একটা সময় ছিল যখন বৈশ্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানিতে একক দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিলে জানা যায়, ২০২৫ সালে সেই অবস্থান হারিয়েছি আমরা। বাংলাদেশের স্থান দখল করেছে ভিয়েতনাম।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, গত তিন বছরে দেশে চার শ’র বেশি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে বিজিএমইএর ২৮২টি এবং বিকেএমইএর ১২৩টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যা চার শতাধিক। কারখানা বন্ধের পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণের কথা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরানের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মন্দা পরিস্থিতি।
সমস্যাটা কোথায়?
এ সকল কারখানা বন্ধের কারণে কর্মসংস্থান হারিয়েছে কয়েক লাখ পোশাক শ্রমিক। চলতি বছরের জুনে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান দুরাবস্থার কথা উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ আপাতত বন্ধ হলেও বাংলাদেশে এখনো এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে তৈরি পোশাক খাত।
তবে এর আগে থেকে পোশাক শিল্পের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণটি হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ২০২৪ সাল থেকে দেশে তিনবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব দ্য ইকোনমিস্টকে জানান, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে পোশাক শিল্পে বিনিয়োগও কমে আসে।
ওই সময় দেশজুড়ে আন্দোলনের কারণে অনেক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, পাঁচটি কারখানায় আগুনও দেওয়া হয়। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও পোশাক কারখানার মালিক ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ‘অনিশ্চিত’ অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এরপর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু তখন নতুন করে উদয় হয় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করার ফলে বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালি। বন্ধ হয় জ্বালানি তেল আমদানি। দেশে শুরু হয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মে মাসে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে রাখতে অনেক পোশাক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। কিন্তু জেনারেটর চালু করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান চরচা’কে বলেন, “যেকোনো শিল্পের জন্য জ্বালানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিনিয়ত সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, খুব দ্রুত এর সমাধান হবে।”
পোশাক শিল্পে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য দেরি হলে বিরাট ক্ষতি হতে পারে। ফলে ফ্রেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোও আগের তুলনায় বাংলাদেশে কম অর্ডার দিচ্ছে। কারণ উৎপাদনে দেরি হচ্ছে, পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারাও আগের মতো পোশাক কিনছেন না।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে ‘খামখেয়ালিপনা’ থেকে এর সূত্রপাত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কমেছে চীনের পোশাকের রপ্তানি। এখানে বাংলাদেশের একটা বিরাট সুযোগ তৈরি হতে পারতো। কিন্তু চীনের ছুটে যাওয়া ক্রয়াদেশ চলে গেছে সব ভিয়েতনামের কাছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকট এর জন্য দায়ী।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘ লিড টাইম। ফাস্ট ফ্যাশন নিয়ে মানুষের মনে বৈরিতা তৈরি হলেও এটি এখনো দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তাই তো এখনো বৈশ্বিক ক্রেতারা খুব দ্রুত পণ্য চান। কিন্তু কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন এবং রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বাংলাদেশের যে সময় লাগে, তা এখনো রপ্তানি খাতে প্রতিযোগী অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যজট, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত নানা জটিলতাও সময়মতো পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা এবং ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা।
এখানেই শেষ নয়। পোশাক শিল্পে আরও সংকট আছে। দেশে বেশ ভালো মানের পোশাক তৈরি হয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাইরের ক্রেতারা তা ভালো করেই জানেন। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে পিছিয়ে আছে। ইইউ-এর বাজারের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। এমনকি ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যবধানটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। বিপুল পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করলেও সেই অনুপাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো অনেকাংশে পরিমাণনির্ভর হয়ে আছে। মূল্যনির্ভর নয়।
বিশ্ব পোশাক বাজারে এখন দ্রুত বাড়ছে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক, স্পোর্টসওয়্যার ও ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ কারখানা এখনো কটননির্ভর বেসিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। তাই উচ্চমূল্যের অনেক ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, চীন কিংবা অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে।
এত প্রতিবন্ধকতার পরও কিছুটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের উত্থান হয়েছে। এ মাসে নিট ও ওভেন মিলিয়ে মোট ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এই রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। আর অর্থবছরের প্রথম দুই মাস মিলিয়ে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এক মাসেই পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ডলার। এভাবে রপ্তানির হার বাড়তে থাকলে পোশাক শিল্পের সংকট কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যাবে।
সরকার কী করবে ও করতে পারে
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের একই অধিবেশনে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র খাতে শুদ্ধ বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তা ১ দশমিক ৫০ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে।
ইউরো অঞ্চলে বস্ত্র খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য বিদ্যমান ১ দশমিক ৫০ শতাংশের পাশাপাশি বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে আরও ০ দশমিক ৫০ শতাংশ।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের নিট, ওভেন ও সোয়েটারসহ সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অতিরিক্ত ৩ শতাংশ সুবিধা এবং তৈরি পোশাক খাতে বিশেষ নগদ সহায়তা ০ দশমিক ৩০ শতাংশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে এর পাশাপাশি সরকারের আরও কিছু বিষয়ের গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে। টেকসই অর্থনীতি ও তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে চাইলে কী কী করতে হবে, এ ব্যাপারে আইএমএফ-এর গবেষণাপত্রে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, কাস্টমস প্রক্রিয়ার শতভাগ অটোমেশন ও পেপারলেস ক্লিয়ারেন্স চালু করা, যাতে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের সময়সীমা অর্ধেকে নেমে আসে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর ও রেলভিত্তিক কন্টেইনার পরিবহন বৃদ্ধি করা, যাতে সড়কের ওপর নির্ভরতা ও যানজট কমানো যায়।
তৃতীয়ত, গভীর সমুদ্রবন্দর (যেমন: মাতারবাড়ি বন্দর) ও পোর্টস লজিস্টিকসে বেসরকারি খাত এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) সহজ করতে হবে। চতুর্থত, বাণিজ্য শুল্ক কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং রপ্তানি সম্পর্কিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে।
আইএমএফ মনে করে, এসব নীতিগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে লজিস্টিকস ব্যয় কমবে এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারবে।
কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি পণ্যবৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ও জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো হলো চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এসব। এরা আমাদের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় পোশাক রপ্তানি করে। এই জায়গায় আমরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
তৈরি পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান তীব্র প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে টিকতে হলে শুধু সস্তা পোশাকের বাজারের দিকে তাকালে চলবে না। উচ্চমানের ও বৈচিত্যপূর্ণ পণ্যসম্ভার নিয়ে হাজির হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস-এর প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন রুবেল। চরচাকে তিনি বলেন, “প্রতিযোগী দেশ অর্থাৎ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া নিজেদের নন-কটন হিস্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়াচ্ছে। চীন নিজের কটন সুতা-কাপড় উৎপাদনের বড় অংশ সরিয়ে নিয়েছে ভিয়েতনামে, আর নিজে বিনিয়োগ করছে নন-কটন ও উঁচু প্রযুক্তির ফাইবারে। অর্থাৎ বিশ্বের বড় উৎপাদক-বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই বাজি ধরছেন নন-কটনের ওপর। বাংলাদেশ এখনই এগিয়ে না এলে এ ব্যবধান আরও বাড়বে।”