বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে কিছুদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে। গত রোববার এ নিয়ে সংসদে অনির্ধারিত বিতর্কও হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান বা অন্য আইনে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাবে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন বিরোধীদল থেকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল থেকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সংবিধানে এই বিধান যুক্ত করা হবে বলে সনদে উল্লেখ রয়েছে। এই সমঝোতার দলিলে বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট একমত হয়েছিল।
বাংলাদেশের সংসদে বিষয়ভিত্তিক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি। আর মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ৩৯টি। ত্রয়োদশ সংসদে এখন পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার মধ্যে একটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দল থেকে। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় কমিটি, এর কাজ, সুপারিশ নিয়ে বাংলাদেশে এর আগে বহুবার আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় কমিটির কাজ কী? এই কমিটি কীভাবে এল? আজ সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।
সংসদীয় কমিটি কী, ক্ষমতা কেমন
সংসদীয় কমিটিকে ‘মিনি পার্লামেন্ট’ বলা হয়। কারণ আইনসভার অনেক কাজ কমিটিতে করা হয়। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি যেমন আইনসভার ফ্লোরে নিশ্চিত হয়, একইভাবে কমিটিতেও হয়। পার্লামেন্টারি রাজনীতির ক্রমবিকাশ যেমন দীর্ঘদিনের, কমিটি ব্যবস্থারও সেরকম। একেক দেশে একেকরকমভাবে কমিটি ব্যবস্থা কাজ করে। তবে মোটামুটি সব দেশেই কমিটি খসড়া আইন পর্যালোচনা, নির্বাহী বিভাগের কাজ তদারকি, সরকারি আয়-ব্যয় নিরীক্ষা ইত্যাদি সংসদীয় কমিটি করে থাকে।
সংসদীয় কমিটির ক্ষমতাও পার্লামেন্টারি ব্যবস্থাভেদে ভিন্ন হয়। যেমন মার্কিন কংগ্রেসনাল পদ্ধতিতে একটি প্রবাদ আছে, যার বাংলা এ রকম–অধিবেশনে থাকা কংগ্রেস হলো প্রদর্শনী, আর কমিটি রুমে থাকা কংগ্রেস হলো আসল কাজের জায়গা।
সংসদীয় কমিটির ইতিহাস
বাংলাদেশের আইন ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের। অর্থাৎ, ব্রিটিশ পদ্ধতির সংসদীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিদ্যমান। ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের পার্লামেন্টে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটির প্রচলন ছিল না। নির্বাহী বিভাগের কাজের তদারকির জন্য মার্কিন কংগ্রেসে কমিটি ব্যবস্থা বেশি গুরুত্ব পেত। তবে বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকে ওয়েস্টমিনস্টার এবং কংগ্রেসনাল মডেলের মিশ্রণে জাতীয় সংসদে কমিটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কমিটি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ নেই। তবে ১৭৮৯ সালে প্রথম কংগ্রেস থেকেই দেশটির আইনসভায় কমিটি শুরু হয়েছিল। পরে ১৯৮৬ সালে লেজিসলেটিভ রিঅর্গাজানাইজেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে কমিটি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংসদীয় রাজনীতির গবেষক কে এম মহিউদ্দিন তার ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কাঠামো কার্যপদ্ধ ও চর্চা’ বইয়ে লিখেছেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ষোড়শ শতকের শেষ ও সতেরো শতকের শুরুতে হাউজ অব কমন্সে আইনের খসড়াসহ বেশ কিছু বিষয় যাচাই করার জন্য কমিটিতে পাঠানোর নজির পাওয়া যায়।
সরকারি আয়-ব্যয় তদারকির জন্য সর্বপ্রথম ১৮৬১ সালে সরকারি হিসাব কমিটির প্রচলনের শুরু। পরে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর পার্লামেন্টেও এই ব্যবস্থা চালু হয়। কে এম মহিউদ্দিন লিখেছেন, ক্রমাগত নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ১৯৭৯ সালে হাউজ অব কমন্সে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত ১২টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। পরে ভারতীয় লোকসভায়ও অনুরূপ কমিটি গঠনের বিধান করা হয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী ‘কমিটি’ অর্থ সংসদ কর্তৃক বা সংসদের ক্ষমতাবলে গঠিত কোনো কমিটি এবং অনুরূপ কমিটির কোনো সাব-কমিটি। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে এই কমিটির গঠনের বিধান রয়েছে। ওই বিধানে বলা আছে, সংসদীয় কমিটি এই সংবিধান ও অন্য কোনো আইনসাপেক্ষে খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে।
আইনের বলবৎকরণ পর্যালোচনা এবং অনুরূপ বলবৎকরণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করতে পারবে। জনগুরুত্বপূর্ণ বলে সংসদ কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করলে সেটি কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজ বা প্রশাসন সম্বন্ধে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে। মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের এবং মৌখিক বা লিখিত উত্তর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে।
বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে, সংসদ সংসদীয় কমিটি সাক্ষীদের হাজিরা বলবৎ করার, শপথ, ঘোষণা বা অন্য কোনো উপায়ের অধীন করে তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ, দলিলপত্র দাখিল করতে বাধ্য করার ক্ষমতা দিতে পারবে।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় কমিটিগুলো মূলত মন্ত্রণালয়ের কাজের তদারকি করে। ‘ওয়চ ডগ’ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সুপারিশ দেয়। কমিটি তার কাজের প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করে। কমিটিতে পাঠানো কোনো বিলে পরিবর্তন আনতে চাইলেও সেটি সুপারিশ আকারে সংসদের সামনে পেশ করতে হয়। কমিটির সুপারিশ মানার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানে কমিটি বিষয়ক বিধান থাকায় এই ব্যবস্থাকে একটি ‘দৃঢ় সাংবিধানিক ভিত্তি’ দিয়েছে বলে মনে করেন কে এম মহিউদ্দিন। বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটি সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত, নিয়োগ ও স্পিকারের মাধ্যমে মনোনয়নের মাধ্যমে গঠিত হয়। সংসদের সব কমিটি সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত থাকে। তবে সংসদের মেয়াদকালের মধ্যে কমিটি পুনর্গঠন করা যায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি দুই ধরনের কাজ করে। তারা সরকারি বিল পরীক্ষা করে। এবং মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকি করে। সংসদ কোনো কমিটিকে কিছু জানালে সেই বিষয়ে তদন্ত করে। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কমিটি কাজ করে। বাংলাদেশের সংবিধানে সাক্ষী হাজিরা, সাক্ষ্যগ্রহণ, দলিল দাখিল করার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা আইনের অধীনের হবে বলে বলা হয়েছে। তবে ওই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। এ নিয়ে নবম সংসদে বেশ আলোচনা হয়েছিল।
ওই সংসদের সংসদীয় কমিটির সভায় অষ্টম সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমদেকে তলব করা হয়। তাদের কেউ সংসদীয় কমিটির আহ্বানে সাড়া দেননি। যদিও পরে ফখরুদ্দীন আহমদ ও মইন ইউ আহমদ চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। পরে সাবেক সেনাপ্রধান টেলিফোনে সংসদীয় একটি উপ-কমিটিতে স্বাক্ষ্য দেন। ২০১১ সালে এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয় সরকারের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় জমা দেয়। যদিও তাতে সরকার সায় দেয়নি।
যেহেতু বাংলাদেশের সংসদীয় কমিটির কাজ পরামর্শমূলক, সে কারণে সরকার তাদের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। এ বিষয়ে নবম সংসদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অন্য স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। তারা একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে উপস্থাপনও করেছিলেন। কিন্তু সরকার তরফে সেরকম সাড়া পাওয়া যায়নি।