পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গভীর ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এতে তার ক্ষমতায় থাকার নিয়ন্ত্রণকে শিথিল হচ্ছে। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের কার্যালয়কে ঘিরে নতুন এক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং তারই প্রশাসনের এক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার প্রকাশ্যে নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া এই সংকটকে চরম মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
ইউক্রেনের পশ্চিমা-সমর্থিত দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো যখন প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জড়িত একটি ৩.৪ মিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচারের ঘটনার তদন্ত শুরু করে, তখন জেলেনস্কি তার কার্যালয়ের উপ-প্রধান ইরিনা মুদ্রায়াকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন। মুদ্রায়া অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে এটি জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে একের পর এক দুর্নীতি কেলেঙ্কারির সর্বশেষ সংযোজন মাত্র।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইল ফেদোরোভ। ছবি: সংগৃহীত
ঠিক এর আগের দিনই, হুট করে বরখাস্ত করা ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইল ফেদোরোভ একটি ভিডিও প্রকাশ করে সরকারের দুর্নীতির চরম সমালোচনা করেন। সেখানে তিনি দেশের ‘শাসন ব্যবস্থার পদ্ধতিগত সংকট’ উল্লেখ করে নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানান। অথচ ২০২৪ সালের মে মাসে জেলেনস্কির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলেও ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সাথে সংঘাত শুরুর পর জারি করা সামরিক আইনের অজুহাতে তিনি নতুন নির্বাচন স্থগিত রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন খ্যাতনামা গণমাধ্যম এই চলমান ঘটনাপ্রবাহকে জেলেনস্কির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই পরিস্থিতিকে ২০২২ সালের পর জেলেনস্কির ক্ষমতার ওপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করে উল্লেখ করেছে যে, ধারাবাহিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারির কারণে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফেদোরোভ নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
অন্যদিকে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস সতর্ক করেছে যে, জেলেনস্কির মিত্রদের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ তার জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে এবং কিয়েভের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করছে। পত্রিকাটি একজন বিশেষজ্ঞের মতামত তুলে ধরে ইউক্রেনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট সাবেক মন্ত্রী ফেদোরোভের এই রাজনৈতিক পদক্ষেপকে জেলেনস্কির ক্ষমতার সরাসরি ও অভূতপূর্ব এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। ইউকে-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে, একের পর এক দুর্নীতির তদন্ত ও কেলেঙ্কারির ফলে জেলেনস্কি রাজনৈতিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এটি এখন ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে যে শান্তি ফেরানোর প্রক্রিয়ায় হয়তো তিনি আর ইউক্রেনের নেতৃত্বে থাকবেন না।
অন্যান্য প্রধান পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোও ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সংকটকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। দ্য গার্ডিয়ান সাবেক মন্ত্রী ফেদোরোভকে জেলেনস্কির জন্য এক বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলে উল্লেখ করেছে এবং তাদের বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা ইউক্রেনের দুর্নীতিকে ‘খারাপ শাসন ব্যবস্থার উপসর্গ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সিদ্ধান্তহীনতা এবং জনগণের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি এক ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।