ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে প্রায় চার বছর ধরে বড় ধরনের লড়াই ছিল না। এক ধরনের অস্বস্তিকর যুদ্ধবিরতি ছিল। কিন্তু সেই শান্তিও এখন ভেঙে পড়ছে। দেশটিতে আবারও শুরু হয়েছে সংঘাত।
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা অভিযোগ করেছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি গত ৩০ জুলাই সতর্ক করে বলেন, সরকার ও সৌদি আরব বড় ধরনের অভিযান শুরু করলে হুতিরাও পাল্টা জবাব দেবে।
এরপর আগস্ট জুড়ে সরকারি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এসব হামলায় সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন।
জবাবে ইয়েমেনের নিয়মিত সেনাবাহিনীও হুতিদের বিরুদ্ধে জোরাল হামলা চালিয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলক শান্ত থাকা ইয়েমেনে আবারও বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুতিরা মনে করছে, আবার যুদ্ধ শুরু হলে তাদের লাভের সুযোগ আছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে তারা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি বন্দর, বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, চলতি মাসে খুব কমসংখ্যক সৌদি তেলবাহী জাহাজই লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
হুতিদের এসব হামলার মূলত দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, ইয়েমেনের সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়ার পাশাপাশি বিমান চলাচল ও পণ্য পরিবহনের ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নিতে সৌদি আরবকে চাপ দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া। সৌদি আরব ও তার মিত্ররা যদি সত্যিই নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে হুতিরা তার আগেই হামলা শুরু করে সেই উদ্যোগ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে হুতিদের লক্ষ্য হয়ত আরও বড়। ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। ইয়েমেনের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখন হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই আরও বেশি এলাকা দখলের চেষ্টা করে আসছে এই বিদ্রোহীরা।
১৫ আগস্ট বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে মোকা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। হামলার পর বন্দরটি বন্ধ করে দিতে হয়। ধারণা করা হচ্ছে, মোকাকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা সরকারের সমর্থিত বিশেষ প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসকে দুর্বল করাই এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাদের মোকা থেকে সরিয়ে দিতে পারলে প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।
ইয়েমেনের তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণও চায় হুতিরা। ২০২২ সালের শুরুতে রাজধানী সানার পূর্বে মারিবের তেলকূপগুলো দখলের করতে গিয়েছিল তারা। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রশিক্ষণ দেওয়া সরকারপন্থী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিরোধে পিছু হটতে হয় তাদের।
ওই বছরের শেষ দিকে উপকূলের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় হুতিরা। উদ্দেশ্য ছিল তাদের প্রতিপক্ষকে তেল রপ্তানি থেকে বিরত রাখা। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ইয়েমেন সরকার আবার তেল রপ্তানি শুরু করার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকেই মারিবে হুতিদের হামলা বেড়েছে।
এখন তারা আবারও মারিবের তেলসম্পদের দখল নিতে বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে। তেলকূপগুলো দখল করতে না পারলেও, সরকারকে এসব তেলসম্পদ থেকে পাওয়া রাজস্বের একটি অংশ তাদেরকে দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারে হুতিরা।
এদিকে সরকার মনে করছে, হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারলে ইয়েমেনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা আবারও বাড়ানো সম্ভব হবে। কারণ সরকারের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই ইয়েমেনের বাইরে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থান করছেন।
তবে সরকারের এই যুদ্ধের কথা বলা হয়ত মূলত নিজেদের পক্ষের যোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য। তারপরও হুতিবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শীতের বেশিরভাগ সময় তারা নিজেদের মধ্যেই সংঘাতে জড়িয়েছিল। এখন তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্যবদ্ধভাবে হুতিদের মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
সরকার দক্ষিণাঞ্চলীয় ট্রানজিশনাল কাউন্সিলও বিলুপ্ত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত এই গোষ্ঠী ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলকে আলাদা করার দাবি জানিয়ে আসছিল। কাউন্সিলের কিছু যোদ্ধাকে এখন জাতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে হুতি-নিয়ন্ত্রিত জাওফ অঞ্চলে কিছু গোত্রের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। এতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে সরকারের পক্ষের আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
এদিকে ড্রোন ব্যবহারে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও আগের চেয়ে দক্ষ হয়ে উঠেছে। এতদিন ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে হুতিরাই এগিয়ে ছিল। এখন সেই ব্যবধানও কিছুটা কমছে।
তবে হুতিদের মোকাবিলা করা সহজ হবে না। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হামলা এখন পর্যন্ত হুতিদের থামাতে পারেনি। এর আগেও আরও বড় ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান মোকাবিলা করে টিকে গেছে তারা। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলি হামলায় হুতিদের বেসামরিক নেতৃত্বের বেশিরভাগ সদস্য নিহত হলেও, খুব দ্রুতই সংগঠনটি আবার নিজেদের গুছিয়ে নেয়।
হুতিদের পরাজিত করাও কঠিন হতে পারে। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করার সময় ইরানের পরামর্শও উপেক্ষা করেছিল। তখন ইরান তাদের সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। এখন হুতিদের আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে তাদের শক্ত অবস্থান।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের লক্ষ্য করে হামলা চালালে গোষ্ঠীটি সাতটি মার্কিন ‘রিপার’ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করে। একই সময়ে কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমানও প্রায় হামলার শিকার হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে হুতিরা দাবি করে, সৌদি বাহিনীর ব্যবহৃত তুরস্কের তৈরি একটি ‘বায়রাকতার’ ড্রোনও তারা ভূপাতিত করেছে। তাদের হাতে এমন ফাইবার-অপটিক ড্রোনও রয়েছে, যেগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে জ্যাম করা কঠিন।
এক সময় হুতিরা ইরান থেকে তৈরি অস্ত্র সরাসরি আমদানি করত। এখন তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের বড় একটি অংশ তৈরি হয় ছোট ছোট যন্ত্রাংশ দিয়ে। এসব যন্ত্রাংশ ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে পাচার করা হয়, আবার আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল থেকে আসা ছোট নৌযানেও লুকিয়ে আনা হয়।
ফলে কিছু হুতি ড্রোন প্রায় পুরোপুরিই ইরানি যন্ত্রাংশ ছাড়াই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির পিটার সালিসবারি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সামরিক সক্ষমতা হুতিরা যে গতিতে আবার গড়ে তুলতে পারছে, তা অনেকের ধারণার চেয়েও দ্রুত।
ভূগোলও হুতিদের জন্য বড় সুবিধা। তারা যে পাহাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো প্রতিরক্ষার জন্য সুবিধাজনক। বিশেষ করে সেখানে ব্যাপকভাবে স্থলমাইন ব্যবহারের কারণে সরকারি বাহিনীর জন্য এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত পুরনো গুহা ও বাঙ্কারের একটি বড় নেটওয়ার্কও রয়েছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে এসব স্থাপনা আরও সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সরকারি বাহিনী হুতি-নিয়ন্ত্রিত বন্দরগুলোর দিকে নেওয়া হচ্ছিল এমন কিছু সুড়ঙ্গ খননের সরঞ্জামও জব্দ করেছে।
এসব বিষয়ই সরকারি বাহিনীকে উদ্বিগ্ন করার জন্য যথেষ্ট। সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে সরকারি বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের সামরিক শাস্তির’ হুমকি দিয়েছেন। তবে এর খরচও কম হবে না। আবদুল-মালিক আল-হুতি ইয়েমেনের ‘দখলদারদের কবরস্থান’ হিসেবে পরিচিতির কথা প্রায়ই গর্বের সঙ্গে বলেন। শেষ পর্যন্ত হয়তো তিনিই সঠিক প্রমাণিত হবেন।
(লেখাটি দ্য ইকোনোমিস্টে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত)