আপনি মোবাইল ফোনে কখন, কার সঙ্গে কথা বলছেন, কতক্ষণ বলছেন, কথোপকথনের সময় কোন এলাকায় ছিলেন— এমন সব তথ্য চাইলেই যে কেউ পেতে পারে। দাম? মাত্র এক হাজার টাকা। তা-ও একদিন বা দু’দিনের নয়। তিন মাস থেকে এক বছরের তথ্য মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ক্রেতার কাছে পৌঁছে যায়।
অনলাইনে আপনার, আমার ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনার একটি বড় বাজার গড়ে উঠেছে। বিক্রেতারা সামাজিক মাধ্যমে ‘এই সেবার’ প্রচারণা চালান, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য বিক্রি করেন, টেলিগ্রাম চ্যানেলে গ্রাহক সেবা দেন এবং সেখানে বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টাকা বিনিময় করেন।
ফোন কলের বিবরণী ছাড়াও এই বাজারে নির্দিষ্ট দরে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, নির্দিষ্ট নম্বরে প্রতিটি এসএমএস বার্তার বিবরণ, একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফোন গ্রাহক যে মোবাইল টাওয়ারের আওতায় ছিলেন তার অবস্থান, আয়কর শনাক্তকরণ বা টিন নম্বর এবং এমনকি এমএফএস অ্যাকাউন্টের হিসাব বিবরণীও ঘটা করে, মূল্য তালিকা দিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এজন্য আপনাকে শুধু একটি মোবাইল নম্বর বা এনআইডির নম্বর দিতে হবে। সেটির সাথে সংশ্লিষ্ট বাকি তথ্য বিক্রেতারাই জোগাড় করে নেবেন, তাও একেবারে আনুষ্ঠানিক বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সার্ভার কপি হিসেবে।
ডিসমিসল্যাব শুধু এক মাসে (১৬ জুন থেকে ১৫ জুলাই) মাত্র একটি কি-ওয়ার্ড বা শব্দগুচ্ছ দিয়ে সার্চ করে শুধু ফেসবুকে ছয়শর বেশি পোস্ট পেয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনার প্রচারণা চালানো হয়েছে। এই সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে ১০টি ওয়েবসাইট পেয়েছে; প্রতিটিতে নিবন্ধন করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের মূল্য তালিকা সংগ্রহ করেছে। ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তিনজন বিক্রেতার কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মোবাইল ফোন গ্রাহকের সিডিআর বা কল বিবরণী, তার সর্বশেষ অবস্থান এবং জাতীয় পরিচয়পত্র কিনেছে এবং বিকাশে তার মূল্য পরিশোধ করেছে।
বিক্রেতারা মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপে ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদককে গ্রাহক সেবা দিয়েছেন। ডিসমিসল্যাব, বিক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত তথ্য সেই গ্রাহকদের সঙ্গে যাচাই করে দেখেছে, বেচাকেনা হওয়া তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র পুরোপুরি সঠিক।
কল রেকর্ড বা গ্রাহকের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য। এগুলো সাধারণত মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের আইন ও বিধান অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা, তদন্ত বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সরকারের নজরদারি সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এই তথ্যে প্রবেশাধিকার পায়। অথচ সেই তথ্যই এখন খোলাবাজারে, যে কারো হাতের নাগালে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত চার বছর ধরে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বেচাকেনার প্রচারণা চলছে। এই বিষয়ে দুটি মোবাইল অপারেটর ও একজন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা হয়। বিশেষজ্ঞের মতে, এসব তথ্য ‘রিয়েল টাইমে’ বা একেবারে হালনাগাদ অবস্থায় পাওয়া সম্ভব কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জড়িত থাকলে অথবা তাদের তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে পাশ কাটিয়ে তৃতীয় পক্ষ সেই তথ্যে প্রবেশাধিকার পেলে। দুই ক্ষেত্রেই দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। একটি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান বলেছে, অনেক আগেই প্রমাণসহ তারা বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেছেন, কিন্তু বিক্রি থামেনি।
১৭ মিনিটে এনআইডি, ১৬ মিনিটে অবস্থান, ২ ঘণ্টায় কল বিবরণী
গত জুনে ভোটার তালিকা বিক্রি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট চোখে পড়ে ডিসমিসল্যাবের গবেষকদের। সেই পোস্টের একটি মন্তব্যে এক ব্যক্তি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এর সূত্র ধরে ‘সাইন কপি’ লিখে সার্চ দিয়ে শুধু ফেসবুকেই ৬৭৫টি পোস্ট পাওয়া যায়। ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশিত এসব পোস্টের ৬০৫টিই ছিল ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির। বাকি পোস্টগুলো আগ্রহী ক্রেতাদের।
সাইন কপিতে ব্যক্তির এনআইডি ও ভোটার নম্বর, জন্মতারিখ, মা-বাবার নাম, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, ঠিকানা, ভোটার এলাকা, ধর্ম, শারীরিক শনাক্তকরণ চিহ্ন এবং স্বাক্ষর বা টিপসইয়ের তথ্য থাকে। আর বিক্রেতাদের ভাষায়, ‘সার্ভার কপি’ হলো নির্বাচন কমিশনের লোগোযুক্ত একটি পিডিএফ, যেখানে এনআইডির বিস্তারিত তথ্য থাকে।
এরকমই একটি পোস্টের সূত্র ধরে একটি টেলিগ্রাম লিংকের সন্ধান পান এই প্রতিবেদক। লিংকটি ‘ভোটার লিস্ট’ নামের একটি গ্রুপে নিয়ে যায়। সেখানে ‘শিবাত জুবার’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘নম্বর থেকে এনআইডি বের করতে ইনবক্স করুন’। ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মোবাইল নম্বর দিয়ে ওই সিমের নিবন্ধিত মালিকের এনআইডি বের করে দিতে পারবেন।
একজন গ্রাহকের সম্মতি নিয়ে তার মোবাইল নম্বর ও অগ্রিম হিসেবে ৫০০ দেওয়া হয় শিবাতকে। আর তিনি ১৭ মিনিটের মধ্যেই এনআইডি কার্ডের পিডিএফ পাঠিয়ে দেন। যাচাই করে দেখা যায়, নাম, ছবি, জন্মতারিখসহ সব তথ্য সিমটির প্রকৃত মালিকের। এমনকি দুই মাস আগে সংশোধন করা তার মায়ের নামও হালনাগাদ ছিল। আরেকটি নম্বর দিয়ে একইভাবে যাচাই করেও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়।
গ্রুপটির অ্যাডমিন ‘হেল্প বিডি’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এই ‘সেবা’ বা ‘সার্ভিস’ বিক্রির প্রচার করছিলেন। তার পোস্টে এনআইডির ‘সাইন কপি’ ও ‘সার্ভার কপি’ ছাড়াও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, মোবাইলের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), এসএমএস তালিকা, আইএমইআই নম্বর, টিন সনদ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্টের কপি ও ভূমি উন্নয়ন করের খাজনার কপিও বিক্রির প্রস্তাব ছিল।
গত ২৫ জুন ক্রেতা সেজে অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। মোবাইল নম্বর বা ভোটার নম্বর দিয়ে কী তথ্য পাওয়া যাবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার কাছে ওয়েবসাইট আছে। আমি সার্ভার কপিটা বের করে পিডিএফ দেব।”
১৫০ টাকা পাঠিয়ে একটি ভোটার নম্বর ও জন্মতারিখ দেওয়া হলে তিনি একটি এনআইডি কার্ডের পিডিএফ পাঠান। যাচাইয়ে সেটি সঠিক পাওয়া যায়। এরপর ২৫০ টাকা দিয়ে পরিচিত আরেক ব্যক্তির সম্মতি নিয়ে তার মোবাইল নম্বরের ‘সাইন কপি’ চাওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটিও পাওয়া যায়।
এরপর ওই অ্যাডমিনের কাছে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের তিন মাসের সিডিআর চাওয়া হয়। এক হাজার ৫০ টাকা পাঠানোর আড়াই মধ্যে ফাইলটি পাওয়া যায়। এর সর্বশেষ ২০টি যোগাযোগের নম্বর, সময় ও কলের ধরন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফোনের কল হিস্ট্রির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রতিটি তথ্যই মিলে যায়।
সিডিআরে কার সঙ্গে কখন ও কতক্ষণ কথা হয়েছে, কলটি করা নাকি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং তখন ফোনটি টুজি না ফোরজি নেটওয়ার্কে ছিল— এসব তথ্য রয়েছে। এতে মোবাইল সেট শনাক্তকারী আইএমইআই এবং সিম শনাক্তকারী আইএমএসআই নম্বরও পাওয়া যায়। ফলে একটি সিম কোন মোবাইল সেটে ব্যবহার করা হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব।
কল বা এসএমএসের সময় নম্বরটি কোন এলাকার মোবাইল টাওয়ার বা নেটওয়ার্ক সেলের আওতায় ছিল, সেই তথ্যও ফাইলটিতে রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের এমন রেকর্ড বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তির আনুমানিক চলাচলও শনাক্ত করা সম্ভব।
ফেসবুক পোস্ট ও সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রাম গ্রুপ বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পায় ডিসমিসল্যাব। অনুসন্ধানের স্বার্থে সাইটগুলোতে নিবন্ধন করে দেখা যায়, প্রায় সব কটির নকশা ও কার্যপদ্ধতি একই। ড্যাশবোর্ডে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, টিন সনদ, সিডিআর ও মোবাইলের অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্যের দাম দেওয়া আছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ২০২৫ সালে নিবন্ধিত।
উন্মুক্ত উৎসে অনুসন্ধান করে এমন একটি ওয়েবসাইটের মালিকের সন্ধান মেলে। তিনি চাঁদপুরে মোবাইল ফোন মেরামতের কাজ করেন। তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটি গ্রামীণফোন নম্বরের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। টাকা দেওয়ার ১৬ মিনিটের মধ্যে নম্বরটির সক্রিয় থাকার সর্বশেষ সময়, মোবাইল টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান, ঠিকানা ও গুগল ম্যাপের লিংক পাওয়া যায়।
বাজারটি বড়, বেচাকেনা হয় কয়েক স্তরে
আগেই বলা হয়েছে, মাত্র এক মাসে ছয়শর বেশি ফেসবুক পোস্টে এ ধরনের তথ্য বিক্রির প্রচারণা চলেছে। বাজারটি কত বড় হয়েছে তার একটি ধারণা মিলবে, এই প্রচারণায় ব্যবহার করা মোবাইল নম্বরের সংখ্যা দিয়ে। পোস্টগুলোতে যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২ টি স্বতন্ত্র মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রামীণফোনের একটি নম্বরই (০১৩৭*****৩২) ৭৫টি পোস্টে দেখা গেছে। ১০টি ওয়েবসাইটে টাকা লেনদেনের জন্য ১০টি এমএফএস নম্বর পাওয়া গেছে।
ফেসবুকে সক্রিয় ৩৬টি ফেসবুক গ্রুপে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রচার একাধিকবার দেখা গেছে। গ্রুপগুলোর অনেকগুলোর নামেই এনআইডি, সাইন কপি বা জন্মনিবন্ধন সেবার উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি গ্রুপে অন্তত পাঁচবার করে এমন পোস্ট পাওয়া গেছে। এই সাতটি গ্রুপে প্রচারণামূলক পোস্ট দেখা গেছে মোট ১১৪টি।
এত পোস্ট, ফোন নম্বর ও গ্রুপ পাওয়া গেছে মাত্র একটি সামাজিক মাধ্যমে এবং মাত্র একটি কি-ওয়ার্ড (সাইন কপি) সার্চ করে। প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এই বাজারের নিচের স্তরের ব্যক্তিরা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালান, এবং কেউ যোগাযোগ করলে টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ক্রেতাকে সরবরাহ করেন। তারা বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায়ের মাধ্যমে সাইটে টাকা জমা দিয়ে তথ্যের জন্য অর্ডার করেন। পরে সেই তথ্য হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করেন। ওয়েবসাইটগুলো চালান মধ্যবর্তী বিক্রেতারা। এ কারণে ওয়েবসাইটে তথ্যের দাম সরাসরি বিক্রেতাদের চেয়ে কম।
ভিডিওর মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য কেনা-বেচার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। ছবি: ইউটিউবের ভিডিও থেকে
চাঁদপুরের সেই ওয়েবসাইট মালিক জানান, তিনি মোবাইল গ্রাহকদের কল লিস্ট আটশ টাকা দিয়ে কিনে নয়শ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি বলেন, “এক হাজার টাকা দিলে কোনো বিকাশ নম্বর কোন আইডি কার্ড দিয়ে খোলা, ওই আইডি কার্ডটা দেওয়া হয়, আর চার হাজার পাঁচশ টাকা দিলে বিকাশের স্টেটমেন্টও বের করা যায়।”
এই বিক্রেতা দাবি করেন, আরেকটি দলের কাছ থেকে তিনি তথ্য নেন এবং এই দলটি মূলত অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস বা এপিআই ব্যবহার করে সরকারি সার্ভার বাইপাস করে এসব তথ্য সংগ্রহ করে। তিনি আরও দাবি করেন, “পুলিশের যে মেইন ডেটাবেজ আছে, যেখান থেকে এনআইডি ও জন্মতারিখ দিয়ে সার্চ করলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়, সেটাকে ওরা এপিআই বানিয়েছে। চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করে হোস্ট কিনে এপিআই বানিয়ে তারা মাত্র দুই-তিন টাকায় একেকটি এনআইডির তথ্য বিক্রি করছে।”
ডিসমিসল্যাব তার এই বক্তব্যের কারিগরি দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তিনি যাদের কাছ থেকে তথ্য নেন তাদের পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, “খুব পরিষ্কার যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কেউ ছাড়া রিয়েল টাইম ইনফরমেশন দিতে পারবে না। তার মানে, এখানে একটি চক্র কাজ করছে, যাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার আছে এমন লোক জড়িত। অথবা বাইরে থেকে কোনো লুপহোল দিয়ে তারা প্রবেশ করছে, যা হয়তো উপাত্ত-জিম্মাদার টেরই পায়নি।”
সবাই জানে, তবু বেচাকেনা থেমে নেই
সবার চোখের সামনেই নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বাজারটি বড় হয়েছে। ডিসমিসল্যাবের গবেষণায়, ২০২৩ সালেও এমন তথ্য বিক্রির পোস্ট পাওয়া গেছে। ইউটিউবে সার্চ করে ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে একই ধরনের সেবা বিক্রির কথা বলা হয়েছে। একটি মোবাইল অপারেটর আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষকে প্রমাণসহ অভিযোগ জানিয়েছে।
সিডিআর এবং গ্রাহকের অবস্থানের প্রাথমিক তথ্য থাকে মোবাইল অপারেটরদের কাছে। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে একটি লিখিত বিবৃতিতে গ্রামীণফোন জানায়, গ্রাহকের তথ্য ও উপাত্তের সুরক্ষাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং প্রযোজ্য আইন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান এবং অনুমোদিত মানদণ্ড অনুসারে গ্রাহকের তথ্য কেবল অনুমোদিত ব্যক্তিদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
রবি আজিয়াটা জানায়, “সিডিআর, সিম নিবন্ধন এবং লোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য শুধুমাত্র আইন অনুযায়ী অনুমোদিত সরকারি সংস্থাকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রদান করা হয়। গ্রাহকের তথ্য অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।”
দেশের একটি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিসমিসল্যাবকে জানান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারসহ ১০টির বেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপারেটরটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের কল ডিটেইল রেকর্ড ও সিম নিবন্ধনে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে ও পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “আমরা বরং নিজেদের উদ্যোগে অনুসন্ধান করেছি, কে বা কারা এই তথ্যগুলো ফাঁস করছে। সেই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এপিআই ব্যবহার করে কিছু তথ্য ফাঁস করা হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর ওই সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি বিটিআরসিকেও আমরা একাধিকবার অবগত করেছি।”
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন ডিসমিসল্যাবকে বলেন, আনুমানিক দুই মাস আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। তারা বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠিটি ফরোয়ার্ড করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনঅনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে এনটিএমসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে জানানো হয়, নাগরিকদের এনআইডি কার্ড ও কল বিবরণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৭৮৯টি গ্রুপে বিক্রি হচ্ছিল। তদন্তে বেরিয়ে আসে, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের এক পুলিশ সুপার এবং র্যাব-৬-এর একজন সহকারী পুলিশ সুপারের লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সাইবার ক্রাইম উইংয়ের একজন কনস্টেবল টাকার বিনিময়ে সংবেদনশীল কল বিবরণী বিক্রিতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
গ্রাহকের এনআইডি, কল তালিকা, অবস্থান — ঝুঁকি কোথায়
জাতীয় পরিচয়পত্র, সিডিআর বা লোকেশন অন্যের হাতে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক। সুমন আহমেদ সাবির বলেন, “বাংলাদেশে এনআইডি হচ্ছে একটি ভেরিফিকেশন টুল। এই এনআইডির সব তথ্য কারও কাছে থাকলে সে আমার নামে একটি ফেক অ্যাকাউন্ট করতে পারে, আমাকে প্রিটেন্ড করে জালিয়াতি করতে পারে। পুরোপুরি আমার একটি ফলস আইডেন্টিটি তৈরি করা সম্ভব। ডিজিটাল যুগে এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়।”
“আপনার নামে ফেইক ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন করে, ইলিগ্যাল ট্রানজেকশন করে আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে। আবার আপনার ভ্যালিড অ্যাকাউন্ট থেকে ভবিষ্যতে টাকা ট্রান্সফারের সুযোগও তৈরি করে দিতে পারে যদি আরও কিছু তথ্য তার সঙ্গে যুক্ত হয়। এই সবগুলো বিষয় কো-রিলেটেড। কাজেই ঝুঁকির মাত্রাটা অত্যন্ত ব্যাপক।”
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক প্রাইভেসি ইনফরমেশন সেন্টার বা ইপিকের প্রকাশনায় দেখানো হয়েছে, ডেটা ব্রোকারদের হাতে থাকা উপাত্ত পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, অভিবাসী ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, একই ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে, ওই ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। উপাত্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনিক জরিমানার বিধান রয়েছে, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে ৬৮টি নথিভুক্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনা পর্যালোচনা করে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট একটি গবেষণায় বলেছে, এমন খুব কম উদাহরণই রয়েছে যেখানে তথ্য ফাঁসের ঘটনায় প্রতিষ্ঠান বা দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মো. আব্দুল মমিন সরকার জানান, এ বিষয়ে বক্তব্য পেতে কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশাকে প্রশ্ন পাঠানো হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি। এনটিএমসির একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালকের ই-মেইলে সাক্ষাৎকারের অনুরোধ পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর নিরাপত্তা পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির। সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. মো. তৌয়বুর রহমান সাক্ষাৎকারের সময় দিলেও পরে দেখা করতে পারেননি। তাঁর সম্মতিতে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তিনিও উত্তর দেননি।
সাবির বলেন, সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির। সংস্থাটি সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
সাবির মনে করেন, শুধু প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয়, তথ্য নিয়ে কাজ করা কর্মীদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণও জরুরি। তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে হয়তো উনি ভাবেনই না যে, এটি একটি গোপনীয় ডেটা, এটি লিক করা যায় না এবং এর ফলে অন্য কারও প্রাইভেসির লঙ্ঘন হতে পারে। এই বোধটাই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের আছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ জাগে।”
লেখক: রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব