বছরের পর বছর ধরে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুত্ববাদী ছাত্র সংগঠনটির অবস্থা এতটাই করুণ ছিল যে, মিছিলে লোক দেখাতে তাদেরকে বাইরে থেকে মাঝবয়সী কর্মীদের ডেকে আনতে হতো। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর কলকাতার পরিস্থিতি বদলে যায়।
আগস্ট মাসে দলীয় শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একদল ছাত্র বামপন্থী প্রতিপক্ষদের ওপর হামলা চালায় এবং তাদের পতাকা ও পোস্টার পুড়িয়ে দেয়। এমনকি এক মন্ত্রী এই ধরনের আরও আকস্মিক হামলার উসকানি দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্র ক্ষোভের সাথে জানায়, “টাকা আর পেশিশক্তি— দুটোই এখন ওদের হাতে, আর এগুলো দিয়েই ওরা পুরো ক্যাম্পাস দখল করতে চাইছে।”
এতদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির আদর্শের একদম বিপরীত— ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী ধারায় বিশ্বাসী এবং ব্যবসাহীন স্থবির এক রাজ্য। তাই এখানে প্রথমবারের মতো জয় পাওয়াটা বিজেপির জন্য দারুণ এক আনন্দের বিষয় ছিল। তবে এই ভিন্ন মতাদর্শের কারণেই, ভারতে ১২ বছরের শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গকে সামলানো বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলটি। ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে গত ১৭ আগস্ট। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, বিজেপি এখন পর্যন্ত ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙা করার চেয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত জিইয়ে রাখাকেই সুবিধাজনক ভাবছে।
কয়েক দশক ধরে কমিউনিস্ট এবং পরবর্তীতে আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় একইভাবে রাজ্য চালিয়েছে। তাদের ঘুষের প্রতি লোভ আর ব্যবসার প্রতি অনীহা ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পসমৃদ্ধ এই রাজ্যটিকে শেষ পর্যন্ত এক অসাধু ও প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেট রাজে’ পরিণত করে। মে মাসের নির্বাচনে তৃণমূলের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ও মোদির কঠোর সমালোচক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে যান। তবে সাধারণ মানুষ যে খুব ভালোবেসে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে তা নয়, বরং তারা ভোট দিয়েছে তৃণমূলের দুর্নীতি ও গুন্ডামির বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষোভ মেটাতে।
রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার দুটিই এখন বিজেপির দখলে। ফলে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের দীর্ঘদিনের চরম তিক্ততা কাটিয়ে সম্পর্ক এখন বেশ স্বাভাবিক। এর ফলে কলকাতায় মেট্রো লাইনের সম্প্রসারণসহ আটকে থাকা বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ আবারও গতি পেয়েছে। রাজ্য নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রেল খাতের উন্নয়নে ১ লাখ কোটি রুপি (প্রায় ১০.৫০ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দিল্লির কেন্দ্র সরকার।
তবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ফের রাজ্যে ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী এবং এক সময়ের স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী স্বপন দাশগুপ্তের ভাষায়, “আমি একটি বড় এবং স্মরণীয় বিনিয়োগের খোঁজে কাজ করছি।”
তেমন একটি বড় সাফল্য হতে পারে ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপকে একটি বড় উৎপাদন কারখানা নিয়ে ফের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনা— যারা প্রায় দুই দশক আগে রাজ্যে গাড়ি কারখানা তৈরির প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছিল, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন আন্দোলনের মুখে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের সাথে ভালো ব্যবহারের কথা বলা হলেও, ধর্মনিরপেক্ষ ও খাদ্যরসিক বাঙালির ওপর নিজেদের হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে নতুন সরকার বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিমের এই রাজ্যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, “আমি হিন্দুদের স্বার্থে কাজ করব।”
এরপর থেকেই সরকারি রাস্তায় মুসলমানদের নামাজ পড়ায় বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং হালাল মাংস বিক্রির নিয়ম কঠিন করে ফেলা হয়েছে।
এছাড়া ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর তোড়জোড়ে এমন অনেক মুসলিমদেরও সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যারা আসলে ভারতেরই বৈধ নাগরিক। এমনকি স্কুলে দুপুরের খাবারে ডিম দেওয়া বন্ধের এক সাময়িক প্রচেষ্টা সাধারণ হিন্দু সমাজকেও ক্ষুব্ধ করে তোলে, কারণ, উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো নিরামিষাশী চর্চা এখানকার সিংহভাগ হিন্দু মানেন না। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিমদের অতিরিক্ত তোষণ করেছেন বলে বহু মানুষের অভিযোগ ছিল সত্য, কিন্তু বিজেপি সরকারের কারণে পশ্চিমবঙ্গের এই মেলবন্ধনের সংস্কৃতি নষ্ট হোক— তা খুব কম মানুষই চান।
বিরোধী শিবিরকে নিজেদের দলে ভেড়াতেও চেষ্টার কমতি রাখেনি বিজেপি। দিল্লির কেন্দ্রীয় সংসদে তৃণমূলের ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জনই এখন মোদির জোটের সঙ্গী। রাজ্য বিধানসভাতেও একই চিত্র। ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে এক পৃথক দল গড়ে তুলেছেন, যারা রহস্যজনকভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে একদম মুখ খোলে না।
সমালোচকদের মতে, কেন্দ্রের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর হাত থেকে বাঁচতেই মূলত তাদের এই দলবদল। পরিস্থিতির নির্মমতা প্রকাশ পায় গত ১৬ই আগস্ট, যখন দলীয় কার্যালয়ে মমতা-অনুরাগী এক নেতার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। নিজের শেষ চিঠিতে তিনি পরিবারকে আকুতি জানিয়ে বলে যান, তারা যেন ভুলেও কখনো রাজনীতিতে না জড়ায়।
২০২৯ সালের সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের আগেই পশ্চিমবঙ্গে বড় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি বা সফল ‘কিছু’ করতে মরিয়া বিজেপি। রাজ্যের নিজস্ব আয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশই যেখানে দিল্লির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এত অল্প সময়ে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় পশ্চিমবঙ্গকে সব সময় ওপরের দিকেই রাখতে হবে। দলটির সামনে দ্বিতীয় বড় সংকটটি দাঁড়িয়েছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাকে বিজেপিতে স্থান দেওয়া নিয়ে। দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানো এসব দলছুট নেতার কারণেই সাধারণ ভোটার কিংবা বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘রাজ্যে নতুন এক শুভ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে’—এ বার্তা পৌঁছানো এখন বিজেপির জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
(ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত)