চরচা ডেস্ক

২০২৩ সালের অক্টোবরের এক গভীর রাত। লাওসে অবস্থানরত উগান্ডার নারী সারাহ বুঝতে পারলেন তার প্রসববেদনা শুরু হয়েছে। তখন রাত ১১টা, কিন্তু তার লাওসের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ভেতরে গড়ে ওঠা সাইবার স্ক্যামের এক বন্দিশালায় তখন দীর্ঘ নাইট শিফটের প্রস্তুতি চলছিল। কর্মীরা সবাই একে একে লগ-ইন করছিলেন অনলাইনে, আমেরিকানদের ফাঁদে ফেলার এক নতুন খেলায়।
প্রতি রাতে এখানকার কর্মীদের ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হতো। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বিলাসবহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করা নারীদের ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করাই ছিল তাদের কাজ। সারাহকে ইন্টারনেটের আনাচে-কানাচে খুঁজে বেড়াতে হতো এমন বয়স্ক পুরুষদের, যাদের সহজে টার্গেট করা যায়। এরপর মেসেজে মেসেজে শুরু হতো ফাঁদ পাতা। কীভাবে? যেমন-তাদের পেশার খুব প্রশংসা করা, দিন কেমন কাটল তার খোঁজ নেওয়া। আর সাথে চলত ঘোরাঘুরি বা সমুদ্র সৈকতের বিলাসী সব ভুয়া ছবি আদান-প্রদান। সারাহর করা প্রতিটি কথোপকথনই সুনিপুণভাবে সাজানো হতো একটি নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য মেনে। লম্বা টেবিলের সারিগুলোর মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে সারাহর বসরা কড়া নজর রাখতেন।
একপর্যায়ে সারাহ খুব চতুরতার সাথে আলাপচারিতাকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের দিকে ঘুরিয়ে দিতেন এবং বিশাল অঙ্কের মুনাফা পাওয়ার ভুয়া স্ক্রিনশট শেয়ার করতেন। মূল লক্ষ্য ছিল ওপারের মানুষটিকে এমনভাবে মোহাচ্ছন্ন করা যাতে সে বড় কোনো অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের স্কিমে পাঠাতে রাজি হয়। আর এটা ছিল পুরোপুরি প্রতারণা।
কিন্তু সারাহ বা তার অন্য সহকর্মীরা কেন রাজি হলেন এই ধরনের প্রতারণামূলক কাজে জড়াতে?
প্রতারণার এই বিশেষ রূপটি ‘পিগ-বুচারিং’ নামে পরিচিত। এটি এখন এতটাই লাভজনক হয়ে উঠেছে যে, অপরাধী চক্রগুলো এর জন্য আস্ত সব বন্দিশালা বা কম্পাউন্ড গড়ে তুলেছে। আর এসব জায়গায় কাজ করতে বাধ্য হওয়া অধিকাংশ নারী-পুরুষই সারাহর মতো। যাদের অন্য দেশ থেকে মানবপাচারের মাধ্যমে এখানে নিয়ে এসে খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে।
উগান্ডার ৩৯ বছর বয়সী সারাহর দোকান ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজারের চাকরির লোভ দেখিয়ে তাকে লাওসে আনা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর তিনটি ভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা বন্দিশালার হাতবদল করে বিক্রি করা হয় তাকে।

সেখানে পৌঁছানোর কয়েক মাস পরেই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সারাহ। কর্মীদের কাছে ‘অন্ধকার ঘর’ নামে পরিচিত একটি আলাদা কক্ষে তাকে কয়েক দিন ধরে তার ওপর চলে যৌন নির্যাতন। মূলত এই বিশেষ ঘরটিতেই কম্পাউন্ডের বসেরা শ্রমিকদের মারধর ও ধর্ষণ করত। আরও বেশি মানুষকে প্রতারণার জালে ফাঁসাতে অস্বীকৃতি জানানোর শাস্তি হিসেবে, একদল পুরুষকে বাধ্য করা হয়েছিল সারাহসহ আরও তিন নারীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করতে।
সারাহ তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি সবার কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কারণ তার মনে তীব্র ভয় ছিল যে চীনা বসেরা এই খবর জানতে পারলে তাকে মেরেই ফেলবে। কিন্তু এখন আর লুকানোর উপায় নেই, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় চলে এসেছে।
সুযোগ বুঝে সারাহ অফিসের সবার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ স্মার্টফোনটি লুকিয়ে হাতে তুলে নেন এবং নিচে বিল্ডিংয়ের প্রবেশদ্বারের দিকে ছুটে যান। নিরাপত্তারক্ষী তখন সেখানে ছিল না। গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্য নিয়ে তিনি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বুঝিয়ে বলেন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সারাহ বলেন “আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না যে, আমি সেখান থেকে বের হতে পেরেছিলাম। হয়তো ঈশ্বরই আমাকে চলে আসতে সাহায্য করেছিলেন।”
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই স্ক্যাম বন্দিশালাগুলোতে মানবপাচারের শিকার হওয়া লাখো মানুষের মতোই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে সারাহর দৈনন্দিন জীবনও কেটেছে জোরপূর্বক শ্রম, গাদাগাদি করে থাকার পরিবেশ আর অমানুষিক মারধরের মধ্য দিয়ে।
তবে এর পাশাপাশি তাকে আরও সহ্য করতে হয়েছে যৌন নির্যাতন। এই অন্ধকার জগৎ থেকে পালাতে সক্ষম হওয়া নারীদের একটি বড় অংশই এখন এই নির্মমতার কথা তুলে ধরছেন, যা এতদিন সবার চোখের আড়ালে ছিল।
প্রধানত চীন ও তাইওয়ানের অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেটের পরিচালিত এই অবৈধ সাইবার প্রতারণার জাল ২০২০ সাল থেকে লাওস, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক হাজার কোটি বা ১০ বিলিয়ন ডলারেরও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
পুরুষদের মতোই নারী সাইবার প্রতারকদেরও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলার কাজ করতে হয়। তবে এর পাশাপাশি তাদের ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করতেন যে, এই অন্ধকার জগতের কর্মী বাহিনীর সিংহভাগই কেবল পুরুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে সরকারি অভিযানে হাজার হাজার কর্মী মুক্ত হওয়ার পর; সেখান থেকে বেঁচে ফেরা নারীরা ক্রমেই এমন সব লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার গল্প তুলে ধরছেন যা এর আগে গণমাধ্যম বা সরকারের পক্ষ থেকে খুব একটা নজরে আনা হয়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এমন ছয়জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে, যারা সবাই একসময় এই বন্দিশালাগুলোতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা সেখানে নারীদের ওপর চলা নির্মম শোষণ, যৌন নিপীড়ন, স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া এবং তীব্র গালাগালির মতো বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন। তারা জানান, এই কম্পাউন্ডগুলোর বসেরা একদিকে নারীদের শাস্তি দিতে যেমন ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের প্রতারণা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারা পুরুষ কর্মীদের পুরস্কার হিসেবেও নারীদের ওপর ধর্ষণের সুযোগ করে দেয়।
এই বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নড়েচড়ে বসেছে।
তারা এখন এই বন্দিশালা বা কম্পাউন্ডগুলোর ভেতরে ঘটা যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলোর নজরদারি করা শুরু করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, “২০২৪ সাল থেকে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপরই যৌন সহিংসতার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।”
এই তথ্যের সপক্ষে তারা মিয়ানমারে ধর্ষণের শিকার ও জোরপূর্বক গর্ভবতী হওয়া ১২ জন নারী এবং ফিলিপাইনের এক গর্ভবতী নারীকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গত এক বছরে এই যৌন নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি নথিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক মন্টসে ফেরার একে ধর্ষণের ‘চরম’ বা চরমপন্থী রূপ, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং গর্ভপাতজনিত মৃত্যুর মতো মারাত্মক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।
এই বর্বর নির্যাতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণটি এখনো অস্পষ্ট। এটি কি আগের চেয়ে বেশি ঘটনা প্রকাশ্যে আসার কারণে নাকি বন্দিশালাগুলোর ভেতরে নারীদের অনুপাত বেড়ে যাওয়ার কারণে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সামগ্রিকভাবে, গত এক বছরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রায় ৮০ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন নারী, যেখানে এর আগের বছর এর অনুপাত ছিল এক-চতুর্থাংশ।
অ্যান্টি-স্ক্যাম অলাভজনক সংস্থা ‘ইওএস কালেক্টিভ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিং লি বলেন, সন্তান লালন-পালন এবং বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার আর্থিক বোঝার কারণেই নারীরা প্রায়শই উপার্জনের জন্য অন্য দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। এমনকি অনেক নারী এমনও জানিয়েছেন যে, তারা খোদ নিজেদের পরিবারের সদস্য বা সঙ্গীদের মাধ্যমেই এই মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের সাক্ষাৎকার নেওয়া এই সাইবার স্ক্যাম কর্মীদের মধ্যে চারজনই ছিলেন সিঙ্গেল মাদার। র্যাচেল নামের ২৯ বছর বয়সী এক কেনিয়ান নারী ২০২৪ সালের শেষের দিকে এক দালালের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের একটি মিষ্টির কারখানায় কাজ পাওয়ার আশায় ২ লাখ শিলিং (১ হাজার ১৫০ পাউন্ড) ধার করেছিলেন।
কিন্তু কারখানার কাজের বদলে তাকে মিয়ানমারের দুটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা করে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো তাকে। একবারে অন্তত ১০০ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে প্রতারণার জালে জড়াতে চ্যাটিং করতে হতো।
এসব চ্যাটিংয়ের জবাব দিতে হতো দ্রুত। না পারলেই বসেরা তার মাথায় কিল-ঘুষি মারত, লাথি মারত এবং যৌন নির্যাতন করত বলে জানান র্যাচেল।
বাবা-মা ও ছোট ছেলের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তিনি। র্যাচেল বলেন, “যদি এমন কেউ থাকত যে আমাকে একটু সতর্ক করে বলত, ‘তুমি যেখানে যাচ্ছ, সেই জায়গাটা ভালো নয়’, তবে হয়তো আমি শুনতাম। কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি শুধু বাইরে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম, যাতে পরিবারের জন্য একটু বেশি রোজগার করতে পারি।”

তবে সব নারীর ভাগ্য র্যাচেলের মতো হয় না, অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেন না। যেমন ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ প্রদেশের ২২ বছর বয়সী লিনতাং। বর্তমানে তিনি একজন স্ক্যাম কর্মী। গত ২০ ফেব্রুয়ারি যখন তাকে কম্বোডিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তার হাঁটার মতো ক্ষমতাটুকুও ছিল না।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি এনজিও-র কেস হ্যান্ডলারের কাছে লিনতাং জানিয়েছিলেন, তাকে বারবার দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, লিনতাং এইচআইভি এবং যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন। বেশ কয়েকটি এনজিও লিনতাংকে চিকিৎসার জন্য ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা করলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত গত ১০ মার্চ তিনি মারা যান।
আবার একটু সারাহর গল্পে ফেরত যাওয়া যাক।
অক্টোবরের সেই সাত সকালে সারাহ যখন হাসপাতালের বিছানায় প্রসববেদনায় ছটফট করছিলেন, তখন স্বাস্থ্যকর্মীরা কাছে চিকিৎসার খরচ দাবি করে বসেন। সারাহ বলেন, “আমার কাছে কিছুই ছিল না, এমনকি গায়ে দেওয়ার মতো বাড়তি একটা কাপড়ও না।”
তবে তার একজন বন্ধু ছিল। নাম তার কেতসানা। লাওসের এই নাগরিক এখন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ঠিক বাইরেই থাকেন। ভোর ৫টার দিকে সারাহ তার সদ্যজাত ছেলের একটি ছবি কেতসানাকে মেসেজ করেন। হঠাৎ এমন ছবি দেখে হতভম্ব কেতসানা কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এটি কার সন্তান?”
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মী এবং দুই সন্তানের জননী কেতসানাকে ২০২২ সালে গৃহপরিচারিকার কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের এক প্রতারণা চক্রে পাচার করা হয়েছিল। এরপর আরও দুটি কম্পাউন্ডে হাতবদল হওয়ার পর শেষমেশ সারাহর সঙ্গে একই বিল্ডিংয়ে তার ঠাঁই হয়। ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকবারই কথা হয়েছিল, তবে পুলিশের এক অভিযানের সময় কেতসানা পালিয়ে যাওয়ার আগে তারা একে অপরের ফেসবুক আইডি বিনিময় নিয়েছিলেন।
কেতসানা দ্রুত একটি ট্যাক্সি পাঠিয়ে সারাহ ও তার নবজাতক শিশুকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসেন। এরপরের এক মাস তারা তিনজন মিলে দুই রুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একসঙ্গে কাটান।
সন্তানের জন্মের ৪০ দিন পর একটি এনজিও-র সহায়তায় সারাহ উগান্ডায় নিজের দেশে ফিরে যান। এরপর থেকে তিনি একজন দর্জি হিসেবে কাজ করার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যেখান থেকে প্রতিদিন তার আয় হয় প্রায় ৭ হাজার উগান্ডান শিলিং (১ দশমিক ৪০ পাউন্ড)। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য এই সামান্য আয় মোটেও যথেষ্ট নয়।
তিনি এখন অন্য নারীদের, বিশেষ করে অন্য সিঙ্গেল মাদারদের সতর্ক করে বলেন যে, বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার আগে তাদের অন্তত দুবার ভাবা উচিত, যেন তাদের আর লাশ হয়ে ফিরতে না হয়।

যেদিনগুলোতে ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই থাকে না কিংবা ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা জোটে না, তখন নানা ধরনের অনুভূতির এক ঝড় বয়ে যায় সারাহর মনের ওপর দিয়ে। একদিকে আর্থিক অনটনের তীব্র হতাশা, অন্যদিকে ছেলের প্রতি বুকভরা ভালোবাসা, আর সেই সাথে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে তার ওপর ঘটে যাওয়া ‘সেইসব অমানুষিক নির্যাতন’।
সারাহ বলেন, “ও যখন ঘুমিয়ে থাকে, আর ওকে খাওয়ানোর মতো কিছুই যখন আমার কাছে থাকে না, ঠিক তখনই পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।”
(দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এই প্রতিবেদনে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে।)

২০২৩ সালের অক্টোবরের এক গভীর রাত। লাওসে অবস্থানরত উগান্ডার নারী সারাহ বুঝতে পারলেন তার প্রসববেদনা শুরু হয়েছে। তখন রাত ১১টা, কিন্তু তার লাওসের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ভেতরে গড়ে ওঠা সাইবার স্ক্যামের এক বন্দিশালায় তখন দীর্ঘ নাইট শিফটের প্রস্তুতি চলছিল। কর্মীরা সবাই একে একে লগ-ইন করছিলেন অনলাইনে, আমেরিকানদের ফাঁদে ফেলার এক নতুন খেলায়।
প্রতি রাতে এখানকার কর্মীদের ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে হতো। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে বিলাসবহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করা নারীদের ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করাই ছিল তাদের কাজ। সারাহকে ইন্টারনেটের আনাচে-কানাচে খুঁজে বেড়াতে হতো এমন বয়স্ক পুরুষদের, যাদের সহজে টার্গেট করা যায়। এরপর মেসেজে মেসেজে শুরু হতো ফাঁদ পাতা। কীভাবে? যেমন-তাদের পেশার খুব প্রশংসা করা, দিন কেমন কাটল তার খোঁজ নেওয়া। আর সাথে চলত ঘোরাঘুরি বা সমুদ্র সৈকতের বিলাসী সব ভুয়া ছবি আদান-প্রদান। সারাহর করা প্রতিটি কথোপকথনই সুনিপুণভাবে সাজানো হতো একটি নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য মেনে। লম্বা টেবিলের সারিগুলোর মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে সারাহর বসরা কড়া নজর রাখতেন।
একপর্যায়ে সারাহ খুব চতুরতার সাথে আলাপচারিতাকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের দিকে ঘুরিয়ে দিতেন এবং বিশাল অঙ্কের মুনাফা পাওয়ার ভুয়া স্ক্রিনশট শেয়ার করতেন। মূল লক্ষ্য ছিল ওপারের মানুষটিকে এমনভাবে মোহাচ্ছন্ন করা যাতে সে বড় কোনো অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের স্কিমে পাঠাতে রাজি হয়। আর এটা ছিল পুরোপুরি প্রতারণা।
কিন্তু সারাহ বা তার অন্য সহকর্মীরা কেন রাজি হলেন এই ধরনের প্রতারণামূলক কাজে জড়াতে?
প্রতারণার এই বিশেষ রূপটি ‘পিগ-বুচারিং’ নামে পরিচিত। এটি এখন এতটাই লাভজনক হয়ে উঠেছে যে, অপরাধী চক্রগুলো এর জন্য আস্ত সব বন্দিশালা বা কম্পাউন্ড গড়ে তুলেছে। আর এসব জায়গায় কাজ করতে বাধ্য হওয়া অধিকাংশ নারী-পুরুষই সারাহর মতো। যাদের অন্য দেশ থেকে মানবপাচারের মাধ্যমে এখানে নিয়ে এসে খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে।
উগান্ডার ৩৯ বছর বয়সী সারাহর দোকান ছিল। সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজারের চাকরির লোভ দেখিয়ে তাকে লাওসে আনা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সাল থেকে শুরু করে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর তিনটি ভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা বন্দিশালার হাতবদল করে বিক্রি করা হয় তাকে।

সেখানে পৌঁছানোর কয়েক মাস পরেই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সারাহ। কর্মীদের কাছে ‘অন্ধকার ঘর’ নামে পরিচিত একটি আলাদা কক্ষে তাকে কয়েক দিন ধরে তার ওপর চলে যৌন নির্যাতন। মূলত এই বিশেষ ঘরটিতেই কম্পাউন্ডের বসেরা শ্রমিকদের মারধর ও ধর্ষণ করত। আরও বেশি মানুষকে প্রতারণার জালে ফাঁসাতে অস্বীকৃতি জানানোর শাস্তি হিসেবে, একদল পুরুষকে বাধ্য করা হয়েছিল সারাহসহ আরও তিন নারীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করতে।
সারাহ তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি সবার কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কারণ তার মনে তীব্র ভয় ছিল যে চীনা বসেরা এই খবর জানতে পারলে তাকে মেরেই ফেলবে। কিন্তু এখন আর লুকানোর উপায় নেই, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় চলে এসেছে।
সুযোগ বুঝে সারাহ অফিসের সবার জন্য ব্যবহৃত সাধারণ স্মার্টফোনটি লুকিয়ে হাতে তুলে নেন এবং নিচে বিল্ডিংয়ের প্রবেশদ্বারের দিকে ছুটে যান। নিরাপত্তারক্ষী তখন সেখানে ছিল না। গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্য নিয়ে তিনি একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বুঝিয়ে বলেন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সারাহ বলেন “আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না যে, আমি সেখান থেকে বের হতে পেরেছিলাম। হয়তো ঈশ্বরই আমাকে চলে আসতে সাহায্য করেছিলেন।”
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই স্ক্যাম বন্দিশালাগুলোতে মানবপাচারের শিকার হওয়া লাখো মানুষের মতোই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে সারাহর দৈনন্দিন জীবনও কেটেছে জোরপূর্বক শ্রম, গাদাগাদি করে থাকার পরিবেশ আর অমানুষিক মারধরের মধ্য দিয়ে।
তবে এর পাশাপাশি তাকে আরও সহ্য করতে হয়েছে যৌন নির্যাতন। এই অন্ধকার জগৎ থেকে পালাতে সক্ষম হওয়া নারীদের একটি বড় অংশই এখন এই নির্মমতার কথা তুলে ধরছেন, যা এতদিন সবার চোখের আড়ালে ছিল।
প্রধানত চীন ও তাইওয়ানের অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেটের পরিচালিত এই অবৈধ সাইবার প্রতারণার জাল ২০২০ সাল থেকে লাওস, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক হাজার কোটি বা ১০ বিলিয়ন ডলারেরও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
পুরুষদের মতোই নারী সাইবার প্রতারকদেরও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ফাঁদে ফেলার কাজ করতে হয়। তবে এর পাশাপাশি তাদের ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করতেন যে, এই অন্ধকার জগতের কর্মী বাহিনীর সিংহভাগই কেবল পুরুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে সরকারি অভিযানে হাজার হাজার কর্মী মুক্ত হওয়ার পর; সেখান থেকে বেঁচে ফেরা নারীরা ক্রমেই এমন সব লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার গল্প তুলে ধরছেন যা এর আগে গণমাধ্যম বা সরকারের পক্ষ থেকে খুব একটা নজরে আনা হয়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ এমন ছয়জন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে, যারা সবাই একসময় এই বন্দিশালাগুলোতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা সেখানে নারীদের ওপর চলা নির্মম শোষণ, যৌন নিপীড়ন, স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া এবং তীব্র গালাগালির মতো বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন। তারা জানান, এই কম্পাউন্ডগুলোর বসেরা একদিকে নারীদের শাস্তি দিতে যেমন ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের প্রতারণা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারা পুরুষ কর্মীদের পুরস্কার হিসেবেও নারীদের ওপর ধর্ষণের সুযোগ করে দেয়।
এই বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নড়েচড়ে বসেছে।
তারা এখন এই বন্দিশালা বা কম্পাউন্ডগুলোর ভেতরে ঘটা যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলোর নজরদারি করা শুরু করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, “২০২৪ সাল থেকে নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপরই যৌন সহিংসতার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।”
এই তথ্যের সপক্ষে তারা মিয়ানমারে ধর্ষণের শিকার ও জোরপূর্বক গর্ভবতী হওয়া ১২ জন নারী এবং ফিলিপাইনের এক গর্ভবতী নারীকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গত এক বছরে এই যৌন নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি নথিবদ্ধ করেছে। সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক মন্টসে ফেরার একে ধর্ষণের ‘চরম’ বা চরমপন্থী রূপ, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং গর্ভপাতজনিত মৃত্যুর মতো মারাত্মক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন।
এই বর্বর নির্যাতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণটি এখনো অস্পষ্ট। এটি কি আগের চেয়ে বেশি ঘটনা প্রকাশ্যে আসার কারণে নাকি বন্দিশালাগুলোর ভেতরে নারীদের অনুপাত বেড়ে যাওয়ার কারণে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সামগ্রিকভাবে, গত এক বছরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রায় ৮০ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন নারী, যেখানে এর আগের বছর এর অনুপাত ছিল এক-চতুর্থাংশ।
অ্যান্টি-স্ক্যাম অলাভজনক সংস্থা ‘ইওএস কালেক্টিভ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিং লি বলেন, সন্তান লালন-পালন এবং বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার আর্থিক বোঝার কারণেই নারীরা প্রায়শই উপার্জনের জন্য অন্য দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। এমনকি অনেক নারী এমনও জানিয়েছেন যে, তারা খোদ নিজেদের পরিবারের সদস্য বা সঙ্গীদের মাধ্যমেই এই মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের সাক্ষাৎকার নেওয়া এই সাইবার স্ক্যাম কর্মীদের মধ্যে চারজনই ছিলেন সিঙ্গেল মাদার। র্যাচেল নামের ২৯ বছর বয়সী এক কেনিয়ান নারী ২০২৪ সালের শেষের দিকে এক দালালের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের একটি মিষ্টির কারখানায় কাজ পাওয়ার আশায় ২ লাখ শিলিং (১ হাজার ১৫০ পাউন্ড) ধার করেছিলেন।
কিন্তু কারখানার কাজের বদলে তাকে মিয়ানমারের দুটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা করে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো তাকে। একবারে অন্তত ১০০ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে প্রতারণার জালে জড়াতে চ্যাটিং করতে হতো।
এসব চ্যাটিংয়ের জবাব দিতে হতো দ্রুত। না পারলেই বসেরা তার মাথায় কিল-ঘুষি মারত, লাথি মারত এবং যৌন নির্যাতন করত বলে জানান র্যাচেল।
বাবা-মা ও ছোট ছেলের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তিনি। র্যাচেল বলেন, “যদি এমন কেউ থাকত যে আমাকে একটু সতর্ক করে বলত, ‘তুমি যেখানে যাচ্ছ, সেই জায়গাটা ভালো নয়’, তবে হয়তো আমি শুনতাম। কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি শুধু বাইরে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম, যাতে পরিবারের জন্য একটু বেশি রোজগার করতে পারি।”

তবে সব নারীর ভাগ্য র্যাচেলের মতো হয় না, অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেন না। যেমন ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ প্রদেশের ২২ বছর বয়সী লিনতাং। বর্তমানে তিনি একজন স্ক্যাম কর্মী। গত ২০ ফেব্রুয়ারি যখন তাকে কম্বোডিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তার হাঁটার মতো ক্ষমতাটুকুও ছিল না।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি এনজিও-র কেস হ্যান্ডলারের কাছে লিনতাং জানিয়েছিলেন, তাকে বারবার দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, লিনতাং এইচআইভি এবং যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন। বেশ কয়েকটি এনজিও লিনতাংকে চিকিৎসার জন্য ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা করলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত গত ১০ মার্চ তিনি মারা যান।
আবার একটু সারাহর গল্পে ফেরত যাওয়া যাক।
অক্টোবরের সেই সাত সকালে সারাহ যখন হাসপাতালের বিছানায় প্রসববেদনায় ছটফট করছিলেন, তখন স্বাস্থ্যকর্মীরা কাছে চিকিৎসার খরচ দাবি করে বসেন। সারাহ বলেন, “আমার কাছে কিছুই ছিল না, এমনকি গায়ে দেওয়ার মতো বাড়তি একটা কাপড়ও না।”
তবে তার একজন বন্ধু ছিল। নাম তার কেতসানা। লাওসের এই নাগরিক এখন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের ঠিক বাইরেই থাকেন। ভোর ৫টার দিকে সারাহ তার সদ্যজাত ছেলের একটি ছবি কেতসানাকে মেসেজ করেন। হঠাৎ এমন ছবি দেখে হতভম্ব কেতসানা কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এটি কার সন্তান?”
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মী এবং দুই সন্তানের জননী কেতসানাকে ২০২২ সালে গৃহপরিচারিকার কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের এক প্রতারণা চক্রে পাচার করা হয়েছিল। এরপর আরও দুটি কম্পাউন্ডে হাতবদল হওয়ার পর শেষমেশ সারাহর সঙ্গে একই বিল্ডিংয়ে তার ঠাঁই হয়। ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকবারই কথা হয়েছিল, তবে পুলিশের এক অভিযানের সময় কেতসানা পালিয়ে যাওয়ার আগে তারা একে অপরের ফেসবুক আইডি বিনিময় নিয়েছিলেন।
কেতসানা দ্রুত একটি ট্যাক্সি পাঠিয়ে সারাহ ও তার নবজাতক শিশুকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসেন। এরপরের এক মাস তারা তিনজন মিলে দুই রুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একসঙ্গে কাটান।
সন্তানের জন্মের ৪০ দিন পর একটি এনজিও-র সহায়তায় সারাহ উগান্ডায় নিজের দেশে ফিরে যান। এরপর থেকে তিনি একজন দর্জি হিসেবে কাজ করার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যেখান থেকে প্রতিদিন তার আয় হয় প্রায় ৭ হাজার উগান্ডান শিলিং (১ দশমিক ৪০ পাউন্ড)। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য এই সামান্য আয় মোটেও যথেষ্ট নয়।
তিনি এখন অন্য নারীদের, বিশেষ করে অন্য সিঙ্গেল মাদারদের সতর্ক করে বলেন যে, বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার আগে তাদের অন্তত দুবার ভাবা উচিত, যেন তাদের আর লাশ হয়ে ফিরতে না হয়।

যেদিনগুলোতে ঘরে খাওয়ার মতো কিছুই থাকে না কিংবা ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা জোটে না, তখন নানা ধরনের অনুভূতির এক ঝড় বয়ে যায় সারাহর মনের ওপর দিয়ে। একদিকে আর্থিক অনটনের তীব্র হতাশা, অন্যদিকে ছেলের প্রতি বুকভরা ভালোবাসা, আর সেই সাথে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলে তার ওপর ঘটে যাওয়া ‘সেইসব অমানুষিক নির্যাতন’।
সারাহ বলেন, “ও যখন ঘুমিয়ে থাকে, আর ওকে খাওয়ানোর মতো কিছুই যখন আমার কাছে থাকে না, ঠিক তখনই পুরোনো সেই দিনগুলোর কথা আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।”
(দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, নিরাপত্তার স্বার্থে তারা এই প্রতিবেদনে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে।)