৫টি ড্রাগ দিয়ে বানানো ওষুধের দাম সরকার নির্ধারিত সীমার বাইরে যেতে পারবে না।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে রিট হয়। রিটকারীদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ‘ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন’-এ এমন তালিকা করার ক্ষেত্রে ‘জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদে’র আইনি পরামর্শ ও অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটা করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের বানানো নতুন নীতিমালাটি স্থগিত হয়ে যায় এবং সাময়িকভাবে ১৯৯৪ সালের পুরনো ১১৭টি ওষুধের তালিকাই বহাল থাকে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ১১৭টি অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগের দাম বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আপডেট করা হয়নি। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে, ডলারের দাম চড়েছে, গ্যাস-বিদ্যুতের পেছনে খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে ফার্মা মালিকরা একক অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগ তৈরিকে ‘অলাভজনক’ বলে দাবি করছেন। আর সেই সুযোগেই আইন ও নীতির ফাঁক দিয়ে শুরু হয়েছে এই প্রোডাকশন শিফটিং বা কম্বিনেশন ড্রাগের দাপট।
ওষুধ কোম্পানিগুলোর এই মার্কেটিং কৌশলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। বাজারে সাশ্রয়ী সিঙ্গেল জেনেরিক ওষুধ না পেয়ে রোগীরা যেমন বাধ্য হচ্ছেন কম্বিনেশন ড্রাগ কিনতে, তেমনি কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রভাবে অনেক অসাধু চিকিৎসকও চড়া দামের কম্বিনেশন ড্রাগগুলোই প্রেসক্রাইব করছেন। ফলে ওষুধের পেছনে ৪ থেকে ১০ গুণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে রোগীর।
সেটা কতটা, তা বোঝা যায় ভোক্তা আব্দুর রহিমের কথায়। তিনি বলেন, “আমি আমার বৃদ্ধ মায়ের জন্য প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকার ওষুধ কিনি। ওষুধের দামটা যদি একটু কম হতো, তাহলে আমি কিছুটা স্বস্তি পেতাম। উদাহরণ দিতে গিয়ে আমরা প্যারাসিটামলের দাম ১ টাকা, সেটা বলি। কিন্তু একজন রোগীর তো শুধু প্যারাসিটামলে হয় না। অনেক ক্যাপসুল ও ইনজেকশন আছে, যেগুলো হাজার হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়। তখন আমাদের জান বের হয়ে যায়।”