মার্কিন সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী একাধিক সূত্র বিষয়টি তাদের নিশ্চিত করেছে। ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সঙ্গে ড্রিসকলের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটেই এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। তবে এটি অনেকটাই প্রত্যাশিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এই খবরটি প্রকাশ করে, এরপর সিএনএন নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একটি সূত্র জানিয়েছে, ড্রিসকল তার পদত্যাগপত্রে সেনাবাহিনীর রূপান্তর ও প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এবং তিনি অভিযোগ করেছেন যে, হেগসেথ দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেলদের বরখাস্ত করে এই প্রচেষ্টাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছেন। একজন সেনা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ড্রিসকল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তারপরই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। এই বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েনের একটি চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এটি সামনে এসেছে।
এই ঘটনার তাৎপর্য বোঝার জন্য ড্রিসকলের পরিচয় ও পটভূমি জানা জরুরি। তিনি একজন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধু। ইয়েল ল স্কুলে দুজনে সহপাঠী ছিলেন এবং সেই সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেগসেথ বরাবরই ড্রিসকলের সঙ্গে ভ্যান্সের এই ঘনিষ্ঠতাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন এবং মনে করতেন যে ড্রিসকল তাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন। শুধু ভ্যান্সের সঙ্গেই নয়, ড্রিসকল নিজেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। গত বছর ট্রাম্প তাকে রাশিয়া-ইউক্রেন আলোচনায় ইউক্রেনকে সমঝোতার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে সহায়তার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে তার ব্যাপক কাজের কারণে ট্রাম্প তাকে রসিকতা করে ‘ড্রোন গাই’ নামেও ডাকতেন।
এই পদত্যাগ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইরান যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পার হয়ে গেছে এবং তার কোনো সমাপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক পদে পরিবর্তন আসাটা প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রিসকল ঠিক কবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব ছাড়বেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। রীতি অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর আন্ডার সেক্রেটারি ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব নেন, এবং বর্তমানে সেই পদে আছেন মাইক ওবাদাল, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল।
মার্কিন সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল। ছবি: রয়টার্স
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে ড্রিসকলের কাজের প্রশংসা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সচিব ড্রিসকল সেনাবিভাগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা স্ট্রং এগেইন’ এজেন্ডা এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন, ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানের সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন, প্রস্তুতি ও যুদ্ধক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছেন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন আলোচনায় সহায়তা করেছেন। এই ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রশংসাসূচক বিবৃতি সাধারণত রাজনৈতিক পদত্যাগের ক্ষেত্রে দেওয়া হয়ে থাকে, যা প্রকৃত অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে প্রকাশ্যে না এনে বিষয়টিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপনের একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করা যেতে পারে।
হেগসেথের দায়িত্বকাল শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সিএনএন একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, তিনি শুরু থেকেই তার আশেপাশের বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের কর্মকর্তাদের প্রতি অবিশ্বাসী মনোভাব পোষণ করতেন এবং তাদের আনুগত্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। এই সন্দেহপ্রবণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে একাধিক শীর্ষ জেনারেলকে বরখাস্ত বা পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জ, ভাইস চিফ অব স্টাফ জেনারেল জেমস মিঙ্গাস, আর্মি ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডেভিড হডনে, চ্যাপ্লেইনদের প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়র এবং জয়েন্ট স্টাফের পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাস সিমস। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হলো, ইউরোপ ও আফ্রিকায় মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যন্ত সম্মানিত কমান্ডার জেনারেল ক্রিস্টোফার ডোনাহিউ তার পদ থেকে সরে দাঁড়ান, কারণ হেগসেথ তখনো তাকে নতুন কোনো পদে মনোনীত করেননি। একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, হেগসেথ ও ডোনাহিউর কার্যালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল, যদিও দুই ব্যক্তির মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না তা নিশ্চিত নয়। ডোনাহিউ গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছেন।
জেনারেল জর্জের সঙ্গে ড্রিসকলের ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্ক ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এপ্রিল মাসে কংগ্রেসের সামনে ড্রিসকল জর্জের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন, তার চার দশকের বেশি সময়ের সেবা, পার্পল হার্ট সম্মাননা এবং পরিবারের কথা উল্লেখ করে। তিনি জর্জকে একজন ‘অসাধারণ, রূপান্তরকামী নেতা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কংগ্রেসের সদস্যরাও উভয় দল থেকে হেগসেথকে জর্জের বরখাস্তের বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করেছেন এবং জেনারেলের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। এই প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায়, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে হেগসেথের নেতৃত্বশৈলী নিয়ে শুধু বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেই নয়, আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
প্রতিবেদনটিতে হেগসেথ ও ড্রিসকল-জর্জ জুটির মধ্যে অগ্রাধিকারের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। হেগসেথের দায়িত্বকাল মূলত তথাকথিত সাংস্কৃতিক যুদ্ধ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল বলে বর্ণনা করা হয়েছে, অন্যদিকে ড্রিসকল ও জর্জ প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর শক্তি ও সরঞ্জাম আধুনিকীকরণের ওপর মনোযোগ দিয়েছিলেন।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ঘটনাটি নিছক একজন কর্মকর্তার পদত্যাগের চেয়েও বেশি কিছু বোঝায়। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরে ক্ষমতার বিন্যাস, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের একটি দৃষ্টান্ত। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা একজন কর্মকর্তা কীভাবে নিজের প্রত্যক্ষ ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে যেতে পারেন, এই ঘটনা তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। পাশাপাশি এটি প্রশ্ন তোলে, একজন প্রতিরক্ষা সচিবের অধীনে ধারাবাহিকভাবে একাধিক শীর্ষ জেনারেল ও এখন একজন বেসামরিক সচিব পদত্যাগ বা বরখাস্তের শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও মনোবলের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় এই ধরনের নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারণে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে বলেও ধারণা করা যায়।