সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ থেকে গ্রাহকরা নিজ নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারবেন। তবে কারা এবং কোন ধরনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারবেন, বিষয়টি অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। এ ছাড়াও, আমানতের মুনাফা থেকে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন করা হবে কি না, সেই বিষয়টিও অনেকের অজানা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে গ্রাহকদের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আজ থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে নতুন এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
কত টাকা তুলতে পারবেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ গাইডলাইন অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য টাকা তোলার ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন পথ খোলা রাখা হয়েছে। প্রথম নিয়মটি হলো, যেসব গ্রাহক তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করতে চান না, তাদের ক্ষেত্রে নগদ উত্তোলনের সীমা ২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, আপনি যদি আপনার অ্যাকাউন্টটি চালু রেখে, দৈনন্দিন প্রয়োজনে নিয়মিত চেকের মাধ্যমে লেনদেন করতে চান, তবে প্রাথমিক ধাপে ডিপোজিট ইন্সুরেন্স ফান্ডের নীতিমালা অনুযায়ী শাখা থেকে একবারে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। এই নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অ্যাকাউন্ট চালু রাখার কারণে ব্যাংকের সাথে হওয়া পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী আপনার জমানো টাকার ওপর অর্জিত নিয়মিত মুনাফা বা লভ্যাংশ আপনি সময়মতো পেয়ে যাবেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় নিয়মটি হলো, যারা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে চান, তারা শুধু মূল টাকা– অর্থাৎ, যত টাকা জমা রেখেছেন, সেটা একবারে তুলে নিতে পারবেন। এই বিশেষ সুযোগ পেতে হলে আজ থেকে ব্যাংকের নির্ধারিত শাখায় গিয়ে বিশেষ ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের বিপরীতে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই টাকা গ্রাহকদের হাতে পৌঁছানো শুরু হবে।
তবে এই সুবিধার প্রধান শর্ত হলো, গ্রাহক এক্ষেত্রে তার জমানো টাকার ওপর অর্জিত কোনো প্রকার মুনাফা বা লভ্যাংশ পাবেন না। অর্থাৎ শুধু যত টাকা জমা রেখেছেন, সেই মূল টাকাটাই ফেরত পাবেন।
সুতরাং, গ্রাহকদের নিজস্ব চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাদের এই মুহূর্তে জরুরিভিত্তিতে পুরো টাকার প্রয়োজন নেই এবং নিয়মিত মুনাফার সুবিধা সচল রাখতে চান, তারা অ্যাকাউন্ট বন্ধ না করে সাধারণ চেকের মাধ্যমে ২ লাখ টাকার সীমার মধ্যে লেনদেন চালিয়ে যেতে পারেন। আর যারা কোনো প্রকার মুনাফা ছাড়াই শুধু নিজের আসল টাকাটা একবারে পুরোপুরি তুলে নিয়ে অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিতে চান, তাদের জন্য আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া আবেদন প্রক্রিয়াটি বেছে নিতে হবে।
কোন কোন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা যাবে?
নতুন ব্যবস্থার আওতায় ব্যক্তি আমানতকারীরা ‘আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব’, ‘মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব’ এবং ‘মুদারাবা মেয়াদি আমানতে’র মূল অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে চলমান স্কিমে থাকা নির্ধারিত বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
তা সেই তিন ধরনের অ্যাকাউন্ট কী, চলুন বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাবটি সম্পূর্ণভাবে ইসলামী শরিয়াহর আল-ওয়াদিয়াহ বা নিরাপদ হেফাজত নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক তার অর্থ সুরক্ষার জন্য ব্যাংকের কাছে জমা রাখেন এবং ব্যাংককে তা ব্যবহারের অনুমতি দেন। ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদামাত্র এই অর্থ ফেরত দিতে আইনত বাধ্য থাকে। এই অ্যাকাউন্টে গ্রাহক দৈনিক যতবার ইচ্ছা টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারেন। তবে ব্যাংক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে টাকা ব্যবহার করলেও গ্রাহককে কোনো প্রকার মুনাফা দেবে না। কোনো লোকসানের ঝুঁকিও গ্রাহকের থাকে না। এটি মূলত ব্যবসায়ী এবং দৈনিক প্রচুর লেনদেন করেন– এমন গ্রাহকদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাবটি শরিয়াহর মুদারাবা বা অংশীদারিত্বের নীতির অধীনে কাজ করে। এখানে গ্রাহক হলেন মূলধন সরবরাহকারী এবং ব্যাংক হলো ব্যবসার ব্যবস্থাপক। গ্রাহকের জমা করা এই অর্থ ব্যাংক সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগ থেকে পাওয়া লাভের একটি বড় অংশ পূর্বচুক্তি অনুযায়ী আমানতকারীদের মধ্যে মুনাফা হিসেবে বণ্টন করা হয়। সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের মতো এখানেও টাকা জমা ও তোলার সুবিধা থাকে। তবে লেনদেনের সংখ্যার ওপর কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। এই হিসাবটি চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি, যারা অল্প অল্প করে সঞ্চয় করার পাশাপাশি জমানো টাকার ওপর হালাল মুনাফা পেতে চান।
মুদারাবা মেয়াদি আমানত অ্যাকাউন্ট বা ফিক্সড ডিপোজিটও মুদারাবা নীতির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়। তবে এর মূল পার্থক্য হলো সময়ের সীমাবদ্ধতা। এই অ্যাকাউন্টে গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য– যেমন, তিন মাস, ছয় মাস বা এক বছরের জন্য এককালীন একটি বড় অংকের টাকা জমা রাখতে হয়। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে সাধারণত এই টাকা উত্তোলন করা যায় না। যেহেতু টাকা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংকের কাছে আটকে থাকে, তাই ব্যাংক এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের তুলনায় এই অ্যাকাউন্টে মুনাফার হার বেশি হয়ে থাকে। মেয়াদ শেষে গ্রাহক মুনাফাসহ তার আসল টাকা এককালীন ফেরত পান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নির্দেশ– ‘কোনো হেয়ারকাট নয়’
মুনাফা কেটে নেওয়া হবে কি না, এ নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গ্রাহকদের মনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থা ঠিক রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের জমানো আমানতের অর্জিত মুনাফার ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন করা হবে না। অর্থাৎ, পূর্বচুক্তি অনুযায়ী গ্রাহকরা যে পরিমাণ মুনাফা পাওয়ার যোগ্য, তার থেকে কোনো অর্থই ব্যাংক কেটে রাখতে পারবে না।” অর্থমন্ত্রীর এই আশ্বাসের পরও সাধারণ গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে মুনাফা পাওয়ার বিষয়ে অস্পষ্টতা ও উদ্বেগ থেকে যায়।
গ্রাহকদের এই সংশয় দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গ্রাহকের মুনাফা থেকে কোনো প্রকার অর্থ কেটে নেওয়া হবে না– এই বিষয়টি ব্যাংকগুলোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং সরাসরি তাদের গ্রাহকদের জানাতে হবে।
শুধু ব্যক্তি অ্যাকাউন্টধারীরাই এই সুবিধা পাবেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের মূল অর্থ এককালীন ফেরত বা নগদায়নের এই বিশেষ সুবিধাটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের গ্রাহকদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টধারীরা এই সুবিধার আওতাভুক্ত নন, তাদের জন্য পূর্বের নিয়ম বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিন্ন স্কিম বহাল থাকবে।
ব্যক্তি মালিকানাধীন আল-ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব এবং বিভিন্ন মেয়াদি আমানত বা ডিপিএস হিসাবের গ্রাহকেরা আজ থেকে ব্যাংকের নিজ নিজ শাখায় আবেদনের মাধ্যমে তাদের টাকা নিয়মমাফিক তুলতে পারবেন। কোন দুটি নিয়মে টাকা তোলা যাবে, সেটা লেখার শুরুতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আর্থিক সংকটে থাকা এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে। এসব ব্যাংককে ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়। গত ১৬ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় সারা দেশে আছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ওই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা– যা তাদের মোট ঋণের ৮৪.২২ শতাংশ। নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা। নতুন ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা।