বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। দেশের কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ডের পোশাক। রপ্তানি শতাধিক দেশে। কিন্তু সেই পোশাকের ট্যাগে বাংলাদেশের কোনো ব্র্যান্ডের নাম থাকে না। এই খাতের রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন বা চার হাজার কোটি ডলার আয় হয়। এখন প্রশ্ন উঠছে, তারপরও বাংলাদেশ কেন বিশ্ববাজারে নিজের একটি শক্তিশালী পোশাক ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে পারল না?
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সংগঠনের (বিজিএমইএ) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার। একই অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই বিপুল রপ্তানি মূলত উৎপাদনভিত্তিক। পোশাকের নকশা, ব্র্যান্ডিং, বিপণন, বিশ্ব বাজারে খুচরা বিক্রি এবং ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরির মতো বেশি মূল্য সংযোজনের কাজগুলোর বড় অংশ হচ্ছে বাংলাদেশের বাইরে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত বেশি তৈরি পোশাক উৎপাদন করে কেন ব্র্যান্ড তৈরির দিকে যাচ্ছেন না বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা?
বিজিএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী চরচাকে বলেন, “বৈশ্বিক ব্র্যান্ড দাঁড় করানো সহজ নয়। বিশেষ করে বাইরেই মার্কেটের জন্য একটা ব্র্যান্ডের লাইসেন্স পাওয়া কঠিন। শক্ত লবিং করেও অনেক সময় সেটা পাওয়া যায় না।”
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিস এক্সপার্টের এএমডি মহিউদ্দিন রুবেল চরচাকে বলেন, “সমস্যাটি সক্ষমতার নয়, বরং মানসিকতা ও কৌশলের। বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করেছে, কিন্তু ব্র্যান্ড গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে। শুধু বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে মূল্য সংযোজনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু কম খরচে পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র ফ্যাশন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও বিশ্বে পরিচিত হতে পারে।”
বাংলাদেশ পায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন সেন্টার ফর বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৫ ডলার মূল্যে তৈরি একটি শার্ট ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বাজারে ২৮ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। পরিবহন, শুল্ক, গুদাম ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও অনেক বেশি টাকা লাভ করতে পারে বিক্রেতারা। অন্যদিকে, পোশাকটি উৎপাদনকারী বাংলাদেশের ভাগে পড়ে এক-পঞ্চমাংশেরও কম!
অবশ্য খুচরা মূল্য আর কারখানার দামের পার্থক্য দিয়েই বিষয়টি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ, একজন খুচরা বিক্রেতাকে পণ্যটি কেনার পর বিক্রির আগ পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ পার করতে হয়। এর মধ্যে পণ্যটি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এর দায়ভার বিক্রেতাকেই নিতে হয়।
পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা। ছবি: চরচা
বাংলাদেশ নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করছে না কেন?
এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীক মডেলই মূলত বিদেশি ক্রেতার চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এখানে একজন কারখানা মালিকের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে দাঁড়ায় বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে বড় অর্ডার পাওয়া, সময়মতো পণ্য তৈরি করা এবং উৎপাদন খরচ কম রেখে লাভ করা।
অন্যদিকে, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করতে গেলে প্রথমে বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়। বাজার গবেষণা করতে হয়, নকশাবিদ নিয়োগ করতে হয়, বিপণন করতে হয়, দোকান বা অনলাইন বিক্রয় নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- দীর্ঘ সময় ধরে ব্র্যান্ডের পরিচিতি তৈরি করতে হয়।
এছাড়া, একটি কারখানা আজ ১০ লাখ পোশাকের অর্ডার নিয়ে উৎপাদন শুরু করলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি আয় করা শুরু করতে পারে। কিন্তু একটি নতুন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বিপণন ও খুচরা বিক্রিতে বিনিয়োগ করার পরও লাভ নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ, উৎপাদন ব্যবসা থেকে আয় তুলনামূলকভাবে দ্রুত হয় এবং বুঝতে পারা যায় যে, তার লাভ কতটা হবে। ব্র্যান্ড ব্যবসার আয় ধীর, অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষ যেখানে মূলত ‘নগদ নারায়ণে’ বিশ্বাসী- সেটা স্বেচ্ছায়ই হোক বা পরিস্থিতির দাবি মেটাতে, সেখানে ব্র্যান্ড তৈরি করতে যাওয়ার মতো অনিশ্চিত এবং সময় ও অর্থের বিনিয়োগনির্ভর পথে যাওয়ার আগ্রহ এখানে খুব বেশি থাকার কথা নয়।
এছাড়া, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বায়ারদের কাছে পোশাক বিক্রি করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে জানিয়ে রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘদিন একটা কাজ করতে করতে আমরা অনেক সময় অভ্যস্ত হয়ে যাই। সেটাকেই সহজ মনে হয়। তখন আর কষ্ট করে নতুন কোনো কাজ করতে চাই না।”
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশ পরিচিতি অর্জন করেছে। এখন পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত উৎপাদন কেন্দ্র থেকে একটি ফ্যাশন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের পরিচিতি তৈরি, মৌলিক নকশায় বিনিয়োগ এবং দেশের পাশাপাশি বিদেশের সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থাৎ, বিশ্ব যেন বাংলাদেশকে শুধু কত বেশি পোশাক উৎপাদন করে সেই হিসাবেই না চেনে, বরং বাংলাদেশ কী ধরনের ফ্যাশন তৈরি করে সেটিও যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।”
কারখানার মালিক আর ব্র্যান্ড মালিকের ব্যবসা এক নয়
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতে আরেকটি মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। কারখানা পরিচালনা এবং ব্র্যান্ড পরিচালনা একই ধরনের দক্ষতা নয়। কারখানা চালাতে দরকার উৎপাদন পরিকল্পনা, যন্ত্রপাতি, শ্রম ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কারখানার নিয়মনীতি মেনে চলা। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড চালাতে দরকার ভোক্তার মনস্তত্ত্ব বোঝা, ফ্যাশনের ট্রেন্ড বিশ্লেষণ, নকশা, বিপণন, খুচরা ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ, মেধাস্বত্ব এবং ক্রেতার অভিজ্ঞতা তৈরির দক্ষতা।
তবে এই খাতে বাধাও কম নয়। বাংলাদেশের শিল্পের বড় বাধাগুলোর একটি হলো- উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও ব্র্যান্ড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভোক্তা-তথ্য, বাজার গবেষণা, সৃজনশীল নকশা ও ডিজিটাল বিপণন এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো মেশিনারি পণ্যের মতো দৃশ্যমান সম্পদের ক্ষেত্রে অর্থায়নে বেশি আগ্রহী হলেও ব্র্যান্ড উন্নয়নের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত আয়ের জন্য অর্থায়নে আগ্রহী নয়।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পথে বাধাও কম নয়। ব্র্যান্ড তৈরির জন্য শুধু পোশাক উৎপাদনের দক্ষতা যথেষ্ট নয়। ভোক্তার চাহিদা বোঝা, বাজার গবেষণা, সৃজনশীল নকশা, ডিজিটাল বিপণন এবং খুচরা ব্যবসা পরিচালনার মতো দক্ষতাও প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, “অর্থায়নও বড় একটি সমস্যা। ব্যাংকগুলো সাধারণত যন্ত্রপাতি, জমি বা ভবনের মতো দৃশ্যমান সম্পদের বিপরীতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু একটি ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার সুফল পেতে সময় লাগে। এর ফলাফলও তুলনামূলকভাবে অনিশ্চিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোশাকশিল্পের দীর্ঘদিনের বিপুল উৎপাদননির্ভর সংস্কৃতি- ছোট পরিসরে শুরু করে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে একটি ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসিকতা এখনো গড়ে ওঠেনি।”
বাংলাদেশের কি কোনো নিজস্ব ব্র্যান্ড নেই?
বাংলাদেশেরও নিজস্ব ব্র্যান্ড আছে জানিয়ে রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে কিছু দেশীয় ব্র্যান্ড তো আছে। তারা দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তখন বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে।”
বাংলাদেশে আড়ং, ইয়োলো, ক্যাটস আই, এক্সট্যাসি, সেইলরসহ বেশ কিছু পরিচিত ফ্যাশন ব্র্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এর মধ্যে আড়ং আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য বিক্রি করছে।
আড়ংয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৮ সাল থেকে ১৫টির বেশি দেশে বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করছে। তাদের পণ্যের মধ্যে নিটওয়্যার, উভেন পোশাক, ফ্যাশন সামগ্রী, পাট, চামড়া এবং ঘর সাজানোর পণ্য রয়েছে। তাদের রয়েছে ১৫টি বিক্রয় কেন্দ্র এবং ৬৫ হাজারের বেশি কারুশিল্পীর একটি নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পক্ষে নিজস্ব ফ্যাশন পরিচয় তৈরি করা অসম্ভব নয়। বরং কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তার উদাহরণ তৈরি করেছে।
তবে সমস্যা হলো, এগুলোর কোনোটিই এখনো জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ইউনিক্লো, নাইকি বা অন্যান্য বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মতো বড় আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেনি।
‘সস্তার কারখানা’-ই থাকবে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, বছরভিত্তিক প্রায় ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে একটা বিষয় স্পষ্ট, বড় শিল্প হওয়াই যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক চাহিদা, শুল্ক, বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সংগ্রহের কৌশল এবং পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে বড় রপ্তানিকারক দেশও চাপের মুখে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরে পোশাক পণ্যবাহী চালান আটকে যায়। তখন বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য উৎপাদনকারী কিছু বাংলাদেশি কারখানাও এই সাপ্লাই চেইন সংকটে পড়ে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের কারখানা যদি কেবল বিদেশি ক্রেতার ক্রয়াদেশের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ক্রেতার বাজার, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থায় ধাক্কা এলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের কারখানায় এসে পড়ে। নিজস্ব ব্র্যান্ড থাকলে সেই ঝুঁকির একটি অংশ কমানো সম্ভব। কারণ তখন উৎপাদক শুধু অন্যের ক্রেতার ওপর নির্ভর করবে না, নিজের ভোক্তা গোষ্ঠীও তৈরি করতে পারবে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের গল্প মূলত টিকে থাকা, সক্ষমতা অর্জন এবং বিপুল উৎপাদনের গল্প। কিন্তু এই শিল্পের পরবর্তী অধ্যায় হওয়া উচিত নিজস্ব পরিচয় ও মালিকানা প্রতিষ্ঠার গল্প।”