বিশ্বজুড়ে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। একে বলা হয় সিডও সনদ। এই পূর্ণরূপ হলো– ‘দ্য কনভেনশন অন দি অ্যালিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন’।
১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ গৃহীত হয়, যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। তখন থেকে সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর এ সনদ অনুমোদন করে।
বিশ্বের নারীর মানবাধিকার অর্জনের সবচেয়ে বড় সংবিধান হচ্ছে সিডও সনদ। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৯টি দেশ জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ এখন পর্যন্ত এই সনদের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন দেয়নি। সেই সব দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশও।
১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সিডও সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে। অনুমোদনকালে বাংলাদেশ সরকার ২, ১৩ (ক) এবং ১৬(১) (গ) ও (চ) ধারাগুলো আপত্তিসহ স্বাক্ষর করে। পরে জাতীয় পর্যায়ে গঠিত রিভিউ কমিটির সুপারিশক্রমে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ১৩ (ক) ও ১৬(১) (চ) ধারা থেকে বাংলাদেশ তার আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে বাংলাদেশ অনুচ্ছেদ ২ এবং ১৬(১)(গ)–অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ধারায় নিজেদের ‘সংরক্ষণ’ বহাল রেখেছে। ফলে দেশের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা অনেকটাই পশ্চাৎমুখী হয়ে আটকে রয়েছে বলে মনে করছেন নারী অধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
যেখানে বাধা বাংলাদেশের
অনুচ্ছেদ ২-কে সিডও সনদের প্রাণ বলা হয়। এই ধারায় নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিরসনে রাষ্ট্রের সার্বিক আইনি ও প্রশাসনিক অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের আপত্তি। কারণ, এটি মেনে নিলে দেশের ধর্মীয় পারিবারিক আইনগুলোকে সংশোধন করে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন চালু করতে হবে, যা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
অনুচ্ছেদ ১৬(১)(গ) বিয়ে এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলে। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ধর্মীয় আইনের কারণে আপত্তি জানিয়েছে। বাংলাদেশে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর, খোরপোশ এবং উত্তরাধিকার বা সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়গুলো সাধারণ নাগরিক আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না। এগুলো নিজ নিজ ধর্মের (যেমন: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান) ব্যক্তিগত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
পারিবারিক আইন, উত্তরাধিকার এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সম-অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় সিডও সনদের মূল উদ্দেশ্যই বাংলাদেশে ব্যাহত হচ্ছে।
বাস্তবে, বাংলাদেশের এই ধরনের আপত্তির অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক, যার মধ্যে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কারণ দেশের সংবিধানের, ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র জীবনের সর্বস্তরে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারীদের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ২৮(৪) অনুচ্ছেদ, যেখানে নারীর অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে। এখানে নারীর মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হবে বলে সংবিধানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা রয়েছে। মানে রাষ্ট্র চাইলেই সংবিধানের এই ধারা ব্যবহার করে সিডও-র অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬(১)(গ) অনুমোদন দিতে পারে। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্র তাদের আপত্তি বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন এবং সিডও-র এই আপত্তিগুলোর মধ্যকার বিরোধটি স্পষ্টভাবে নিরসন করা হয়নি, যা নতুন করে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, শরিয়াহ আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার সূত্রে একজন কন্যা সন্তান পুত্র সন্তানের অর্ধেক সম্পদ পেলেও তাদের মধ্যে সমানভাবে সম্পত্তি বণ্টন করাকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তা ছাড়া বাংলাদেশ শরিয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত নয়।
একই ধরনের সংকট রয়েছে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে। এখনো সেকেলে উত্তরাধিকার আইন বলবৎ থাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ ভারতে একই ধরনের হিন্দু আইনগুলো ইতিমধ্যেই সংস্কার করা হয়েছে।
ফলে কোনো অভিন্ন পারিবারিক আইনের অনুপস্থিতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়গুলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়, যা এসব ক্ষেত্রের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে।
উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম বিবাহগুলো শরিয়াহ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে যেসব মুসলিম নারী দাম্পত্য জীবনে বৈষম্য কিংবা নির্যাতনের শিকার হন, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ তাদের অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশে কোনো শরিয়াহ আদালত কিংবা নির্দিষ্ট আইনি ধারাবাহিকতা নেই। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের কোনো সুযোগই নেই।
সার্বজনীন আইন না থাকায় রাষ্ট্রীয়ভাবে সমতা নিশ্চিত করার সংবিধানিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও নিজ নিজ ধর্মীয় আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে বিশেষ করে নারীদের অধিকার বা আইনি সুরক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ সিডও কমিটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, আর্টিকেল ২ ও ১৬-তে বাংলাদেশ যে সংরক্ষণ বজায় রেখেছে, তা সিডও সনদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়, ধর্মভিত্তিক পারিবারিক কাঠামোর কারণে সিডও সনদের পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব নয়। অথচ তুরস্ক, ইয়েমেন, জর্ডান, লেবানন, তিউনিসিয়া, মরোক্ক ও কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কোনো আপত্তি ছাড়াই সিডও সনদ পুরোপুরি অনুমোদন করেছে। এমনকি এদের মধ্যে কিছু দেশ নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনে সংস্কারও এনেছে।
২০০৪ সালে মরক্কো তাদের পারিবারিক আইন বা মুদাওয়ানা সংশোধন করে নারী ও পুরুষকে পরিবারের সমান দায়িত্ব দেয়, নারীদের তালাকের অধিকার সহজ করে এবং বহুবিবাহ প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ১৯৫৬ সালের পারিবারিক আইন সংস্কারের পর তিউনিসিয়া ২০১৭ সালে অমুসলিম পুরুষদের সঙ্গে মুসলিম নারীদের বিয়ের আইনি বাধা দূর করে এবং সিডও সনদের সব ধরনের রিজার্ভেশন প্রত্যাহার করে নেয়।
বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে
সিডও সনদের ২ এবং ১৬(১) ধারায় আপত্তি বা সংরক্ষণ বহাল রেখে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নবম ও দশম যৌথ পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বাংলাদেশ। কোভিডসহ নানা জটিলতায় বিলম্ব হওয়ায় ২০২০ সালের নবম প্রতিবেদনটি নির্ধারিত সময়ে জমা দিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে ২০২৫ সালের নির্ধারিত ১০ম প্রতিবেদনের সাথে মিলিয়ে গত বছর দুটি প্রতিবেদন একযোগে জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের নারী অধিকার পরিস্থিতির সার্বিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গত বছরের ১৯ এপ্রিল ৪৩৩টি সুপারিশ প্রদান করে। এই সুপারিশগুলোর আলোকে আইনি বৈষম্য দূরীকরণসহ বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সব ধর্মের জন্য ঐচ্ছিক একটি অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়, যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এসব বাস্তবায়নের কথা ভাবছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ১৯৮৪ সাল থেকে সিডও সনদের ২ ও ১৬(১) ধারায় সংরক্ষণ বজায় রাখলেও তা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের চেষ্টা করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সিডও-তে কোনো সংরক্ষণ না রাখা তিউনিসিয়া এবং মরক্কোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ সিডও বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে।
একই উদ্দেশ্যে ‘পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩’-এর মাধ্যমে বিয়ে, দেনমোহর, খোরপোশ ও সন্তানের হেফাজতসংক্রান্ত বিষয়ে পারিবারিক আদালতকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ে মাকে সন্তানের একক আইনি অভিভাবকের স্বীকৃতি দেওয়ায় সব দাপ্তরিক কাগজে মা-বাবা দুজনের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
এ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের কথা। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিবেদনে উত্থাপিত প্রস্তাবের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, অগ্রগতি না হওয়ার ব্যাপারে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।