এক দশক আগেও সৌদি আরবে নারীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট কাজ ছাড়া অন্য কোনো চাকরি করার অনুমতি ছিল না। এরপর সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বেশিরভাগ বিধিনিষেধের অবসান ঘটান, তিনি সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতিও দেন। তার লক্ষ্য ছিল রাজ্যটি যেন তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিশ্রমে মনোযোগী হতে পারে। ঘরের কোণে বন্দি থাকা জনসংখ্যার অর্ধেককে কাজে নামানোই ছিল এর প্রথম ও স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
এর ফলাফল ছিল বেশ নাটকীয়। রিয়াদের হামদা নামের এক তরুণী আনন্দের সাথে এই খবরটি শোনেন এবং তার স্বামীকে জানান যে, তিনি চাকরি করতে চান। কিন্তু তার স্বামী স্পষ্ট বারণ করে দেন। হামদার স্বামীর মতে, স্ত্রী বাড়ির বাইরে কাজ করলে পরপুরুষের সাথে কথা বলতে পারে, যা পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনবে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামদা এক বছর ধরে স্বামীর সাথে লড়াই করেন। অবশেষে দুটি কারণে তিনি জয়ী হন। প্রথমত, ঘরে বাড়তি অর্থ আসার সুবিধা।
হামদা বলেন, “আমি তাকে বলেছিলাম, আমাদের তো বিল পরিশোধ করতে হবে।” দ্বিতীয়ত, হামদার স্বামীর বোনেরা সবাই চাকরি পেয়ে যায়। ফলে পরিবারের রাতের খাবার টেবিলে বসে ‘শুধুমাত্র চরিত্রহীন নারীরাই চাকরি করে’- স্বামীর পক্ষে এমন দাবি করা হঠাৎ করেই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই হামদা একটি শপিং মলে চাকরি খুঁজে নেন, যেখানে তিনি পায়জামা বিক্রি করেন। তিনি জানান, তার জীবন এখন অনেক ভালো। একদিন তিনি নিজের গাড়ি কিনতে চান এবং নিজের ব্যবসা শুরু করতে চান।
কাজের অনুমতি পাওয়াই যেখানে নারীর প্রধান লড়াই
বিশ্বের অনেক অঞ্চলে নারীদের প্রধান লড়াই সমান বেতন পাওয়ার জন্য নয়; বরং কাজ করার জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি পাওয়াই সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অ্যালিস ইভানসের মতে, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুরুষের সম্মান অনেকটাই নির্ভর করে নারীদের গৃহবন্দি রাখার ওপর। বাবা, ভাই ও স্বামীরা অনেক সময় মনে করেন, নারীর ঘরের বাইরে যাওয়া সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে এবং তার সতীত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সামাজিক ব্যবস্থা পুরো একটি অঞ্চলকে দরিদ্র করে রাখে। দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় তা মাত্র এক-পঞ্চমাংশ। বিপরীতে উত্তর আমেরিকায় প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে সাতজন কাজ করেন।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, নারীদের কাজের পথে বাধাগুলো দূর করা গেলে অনেক দেশে মাথাপিছু আয় এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। হামদার গল্প দেখিয়ে দেয়, আগে ঘরে আটকে থাকা নারীরা যখন আয় করতে শুরু করেন, তখন পরিবারের ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়। কাজ পরিবারকে আরও সমতাভিত্তিক করে তুলতে পারে।
নারীবিদ্বেষ ও নারী শ্রমের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক
নারীবিদ্বেষী সামাজিক নিয়ম ও নারী শ্রমের সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে। এ ক্ষেত্রে তারা ‘প্যাট্রিলিনিয়াল/ফ্র্যাটার্নাল সিন্ড্রোম’ বা পিতৃতান্ত্রিক/ভ্রাতৃত্বমূলক উপসর্গ নামে একটি সূচক ব্যবহার করেছে। এই সূচকটি তৈরি করেছেন টেক্সাস এঅ্যান্ডএম-এর ভ্যালারি হাডসন এবং ব্রিগহ্যাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির ডোনা লি বোয়েন ও পারপেটুয়া লিন নিলেসেন।
সূচকটি চরম পুরুষতান্ত্রিক আচরণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক আইন ও সম্পত্তির অধিকারে নারীদের সঙ্গে বৈষম্য, কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া, বহুবিবাহ, পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাত এবং নারীদের ওপর সহিংসতার প্রতি সহনশীলতা। এসব তথ্যের সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর নারীদের ওপর পরিচালিত ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেস বা ডিএইচএস-এর তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি নারীবিদ্বেষী ২১টি দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ নারী কাজ করেন। একটি পরিবার বা দেশ কতটা দরিদ্র, তা বিবেচনায় নিলেও এই হার খুব একটা বদলায় না। তবে নারীবিদ্বেষের মাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে, যেখানে আয় করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট। মাঝারি মাত্রার নারীবিদ্বেষী দরিদ্র দেশগুলোর সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারে নারী শ্রমের হার বেড়ে ৫৫ শতাংশ হয়। আর সবচেয়ে কম নারীবিদ্বেষী দেশগুলোতে তা ৮০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
আয় বাড়লে বাড়ে পারিবারিক ক্ষমতাও
এরপর প্রশ্ন ওঠে, অর্থ উপার্জন নারীদের পারিবারিক মর্যাদায় কোনো প্রভাব ফেলে কি না। এ বিষয়টি বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়েছে ‘সার্ভে-বেসড উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ইনডেক্স’ বা এসডব্লিউপিইআর । এই সূচক তৈরি করেছেন ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পেলোটাসের ফার্নান্দা এভারলিং, আলুসিও বারোসসহ আরও কয়েকজন।
ডিএইচএস-এর তথ্য ব্যবহার করে এই সূচক মূল্যায়ন করে পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা। তারা পরিবারের বাজেট কীভাবে খরচ হবে তা নির্ধারণ করতে পারেন কি না, অনুমতি ছাড়াই বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়িতে যেতে পারেন কি না। অর্থাৎ পরিবারের সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের মূল্য কতটা, সেটিই এর মূল বিষয়।
ফলাফলও ছিল চমকপ্রদ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব নারীর চাকরি রয়েছে, তারা পরিবারে নিজেদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব পায়।
এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। যেসব সমাজে নারীদের অনুগত থাকার প্রত্যাশা করা হয়, সেখানে কাজে যাওয়া নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। হামদার ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গেছে।
এ ছাড়া কোনো নারী যখন সংসারের আয়ের বড় একটি অংশ উপার্জন করেন, তখন সেই অর্থ কীভাবে খরচ হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর্থিক স্বাধীনতা তাকে অসন্তোষজনক সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগও দেয়, অথবা প্রয়োজনে সম্পর্ক ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। ফলে স্বামীকেও ভালো আচরণ করতে হয়, নয়তো একাকী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কুর্দিশ-সুইডিশ লেখিকা সাকিনে মাদোনের ভাষায়, “ অর্থই ক্ষমতা।” তার মতে, নারীরা স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বিবাহবিচ্ছেদ নেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করেন।
শুধু আইন বদলালেই সব বাধা কাটে না
কিছু দেশে নারীদের কাজের পথে বাধা আনুষ্ঠানিক ও আইনি। বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ সূচক অনুযায়ী, প্রায় ৫৪ কোটি নারী এমন দেশে বাস করেন, যেখানে আইনি সমতা এখনো অনেক দূরের বিষয়।
আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির পেনি গোল্ডবার্গ দেখতে পেয়েছেন, এই সূচকে কোনো দেশের স্কোরের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীদের সফলতার অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তাই আইন পরিবর্তন নারীদের কর্মসংস্থানে সাহায্য করতে পারে। সৌদি আরব তার একটি উদাহরণ। কিন্তু আইন পরিবর্তন কেবল শুরু। বিশ্বব্যাংকের ক্যাথরিন বিগল বলেন, সামাজিক নিয়মগুলো প্রায়ই আরও গভীর চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। পরিবারের কোনো সদস্য সকালে খাবার বানাবে এ বিষয় সরকারের প্রচলিত নীতি নির্ধারণের আওতায় পড়ে না।
কর্মক্ষেত্রে ভারতের নারীরা। ছবি: রয়টার্স
উত্তর ভারতের উত্তর প্রদেশের সমাজকর্মী সন্ধ্যার জীবন তার উদাহরণ। তিনি এমন একটি গ্রাম্য হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে “পুরুষরা কখনো রান্নাঘরে যায় না।” মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যাকে কোনো পুরুষ আত্মীয় ছাড়া কোথাও যেতে দেওয়া হতো না। তিনি মুখের ওপর কথা বললে স্বামী তাকে মারধর করতেন।
ছয় বছর পর তিনি স্বামীকে ছেড়ে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যান। নিজের ও ছেলের ভরণপোষণের জন্য তিনি কাজ শুরু করেন, প্রথমে একজন নার্স হিসেবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিষাক্ত কুৎসা ছড়াতে থাকে। কেন তিনি দেরিতে বাড়ি ফেরেন, কেন সুন্দর পোশাক পরেন- এমন প্রশ্নের পাশাপাশি তাকে ‘বেশ্যা’ বলেও অপবাদ দেওয়া হয়। তবে এসব মিথ্যা অপবাদ তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধ্বংস করতে পারেনি।
কুৎসা ও অভিবাসনও নারীর পথে বাধা
ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে, অন্যান্য অনেক জায়গার মতোই, কুৎসা সামাজিক স্থবিরতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। পুরুষেরা ভালো মজুরির আশায় শহরে চলে যান। কিন্তু কোনো নারী একই কাজ করতে চাইলে তাকে যৌনকর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে, যা তার ভবিষ্যৎ বিয়ের পথ কঠিন করে তোলে।
ফলে ভারতে শহরমুখী অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের প্রায় সবাই পুরুষ। এতে অভিবাসীদের বসবাসের জায়গাগুলো নারীদের জন্য ভীতিকর হয়ে ওঠে এবং পুরুষেরা মেয়েদের গ্রাম ছাড়তে বাধা দেওয়ার সুযোগ পায়। তারা দাবি করে, মেয়েদের নিরাপত্তার জন্যই এই বাধা প্রয়োজন। এর ফলে মেয়েরা ঘরে থেকে রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করলে পুরুষেরা সেটিকে বাড়তি সুবিধা হিসেবেই দেখে।
গভীরভাবে জেঁকে বসা নারীবিদ্বেষী সামাজিক নিয়মের দেশে নারীদের চাকরিতে আনার প্রচলিত কারিগরি উদ্যোগও কম কার্যকর হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভর্তুকি দেওয়া শিশু যত্নকেন্দ্র বা ডে-কেয়ার নরডিক দেশগুলোর নারীদের জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু মিশরে এক গবেষণায় মায়েদের শিশুদের ক্রেশ বা ডে-কেয়ারের খরচ আংশিক বা পুরোপুরি বহনের জন্য ভাউচার দেওয়া হলেও মাত্র ১১ শতাংশ মা তা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ সস্তা ডে-কেয়ারের চেয়ে সেখানে পুরুষতান্ত্রিক স্বামীদের সিদ্ধান্ত বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে।
অর্থ-প্রযুক্তি সামাজিক প্রভাবে বদল আনতে পারে
সামাজিক নিয়ম স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে এগুলোও বদলায়। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় ড্যানিয়েল হালিম, মাইকেল ও'সুলিভান এবং অভিলাষা সহায় দেখিয়েছেন, অর্থ, প্রযুক্তি, সামাজিক প্রভাব এবং স্থান পরিবর্তন সবই সামাজিক নিয়ম বদলে দিতে পারে।
প্রথমত, অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নারী কাজে বের হলে পুরুষ আত্মীয়েরা মনে করতে পারেন, এতে তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কিন্তু চরম রক্ষণশীল পুরুষেরাও বাড়তি অর্থ পছন্দ করেন। অ্যালিস ইভানস এটিকে ‘সম্মান/আয়ের ভারসাম্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বিভিন্ন সমাজ এই দ্বন্দ্বের সমাধান ভিন্নভাবে করেছে। চীন সানন্দে আয়কে বেছে নিয়েছে। কমিউনিস্ট বিপ্লব নারীদের কর্মক্ষেত্রে ঠেলে দিয়ে পিতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভাঙার চেষ্টা করেছিল। পরে পুঁজিবাদী সংস্কার সেই পরিবারগুলোকে পুরস্কৃত করেছে, যাদের মেয়েরা কারখানায় কাজ করতে গেছে।
সম্ভবত এ কারণেই চীনের কর্মক্ষম নারী জনসংখ্যা ভারতের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও চীনের নারী শ্রমশক্তি ভারতের প্রায় তিনগুণ।
সফল নারী বদলে দিচ্ছেন পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থ মানুষকে প্রভাবিত করে। কোনো নারী ভালো মজুরি উপার্জন করলে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নারীরা এসব কাজের যোগ্য নন- এমন ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
রিয়াদের একটি বিউটি পার্লারের মালিক ওয়াফা আল-ওতিবি জানান, তার নিজের ভাইও একসময় তাকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি হোম মেকআপ স্টুডিও শুরু করার জন্য ভাইয়ের কাছে ঋণ চেয়েছিলেন। ভাই কিছু টাকা ধার দিলেও তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন এবং বলেছিলেন, তিনি কী করছেন তা নিজেই জানেন না। ভাই এটিকে লজ্জাজনক বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই ওয়াফা ঋণের টাকা ফেরত দেন। তখন তার ভাই তার লাভজনক ব্যবসায় অংশীদার হতে চান।
ওয়াফার ভাষায়, “নারীদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে। নারীরা কী করতে পারে তা দেখে তারা এখন অবাক হয়।”
মজুরি নারীদেরও অনুপ্রাণিত করে, বিশেষ করে যখন উপার্জিত অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে তার নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের হাতে থাকে। ডিউক ইউনিভার্সিটির এরিকা ফিল্ড ও অন্যদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের একটি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারীরা বেশি কাজ করেছেন যখন তাদের মজুরি স্বামীদের অ্যাকাউন্টে না গিয়ে নিজেদের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ।
শিক্ষাও বদলে দেয় সামাজিক ধারণা
অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে পারে। উত্তর প্রদেশের একটি ছোট কারখানার মালিকের মেয়ে পূর্ণিতা আগরওয়াল তার শৈশবের কথা স্মরণ করে জানান, তখন স্বামীরা ছিলেন অত্যাচারী এবং স্ত্রীদের সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টার মধ্যে ঘরে ফিরতে হতো।
পূর্ণিতা নিজের অর্থ উপার্জনের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। পরে তিনি ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সুযোগ পান তিনি। তার কয়েকজন আত্মীয় তখন তার মা-বাবাকে তাকে বিদেশে না পাঠানোর পরামর্শ দেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এই টাকা যৌতুকের পেছনে খরচ করা ভালো হবে, কারণ একটি মেয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিয়ে করা। তারা আরও সতর্ক করেছিলেন, বিদেশে পড়াশোনা করলে পার্নিতাকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত পড়তে যান।
ভারতে ফিরে এসে পরিবারের ব্যবসা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় এবং মা-বাবাকে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায় এমন নানা ধারণা নিয়ে তিনি ফেরেন। তখন তার আগে বিরোধী মনোভাব পোষণ করা আত্মীয়রা বুঝতে পারেন, তাদের ধারণা ভুল ছিল। পূর্ণিতার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন ওই আত্মীয়েরা নিজেদের মেয়েদেরও পড়াশোনার জন্য বাইরে পাঠাচ্ছেন।
প্রযুক্তি খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা
প্রযুক্তিগত সংযোগ সামাজিক পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আফগান প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রোয়া মাহবুব লিখেছেন, চরম নারীবিদ্বেষী সমাজে ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের একটি ভিন্ন জীবনের স্বপ্ন দেখতে সক্ষম করে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী উদাহরণ সবসময় কোনো দূরবর্তী উদার বা স্বাধীনচেতা দেশ থেকে আসে না। অনেক সময় সামান্য কম রক্ষণশীল প্রতিবেশী দেশই বড় প্রভাব ফেলে।
সৌদি আরবের এইচআর ম্যানেজার নাওয়াল আল-ওনাজি জানান, ছোটবেলায় তিনি অন্যান্য আরব দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত নারীদের সাক্ষাৎকার এবং মিশরীয় কমেডি নাটক দেখতেন, যেখানে পরিবারের তুলনামূলক নমনীয় রূপ ফুটে উঠত। পরবর্তী সময়ে তিনি এমন এক স্বামীকে তালাক দেন, যিনি তাকে কাজ করতে দিতেন না। প্রযুক্তি শুধু নারীদের নয়, তাদের পরিবারকেও প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের ম্যাডেলিন ম্যাককেলওয়ে উত্তর প্রদেশে একটি গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে মাত্র ছয় মিনিটের একটি ভিডিও দেখানোর পর তাদের স্ত্রীদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ থেকে ৫৭ শতাংশ বেড়ে যায়। ভিডিওতে নারীরা একটি জব-ট্রেনিং কর্মসূচিতে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের নির্দিষ্ট চাকরির সুযোগ খুঁজে পেতেও সহায়তা করে। ইন্টারনেটে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে নারীরা ঘরে বসেই তা দেখতে ও আবেদন করতে পারেন। অনেকে ঘরে বসে দূরবর্তী বা রিমোট কাজও করতে পারেন।
ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটির জিং লুর এক গবেষণায় দেখা গেছে, চাকরি খোঁজা সহজ করে এবং অনলাইন কাস্টমার সার্ভিসের মতো নতুন নারী-বান্ধব পেশা তৈরি করে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার চীনে নারীদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
কী ধরনের চাকরি করছেন নারীরা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
নারীরা কী ধরনের কাজ করছেন, সেটিও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির জোহানা মোলারস্ট্রম। তার মতে, বিবাহিত নারীদের জন্য যদি অধিকাংশ চাকরিই অনিরাপদ ও নোংরা হয়, তাহলে কর্মজীবী স্ত্রী পাড়া-প্রতিবেশী বা ধর্মীয় স্থানের মানুষের কাছে এমন একটি সংকেত দিতে পারেন যে তার সক্ষম স্বামী আসলে অলস।
তবে একটি দেশ যত ধনী হয় এবং নারীদের জন্য চাকরিগুলো যত উন্নত ও মানসম্মত হয়, ততই এই সামাজিক কলঙ্ক বা কুসংস্কার কমে।
অ্যালিস ইভানস বিষয়টিকে ‘সম্মান ও আয়ের ভারসাম্য’ দিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, চাকরির সুযোগ যত উন্নত হবে, ঘরে বসে থেকে কাজ না করার আর্থিক ক্ষতিও তত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে। একই সঙ্গে সমাজে কাজ করার ফলে নারীদের সম্মানহানির যে কথিত ঝুঁকি থাকে, তা কমে এলেও এই ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।
সৌদি আরবের বর্তমান শাসক এই দুটি পথই বেছে নিয়েছেন। সেখানে স্থানীয় নাগরিকদের নিয়োগ দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজে ও জনসমক্ষে নারীদের অবস্থান যে সম্মানজনক, সেটি বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে রাজপরিবারের নারীদের অংশগ্রহণে ফ্যাশন শো আয়োজনের কথা বলা যায়।
সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙতে স্থান পরিবর্তন
পিতৃতান্ত্রিক কুসংস্কার ও বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে এমন কোনো পরিবেশে চলে যাওয়া, যেখানে পুরোনো সামাজিক নিয়মগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই।
ইরাকের বাসিন্দা সারা মোহাম্মদের বয়স যখন ১৭ বছর, তখন তার ভাই মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে তাকে বিয়েতে রাজি করাতে চেয়েছিলেন। শর্ত ছিল- সারা তার দ্বিগুণ বয়সের এক অপরিচিত পুরুষকে বিয়ে করবেন, আর বিনিময়ে তার ভাই সুযোগ পাবেন সেই পুরুষের বোনকে বিয়ে করার।
সারা দুবার এই প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানান। তখন তার ভাই হুমকি দিয়ে বলেন, তৃতীয়বার ‘না’ বললে তাকে হত্যা করা হবে- ঠিক এক গ্লাস পানি খাওয়ার মতোই সহজে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত সারা প্রস্তাবে সায় দিতে বাধ্য হন। তবে বিয়ের আয়োজন চলার সময়ই তিনি কৌশল খাটিয়ে এক আত্মীয়ের বোরকা পরে পালিয়ে যান। প্রথমে এক সহানুভূতিশীল কাজিনের কাছে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন।
বর্তমানে তিনি জিএপিএফ নামের একটি দাতব্য সংস্থা পরিচালনা করছেন, যা অনার-কিলিং সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করে। এখন তার এমন একজন জীবনসঙ্গী রয়েছেন, যার কাছ থেকে কাজ করা বা চলাফেরার জন্য কোনো অনুমতি নিতে হয় না।
অভিবাসন বনাম পুরোনো মানসিকতা
তবে অভিবাসী হওয়ার পর নতুন সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ নয়। নারীরা খুব কম সময়ই একা অভিবাসন করেন; সাধারণত তারা পুরুষ আত্মীয়দের সঙ্গেই আসেন। ফলে ওই পুরুষ আত্মীয়েরা প্রায়ই চেষ্টা করেন নারীদের মূল সমাজের সঙ্গে মিশতে না দিয়ে পূর্বের গণ্ডির মধ্যেই আটকে রাখতে।
অন্যদিকে, স্বাধীনচেতা বা উদারপন্থী দেশগুলোতে ‘অনার-কালচার’ সমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীদের আগমন সব সময় ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না।
উদাহরণস্বরূপ, সুইডেনের অনেক নাগরিক একসময় আশঙ্কা করেছিলেন যে এক দশক আগে মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রভাবে তাদের স্থানীয় নারীবাদী মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই সামাজিক আশঙ্কাই একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
তবে বাস্তব চিত্র বলে, এই ভয় অনেকটাই অতিরঞ্জিত। স্থানীয় অধিবাসীরা সচরাচর নতুন আসা অভিবাসীদের রীতিনীতি গ্রহণ করেন না; বরং অভিবাসীরাই ধীরে ধীরে স্থানীয় মূলধারার সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন।
১৮টি ইউরোপীয় দেশে ৪৬টি ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের অভিবাসী পরিবারের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় প্রজন্মের নারী অভিবাসীরা তাদের পুরুষ সহোদরদের তুলনায় অনেক বেশি সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
স্বাধীন সংস্কৃতির অনুপ্রেরণা
উদারপন্থী ও মুক্ত সংস্কৃতি যেকোনো নারীর জন্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। কাইনেম (ছদ্মনাম) নামের এক নারী ছোটবেলায় তুরস্ক থেকে পরিবারসহ সুইডেনে আসেন। তিনি শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার অন্য নারী কাজিনদের মতো ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ জীবন যাপন করবেন না। তার ভাষায়, সেই কাজিনেরা প্রথাগত নিয়ম মেনে খুব কম বয়সে বিয়ে করেছিল, পড়াশোনা এড়িয়ে গিয়েছিল এবং এমনকি তাদের সবার ঘরের আসবাবপত্রও ছিল প্রায় একই ধাঁচের।
কাইনেমের এই পরিবর্তনের সফরটি অবশ্য এক দিনে হয়নি। তার মা-বাবা তুলনামূলক নমনীয় হওয়ায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, তবে তাদের শর্ত ছিল প্রতি সাপ্তাহিক ছুটিতে যেন তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।
কাইনেম ধীরে ধীরে নিয়মিত বাড়ি ফেরা কমিয়ে দেন এবং সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া শুরু করেন। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি মেডিকেল টেকনোলজি খাতে ভালো চাকরি পান এবং নিজের উপার্জনে স্টকহোমে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন। মেয়ের এই স্বাধীনতায় মা-বাবা সাময়িক কষ্ট পেলেও কাইনেম নিজের লক্ষ্য থেকে সরেননি। পরবর্তীতে তিনি এক সুইডিশ নাগরিককে বিয়ে করলে তার মা-বাবা এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে টানা পাঁচ বছর তার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ রাখেন। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্ব মিটে গেছে। এখন তার পরিবার মেনে নিয়েছে যে কাইনেম নিজের জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবেন।
বর্তমানে কাইনেম জানান, তার সেই কাজিনদেরও প্রায় অর্ধেকের বেশি এখন কর্মজীবী।
কাইনেমের ভাষায়, “তারা শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে যে নারীরাও পরিবারে আর্থিক অবদান রাখতে পারে। আর দিনশেষে ইতিবাচক স্বাবলম্বিতা সবাই পছন্দ করে।”
বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ কেবল তাদের ব্যক্তিগত আয় বা আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে না; এটি বদলে দিচ্ছে পারিবারিক ক্ষমতার ভারসাম্য, পুরুষদের প্রথাগত মানসিকতা এবং বহু বছরের চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক নিয়ম। অর্থ, শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং স্থান পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব- সব মিলিয়ে ভাঙতে শুরু করেছে সেই অদৃশ্য শৃঙ্খল, যা দীর্ঘদিন নারীদের চারদেয়ালের মাঝে বন্দি করে রেখেছিল।