নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১৪২ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়বে। সরকার বলছে, দীর্ঘদিন পর বেতন কাঠামো সমন্বয়ের ফলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তারা আরও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। ঘুষ-দুর্নীতি কমবে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব শুধু সরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ, নিত্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এমনিতেই সামগ্রিক অর্থনীতি এখন চাপের মধ্যে। তাই এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর ইতিহাস বলছে, বেতন বাড়লেও ঘুষ-দুর্নীতি কমে না।
নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের কর্মীদের বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের ওপর একবারে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমবে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের জন্য এটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। কারণ, অতিরিক্ত এই ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তাছাড়া সরকারের উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের অন্য খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে হবে অথবা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ার পর তাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে। সেই অর্থের একটি অংশ বাজারে খরচ হবে। ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। অর্থনীতিতে উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদার চাপ গিয়ে পড়তে পারে দামে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চারচাকে বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো ইতিবাচক। এতে সরকারি কর্মীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং এর মাধ্যমে জনগণ ভালো সেবা পেতে পারেন। তবে একই সঙ্গে এর প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়বে। কারণ এই বাড়তি বেতনের প্রভাব অন্য সব খাতে গিয়েও পড়বে। বিষয়টি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।”
অর্থাৎ সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে অর্থনীতির অন্যান্য খাতও যুক্ত। সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যয় বাড়লে বাজারে চাহিদা বাড়বে। একই সময়ে বেসরকারি কর্মীদের আয় না বাড়লে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় বৈষম্য সৃষ্টি হবে।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশের মতে, অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা যখন ভালো নয়, তখন নতুন করে এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হলে সরকারের আয়ও বাড়াতে হবে।
চরচাকে তিনি বলেন, “সার্বিক অর্থনীতির অবস্থাও তো ভালো নয়। নতুন করে টাকা দিতে হলে ইনকামও বাড়াতে হবে। তবে যেহেতু এটা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে সেহেতু চাপ কিছুটা কম হবে।”
অর্থাৎ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের ওপর পুরো ব্যয়ের চাপ পড়বে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয় সরকারের বাজেটের একটি স্থায়ী অংশ হয়ে যাবে। ফলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সবচেয়ে বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটি হতে পারে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি চরচাকে বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ল। এখন বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও মজুরি বাড়ানোর দাবি তৈরি হবে। তারাও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করবেন। ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও মজুরি সমন্বয়ের চাপ বাড়তে পারে। এছাড়া বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর আয় বাড়ানোর চাপ রয়েছে।”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখানেই অর্থনীতির জন্য একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সবার পক্ষে একই হারে বেতন বাড়ানো সম্ভব হবে না। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, ঋণের সুদ, রপ্তানি পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত মজুরি ব্যয় বহন করতে গেলে তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ মুজেরি মনে করেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামো নেই এবং চাকরির শর্ত ও সুযোগ-সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও এর সুফল অর্থনীতির সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির পর বেসরকারি খাতেও একই ধরনের বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের সেই সক্ষমতা নেই।
চরচাকে তিনি বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ায় এখন বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বেতন বাড়ানোর ক্ষমতা বেসরকারি খাতের নেই। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।”
ব্যবসায়ী নেতা হাতেমের মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাত কোনোভাবেই বেতন বৃদ্ধির চাপ সহ্য করার অবস্থায় নেই। বিশেষ করে উৎপাদন ও ব্যবসার ব্যয় যেখানে আগে থেকেই বেশি, সেখানে নতুন করে মজুরি ব্যয় বাড়লে প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয় পণ্যের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো মুনাফা কমাতে হবে কিংবা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে কাটছাঁট করতে হতে পারে।
বেতন বাড়লেই ভালো সেবা পাবে জনগণ?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম যুক্তি হলো, তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে দায়িত্ব পালনে আগ্রহ বাড়বে এবং জনগণ আরও ভালো সেবা পাবেন। তবে এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ।
চরচাকে তিনি বলেন, “জনগণ ভালো সেবা পাবেন, নাকি পাবেন না, সেটা বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, বেতন বাড়লে তারা ভালো সেবা দেবে। এটা ভুল। বেতন যত বাড়বে, বিভিন্ন অনৈতিক লেনদেনও তত বাড়বে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, “একসময় বেসরকারি খাতে বেতন বেশি ছিল এবং সরকারি খাতে বেতন তুলনামূলক কম ছিল। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই উল্টে গেছে। সরকারি খাতে বেতন বেশি এবং বেসরকারি খাতে তুলনামূলক কম। অর্থাৎ শোধবোধ হয়ে গেল।”
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির আরেকটি সম্ভাব্য সুফল হিসেবে ঘুষ ও দুর্নীতির প্রবণতা কমার কথা বলা হলেও এ যুক্তির সঙ্গে একমত নন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতা দেখলে বেতন বাড়ানোর সঙ্গে ঘুষ কমার সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায় না। সরকার যে পরিমাণ বেতন বাড়িয়েছে, সেই পরিমাণ ঘুষ কমেছে কি না তা অতীত ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে- তা কমেনি। সরকার বেতন বাড়ালো সেটা ভালো কথা। এখন এই বেতনটা কতটা ভালোভাবে ব্যয় হচ্ছে সেটার জন্য তদারকি দরকার। যারা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বা দায়িত্বে অবহেলা করে তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার।”
তার মতে, শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের জবাবদিহি, নজরদারি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে বেতন বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের প্রসঙ্গও তুলেছেন আহসান এইচ মনসুর। তার আশঙ্কা, সরকারি চাকরির আর্থিক সুবিধা যত বাড়বে, চাকরি পাওয়ার জন্য অবৈধভাবে অর্থ দেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “চাকরি নিতে গিয়ে যে ব্যক্তি আগে ১০ লাখ টাকা দিত, তাকে এখন ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। তারপর সে যখন চাকরি পাবে তখন সে তার বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে।”
অর্থাৎ, দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ না করে শুধু বেতন বাড়ালে বেতন বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। একজন সরকারি কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় যদি বড় অঙ্কের অর্থ অবৈধভাবে ব্যয় করেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। ফলে বেতন বাড়ার সঙ্গে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি কমার বদলে উল্টো নতুন চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
সুবিধা পাবেন সরকারি কর্মীরা, চাপ পড়বে অন্যদের ওপর
অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সরকারি কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হতে পারে এর অর্থনৈতিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়।
সরকারি কর্মীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। বেসরকারি খাতেও মজুরি বাড়ানোর দাবি তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। আবার সরকার যদি বাড়তি ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করে, সেক্ষেত্রেও অর্থনীতিতে অন্য ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
নজরদারি ও রাজস্ব বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাড়তি ব্যয়ের অর্থের যোগান এবং এর মূল্যস্ফীতিমূলক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির বিনিময়ে জনগণ যাতে প্রকৃত অর্থে উন্নত সেবা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের কাজের তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
আর এম এম আকাশ ও মুস্তফা কে. মুজেরি মনে করেন, বেসরকারি খাতের ওপর মজুরি বৃদ্ধির চাপ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই সরকারকে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হবে।