যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ফের বেড়েছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এ সংঘাতের শুরু। এরপর ছয় মাস পেরোলেও কার্যত কোনো সমাধান আসেনি। বেশ কয়েক দফায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে, জুনে একটি সমঝোতা স্মারকে সইও করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে সেসব কিছুই টেকেনি।
স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার রাতে ফের ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরপরই উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গত সপ্তাহের শেষেও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দেওয়ার পরও ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর কারণ হলো, তেহরান মনে করছে ওয়াশিংটন আসলে কূটনৈতিক সমাধানে আন্তরিক নয়। ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আঘাত করলে আরও কঠোর হামলা চালানো হবে। এরপরও জর্ডান, ইরাক, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করে তেহরান।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল আইআরজিসি। এর জবাবেই তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার, সমুদ্রপথে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম ও স্থাপনা, সমুদ্রে মাইন পেতে রাখার সক্ষমতা এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে এসব হামলার জন্য ‘অনুতপ্ত’ হতে হবে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের সিরিকে হামলার জবাবে বুধবার ভোরে জর্ডানের আকাবায় মার্কিন মেরিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান। ওই হামলায় এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি আল জাজিরাকে বলেন, ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতায় বিশ্বাস করছে না। তাই তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা করছে।
এই বিশ্লেষক বলেন, যুদ্ধের আগের ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। তারা যদি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে চায়, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। তবে ইরান এবার আরও শক্তভাবে জবাব দেবে।
এসলামির মতে, জর্ডানে মার্কিন অবস্থানে হামলার একটি উদ্দেশ্য হলো— পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলে হামলার জন্য ইরানি বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা।
সিরিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার বিষয়ে অভিযোগ করেন এই বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানেও যুদ্ধাপরাধ করছে, যেমনটি আগে ইরাক ও আফগানিস্তানে করেছে। তিনি বলেন, এসব বন্ধ করে দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার সময় এসেছে।
এদিকে, আইআরজিসির উপ-রাজনৈতিক প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি আরব দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসব দেশকে হয় তাদের ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে দিতে হবে, নয়তো ইরানের কঠোর সামরিক জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।
সংবাদ সংস্থা তাসনিমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাভানি বলেন, “আপনাদের দেশ থেকে আমেরিকানদের বের করে দিয়ে সামরিক ঘাঁটিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই ভালো।”
ইয়াদোল্লাহ জাভানি আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী প্রমাণ করেছে যে ইরানে হামলা চালাতে যে কোনো ঘাঁটি বা জায়গা ব্যবহার করা হলে সেখানেই তারা কঠোর পাল্টা হামলা চালাবে। বিশেষভাবে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন করে এই হামলা শুরুর কারণ কী?
আন্তর্জাতিক নীতি বিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোরতাজাভি বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার মূল কারণ হলো জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
আল জাজিরাকে মোরতাজাভি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের শর্ত মানেনি। তারা এটিকে কার্যত মূল্যহীন একটি কাগজের মতো বিবেচনা করেছে। তিনি বলেন, ওই চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প নিজের দলের সদস্য ও ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিলেন। অন্যদিকে, তেহরান এটিকে একটি ভালো চুক্তি হিসেবে দেখেছিল এবং আবার সেটিতে ফিরে যেতে চায়।
মোরতাজাভি বলেন, লেবাননসহ সব জায়গায় যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো শর্তগুলো পূরণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় কূটনৈতিক অগ্রগতি থেমে যায়।