রাশিয়া গোপনে ইরানকে উন্নত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরিতে সহায়তা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজের জন্য একটি নতুন হুমকি তৈরি করতে পারে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ফাঁস হওয়া রুশ নথিপত্র, যাতায়াতের রেকর্ড ও সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ‘সি৪৩০এল’ কোডনামের এই গোপন কর্মসূচিটি ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাতের সময়ও অব্যাহত ছিল।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো একটি ‘র্যামজেট’ প্রোপালশন সিস্টেম তৈরি করা, যার সাহায্যে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত গতিতে উড়তে পারবে। এতে করে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত বা ধ্বংস করার সময় অনেকটাই কমে আসবে। সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন এফটিকে জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি ইরানকে এমন এক নতুন কৌশলগত অস্ত্র দেবে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও ইরান ইতিমধ্যেই প্রোপালশন সিস্টেমটি তৈরি ও ফ্লাইট টেস্ট করেছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সামরিক বহরে যুক্ত হয়েছে বলে প্রমাণ মেলেনি।
এফটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘রোসোবোরোনএক্সপোর্ট’ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতকারক ‘এনপিও মাশিনোস্ত্রয়েনিয়া’ যৌথভাবে ইরানের সঙ্গে এই প্রকল্প পরিচালনা করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিকস মন্ত্রণালয়ের সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের আগেই রুশ প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেছিলেন।
২০২৫ সাল নাগাদ রুশ বিশেষজ্ঞরা ইরানের ফ্লাইট টেস্টের ডাটা বিশ্লেষণ করে এবং রামজেটের জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থায়িত্ব, এয়ার ইনটেক ও ইঞ্জিন নজেল নিয়ে পরামর্শ দেন। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিঞ্জ একে কয়েক দশকের কাঙ্ক্ষিত অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তর হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, ক্রেমলিনের শীর্ষ স্তরের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের গোপন প্রকল্প পরিচালনা সম্ভব নয়।
তবে এফটির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ক্রেমলিন, রোসোবোরোনএক্সপোর্ট, এনপিও মাশিনোস্ত্রয়েনিয়া কিংবা ইরান সরকার—কারও কাছ থেকেই এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উচ্চগতির পাশাপাশি অত্যন্ত কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যেতে পারে, যা পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন ও তাদের মিত্রদের অত্যাধুনিক স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি সরাসরি না দিয়ে প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ইরানিদের কারিগরি সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাটাই এই সহযোগিতার সবচেয়ে মূল্যবান দিক।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও এই কার্যক্রম অব্যাহত ছিল এবং উভয় পক্ষ পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করছে। ফ্যাবিয়ান হিঞ্জ ও জিম ল্যামসন উভয়েই উল্লেখ করেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে যে মাত্রা যোগ হয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে রাশিয়ার এই কারিগরি সহায়তা মস্কো ও তেহরানের সামরিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও প্রভাববিস্তারী করে তুলবে।