সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আজ সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গাজী নজরুলের বিষয়ে সংসদ থেকে কোনো চিঠি এখনো কমিশনে আসেনি। সংসদ থেকে চিঠি এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গতকাল রোববার ঢাকার শেরেবাংলা নগরের সংসদ সদস্য ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাবেক জামায়াত এমপিকে আলোচনা শুরু হয়। পরে গাজী নজরুল জানান, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম।
ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। এরপর জামায়াত বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানিয়েছিল। তবে শুধু দলীয় বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণা করার সুযোগ নির্বাচন কমিশনের নেই বলে জানিয়েছিল ইসি।
তাহলে দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আইনি অবস্থান কী? কোন প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে?
আইনে যা আছে
সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার কারণ সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সময়ে শপথ না নেওয়া, সংসদের অনুমতি ছাড়া একটানা ৯০ বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকা, সংসদ ভেঙে যাওয়া, সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদের অধীনে অযোগ্য হয়ে পড়া এবং ৭০ অনুচ্ছেদের পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া। এ ছাড়া কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র দিলে এবং স্পিকার তা গ্রহণ করলে তার আসন শূন্য হয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী বহিষ্কার করেছে। তিনি নিজে দল ছাড়েননি। তাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘটনাটি ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে কি না, সেটিই এখানে একটি আইনি প্রশ্ন।
জামায়াত গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে দলীয় তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে যে ‘নৈতিক স্খলন’-এর কথা বলা হয়েছে, সেটি কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হওয়াকে বোঝায় না। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনসম্পৃক্ত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড পেলে এবং তার মুক্তির পর পাঁচ বছর না পেরোলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা থাকার অযোগ্য হন। অর্থাৎ, দলীয় তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হলেও, তাতে ৬৬(২)(ঘ) অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না।
গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, তার বিচার এখনো শুরু হয়নি। ফলে ওই মামলার কারণে এই মুহূর্তে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদে অযোগ্যতা তৈরি হয়েছে—বিষয়টি তেমন নয়।
গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলমান থাকাও সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার কারণ নয়। সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ)-এর অযোগ্যতা প্রযোজ্য হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডের শর্ত রয়েছে।
আজ সোমবার পুলিশ গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে আত্মহত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে। পুলিশ বলেছে, সংসদ সদস্য হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে স্পিকারকে জানানো হয়েছে। শুধু মামলা হওয়া বা গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে তার সংসদ সদস্য পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে, সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ৬৬(২)-এর কোনো অযোগ্যতার মধ্যে পড়েছেন কি না অথবা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
ফলে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার, ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ কিংবা ৬৬(২)-এর অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠলে সেটি নিয়ে বিরোধ বা বিতর্ক দেখা দিলে সাংবিধানিকভাবে তা নিষ্পত্তির এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।
ইসি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট (ডিটারমিনেশন অব ডিসপিউট) অ্যাক্ট-১৯৮০’ অর্থাৎ সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ১৯৮০।
এই আইনটি সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদের বিধান কার্যকর করার জন্য করা হয়েছে। আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে স্পিকার ৩০ দিনের মধ্যে বিরোধসংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের নাম-ঠিকানা এবং বিরোধ উত্থাপনকারী ব্যক্তির পরিচয়সহ একটি বিবরণী তৈরি করে ইসিতে পাঠাবেন।
এ কারণে জামায়াত সরাসরি নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেই কমিশন নিজ উদ্যোগে গাজী নজরুলের সদস্যপদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারে—আইনের কাঠামো তেমন নয়। সংবিধানের ৬৬(৪) ও সংশ্লিষ্ট আইনের প্রক্রিয়ায় স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি কমিশনে আসার কথা।
ইসির পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত একই অবস্থান জানানো হয়েছে। সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, জামায়াতের চিঠি তারা পেয়েছিল; কিন্তু সংসদ থেকে কোনো চিঠি না এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
স্পিকারের চিঠি গেলে কী হবে?
স্পিকার বিরোধের বিবরণী ইসিতে পাঠালে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন বিবরণী পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে তা বিরোধের পক্ষগুলোর কাছে পাঠাবে এবং লিখিত বক্তব্য দিতে বলবে।
লিখিত বক্তব্য দেওয়ার সময় শেষ হলে কমিশন শুনানির দিন, সময় ও স্থান নির্ধারণ করবে। উভয় পক্ষ উপস্থিত হয়ে অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবে। একই সঙ্গে তাদের প্রমাণ উপস্থাপন ও সাক্ষী জেরা করার সুযোগ থাকবে। এরপর কমিশন সংশ্লিষ্ট নথি ও বক্তব্য পর্যালোচনা করে বিরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
ইসির কী ধরনের ক্ষমতা আছে?
সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ইসিকে দেওয়ানি আদালতের মতো কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, কমিশন প্রয়োজন হলে কোনো ব্যক্তিকে তলব করতে, উপস্থিতি নিশ্চিত করতে, শপথের অধীনে জবানবন্দি নিতে এবং প্রয়োজনীয় নথি তলব ও উপস্থাপনের নির্দেশ দিতে পারে।
সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য কমিশনও গঠন করা যেতে পারে। এ আইনের অধীনে কমিশনের সামনে চলা কার্যক্রম দণ্ডবিধির ১৯৩ ধারার অর্থে বিচারিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হয়।
কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে?
আইনের ৬ ধারায় সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পিকার ৩ ধারায় যে বিবরণী ইসিতে পাঠাবেন, সেটি পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে কমিশনকে তার সিদ্ধান্ত স্পিকারের কাছে জানাতে হবে। সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদেও এ ধরনের বিরোধে ইসির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
গাজী নজরুলের কী হবে?
গাজী নজরুল দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তার সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়নি। তার সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে সংসদ থেকে বিষয়টি স্পিকারের মাধ্যমে ইসিতে পাঠানোর বিষয়টি সামনে আসবে।
তারপর সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ ও সংসদ সদস্যপদ বিরোধ নিষ্পত্তি আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী শুনানি ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া চলবে।
অন্যদিকে, মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা ফৌজদারি মামলাটি আলাদা আইনি প্রক্রিয়া। সেই মামলায় পরবর্তীতে আদালতের কোনো রায় হলে তার ভিত্তিতে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতার প্রশ্নও উঠতে পারে।