গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হওয়া ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়েছে। কিন্তু দুর্যোগের পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট হয়নি। তবে কীভাবে এই দুর্যোগ শুরু হয়েছিল, তা মোটামুটি জানা গেছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্রোত লহেন্দে খোলা নদীর গতিপথ আটকে দেয়। মাত্র তিন মিনিট পর সেই বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর ভয়াবহ পানির স্রোত, পাথর, কাদা ও বরফসহ নেপালের ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে নিচের দিকে ছুটে যায়।
নেপালে আকস্মিক বন্যার নয়দিন পর টানেল থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ছবি: বিবিসি
এ ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন শিবু গিরি নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, পানির বিশাল ঢেউ একটি পুরো সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ঢেউয়ে তার ট্রাক উল্টে দেওয়ার ঠিক আগে তিনি দৌড়ে জঙ্গলে চলে যান। পরে একটি গুহায় রাত কাটান। পরদিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার তাকে উদ্ধার করে। তবে অনেকেই বাঁচতে পারেননি। আকস্মিক বন্যার পানিতে কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি তলিয়ে যায়।
দুর্যোগের সপ্তাহ পেরিয়েছে। জানা গেছে, এক হাজারের বেশি মানুষ এতে মারা গেছেন এবং ৪ হাজারের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ও নিহতদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশিও ছিলেন। তাদের মধ্যে তিব্বতের কৈলাসে পর্বতে যাওয়ার পথে থাকা হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও ছিলেন।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যায় প্রায় ৮০টি সেতু এবং ৪০ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ১৪টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি তখনও নির্মাণাধীন ছিল। ফলে নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।
নেপাল এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ হয়। আবার উষ্ণ মৌসুমী বাতাসের সঙ্গে হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাসের সংঘর্ষও ঘটে। পাহাড়ের ঢালও অনেক জায়গায় দুর্বল ও অস্থিতিশীল। এসব কারণে নেপাল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর একটি।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিখোঁজ। ছবি: রয়টার্স
এদিকে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। ২০০০ সালের তুলনায় এখন সেখানকার হিমবাহ প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত গলছে। তাই আগামী বছরগুলোতে আরও হিমবাহ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহের পানি জমে তৈরি হওয়া হ্রদগুলোর বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঘটনাও বাড়তে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি নেপাল। তাই ভবিষ্যতে এমন বড় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য দেশটি ভালোভাবে প্রস্তুত নয়।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের বয়স মাত্র ৩৬ বছর। তিনি আগে র্যাপার ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাস হয়েছে। এক বছর আগে নেপালের তরুণরা পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে আগের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
এখন তার সরকারকে এই দুর্যোগের পর দেশ পুনর্গঠনে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে। কিন্তু যেসব ধনী দেশ আগে নেপালকে সাহায্য করত, তারাও এখন বিদেশে দেওয়া সাহায্যের অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিলের কাছেও পর্যাপ্ত অর্থ নেই। দরিদ্র দেশগুলো আগে যে সাহায্য চেয়েছে, সেটুকুও দেওয়ার মতো অর্থও তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্র নেপালকে ৩৬ লাখ ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থ দিয়েছিল, এটি তার ৩ শতাংশেরও কম।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অর্থের অভাবে শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হবে না। ভবিষ্যতে আরও টেকসই ও নিরাপদভাবে রাস্তা, সেতু ও গ্রাম পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের একে অন্যের প্রতি আস্থা কম এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের তথ্য ও সম্পদ ভাগ করতে চায় না।
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০টির বেশি হিমবাহ রয়েছে। কিন্তু এগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য মাত্র ৩৮টি কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে মাত্র ৭টি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কাজ করে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থার প্রধান পেমা গিয়ামতশো বলেন, ‘‘নেপালকে তুলনামূলক ধনী প্রতিবেশী দেশগুলোর সাহায্য নিতে হবে। উন্নত সেন্সর, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নদী ও পানির প্রবাহের তথ্য দ্রুত একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করার ব্যবস্থা করতে হবে।’’
কিন্তু চীন পানির প্রবাহসংক্রান্ত তথ্যকে অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখে। ফলে চীনের থেকে নিচু ভূমিতে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশগুলো অনেক সময় আগাম তথ্য না পেয়ে হঠাৎ বিপদের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এমন আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যার আগে কোনো আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাই নেপালকে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিতে পারত না। তবে ভবিষ্যতে হিমালয়ের পাহাড় ও পানির কারণে সৃষ্ট বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালের আরও অর্থ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি তথ্য আদান-প্রদান দরকার।