একসময় বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি শিল্প এখন গভীর সংকটে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই খাতকে গতিশীল করতে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে। তবে চিংড়ি রপ্তানিকারক ও প্রক্রিয়াকারকরা আশঙ্কা করছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর শর্তের কারণে এই উদ্যোগও আগের মতোই ব্যর্থ হতে পারে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দশক আগে যে হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, এখন তা বছরে ৩০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) অধীনে নিবন্ধিত কারখানার অর্ধেকেরও বেশি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংকট ও কাঁচামালের অভাবই এর প্রধান কারণ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি ৪০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। পরের বছর তা ২৫ কোটি ডলারের নিচে নেমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে প্রায় ৩০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার কমে মাত্র সাড়ে ২৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
গত আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদি এক বিশেষ তহবিল ঘোষণা করে। নতুন হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা স্থাপন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করা এবং সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের জন্য এই ঋণ দেওয়া হবে।
তবে বিএফএফইএ সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘‘অতীতে এ ধরনের তহবিল খুব কমই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছেছে। তফসিলি ব্যাংক থেকে এসব তহবিলের ঋণ পাওয়া বেশ কঠিন। অনেক সময় অপ্রকৃত ব্যক্তিরা নানাভাবে ৭ শতাংশ সুদের সুবিধা নিয়ে নেন, আর প্রকৃত চিংড়ি রপ্তানিকারকদের ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না করে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের এই সুবিধার আওতায় না আনলে এ ধরনের তহবিল কোনো কাজে আসবে না।”
রপ্তানিকারকরা ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলা ২৪ কোটি ডলারের বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংক সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের উদাহরণ টানছেন। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিকে সন্তোষজনক বলে মূল্যায়ন করলেও উপকূলীয় চিংড়ি চাষিরা বলছেন, অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়নি। শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “এই প্রকল্পে কয়েকটি ভবন আর কয়েকটি চিংড়ি ব্লক তৈরি হয়েছে। এর বেশি কিছু হয়নি। ভবন আর ব্লক দিয়ে উৎপাদন বাড়ে না।”
নতুন তহবিল নিয়েও অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। সার্কুলার অনুযায়ী নতুন কারখানার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাত বছর মেয়াদি ঋণ পাওয়া যাবে। অথচ কাঁচামালের অভাবে বিদ্যমান কারখানাগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি চিংড়ি উৎপাদন মাত্র ৪০০ কেজি, যেখানে ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে তা ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কেজি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন কারখানায় ঋণ দেওয়ার আগে বন্ধ হওয়ার পথে থাকা কারখানাগুলোকে বাঁচানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত।
বিএফএফইএ সিনিয়র সহসভাপতি তারেকুল ইসলাম জহির সতর্ক করে বলেন, “নতুন কারখানা স্থাপনের নামে ৩০ কোটি টাকা ঋণ দিলে অনেকেই টাকা আত্মসাৎ করতে পারে। এখানে চালু কারখানাগুলো যাতে চালু থাকে এবং বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো যাতে আবার চালু হয়, সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে। ভ্যানামেই চিংড়ি রপ্তানি করতে না পারায় লাভজনকতা কমছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে ভ্যানামেই কিনে একই দামে আমাদের ঐতিহ্যবাহী চিংড়ি কিনতে চায়। কেজিপ্রতি ৫ ডলারে চিংড়ি বিক্রি করে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে লাভ করা সম্ভব নয়।”
নতুন তহবিলের একটি শর্ত হলো—ঋণগ্রহীতাদের দুই বছরের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আর কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তহবিল পাওয়া যাবে না। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ৫ কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও শহরভিত্তিক অনেক কারখানা মালিক বলছেন, তাদের কাছে সৌর প্যানেল বসানোর জায়গা নেই।
চিংড়ি ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু তহবিল ঘোষণা করলেই হবে না। টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, তফসিলি ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বাধ্য করতে হবে এবং পুরো চিংড়ি খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এই তহবিলও আগের মতোই ব্যর্থ হবে এবং হিমায়িত মাছ শিল্প আরও গভীর সংকটে ডুবে যাবে।