যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি অনেক বেশি জনপ্রিয় ও কম বিতর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে এআই এবং ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে, সেখানে চীনের সাধারণ জনগণ এবং সরকার উভয়ই এই প্রযুক্তিকে অত্যন্ত কৌতূহল ও স্বাভাবিকতার সাথে গ্রহণ করেছে।
গত নভেম্বরে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপের তথ্য বলছে, চীনের ৮৭ শতাংশ মানুষ এআইয়ের প্রতি আস্থা রাখছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা মাত্র ৩২। চীনের এই অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি পরিচালনা সম্পর্কিত তাদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি, সরকারের সুনিয়ন্ত্রিত কৌশল এবং দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল ব্যবস্থার সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয়।
এসব বিষয়ের উল্লেখ করে ফরেন পলিসিতে পত্রিকাটির উপ-সম্পাদক জেমি পালমার লিখেছেন, চীনে এআইয়ের এই ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা হঠাৎ করে হয়নি। এটি তাদের সাইবারনেটিক্স বা সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ঐতিহ্যগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের পর থেকে যখন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, তখন চীন সরকার এই প্রযুক্তিকে একটি ভবিষ্যতমুখী ‘প্রয়োজনীয়’ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে। মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে এআইকে মানবসভ্যতার বিকল্প বা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করে এক ধরনের রহস্যময় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে, সেখানে চীন একে একটি প্রশাসনিক ও ব্যবহারিক প্রযুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এআই নিয়ে ঝুঁকি যখন বাড়ছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব সেখানে আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের জনগণকে শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এই প্রযুক্তিকে সমাজ ও বিভিন্ন ব্যবস্থা পরিচালনার মাধ্যম হিসেবে সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদিও এই ব্যবস্থার পেছনে নজরদারি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মতো নেতিবাচক দিক রয়েছে। তবুও এআই ব্যবহারে চীনের সার্বিক অবস্থান বেশ বাস্তবমুখী ও শান্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের মূল পার্থক্যটি ফুটে ওঠে দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সাংস্কৃতিক পার্থক্যের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি চলে বিলিয়নেয়ারদের হাতে। এরা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরি করা এবং বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের নীতিতে বিশ্বাসী। ফলে সেখানে বিষয়টিকে একটি ‘যেকোনো মূল্যে জেতার প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা হয়।
এর বিপরীতে আছে চীন। দেশটির বিজ্ঞান সাহিত্য এবং গণমাধ্যমের কল্পকাহিনীগুলোতে মানুষ এবং রোবটের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ এবং নৈতিক প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। চীনে এআই প্রযুক্তির মুখ হিসেবে কাই-ফু লির মতো টেকনোক্র্যাটদের দেখা যায়, যারা পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি বজায় রেখে কাজ করেন। তাছাড়া, ২০২০-২১ সালে চীন সরকার নিজ দেশের প্রযুক্তি খাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পর থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অতিরঞ্জিত প্রচার অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারের দিক থেকেও চীনে এআই একটি অতি স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের আমলে দেশটির ইন্টারনেট ব্যবস্থা আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আসলেও ডিজিটাল অর্থপ্রদান, বিভিন্ন অ্যাপ এবং এআইভিত্তিক সেবাসমূহ অত্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে নাগরিকদের জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
মার্কিন ব্যবহারকারীরা যেখানে সার্চ ইঞ্জিন বা অন্যান্য অনলাইন সেবার মান দিনে দিনে খারাপ হতে দেখছে, সেখানে চীন তাদের ডিজিটাল অবকাঠামোর ত্রুটিসমূহ দ্রুত সংস্কার করে নাগরিকদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। ফলে, আমেরিকানরা যখন এআইকে তাদের কাজের জায়গা বা মৌলিক জীবনের জন্য ঝুঁকি মনে করছে, তখন চীনা জনগণ একে তাদের ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা আধুনিক ডিজিটাল জীবনের একটি সহজ ও প্রয়োজনীয় সংযোজন হিসেবেই গ্রহণ করেছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনা নেতৃত্বের বৈঠকের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে এই দুটি বিপরীতমুখী চিন্তা স্পষ্ট বোঝা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে আলোচনাকে এআইয়ের আধিপত্য ধরে রাখা এবং সুপারইন্টেলিজেন্ট কম্পিউটারের সম্ভাব্য অস্তিত্বের হুমকি সম্পর্কিত কাল্পনিক বা ভৌগোলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। অন্যদিকে, চীনা প্রতিনিধিদলটি গুরুত্ব দেবে এআই প্রযুক্তির বাস্তব ফলাফলের ওপর। তারা এআইয়ের ফলে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, সামরিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাগুলোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মতো বাস্তবভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এআই প্রযুক্তিকে একটি সভ্যতা-পরিবর্তনকারী জুয়া হিসেবে বিবেচনা করছে, সেখানে চীন বিষয়টিকে অত্যন্ত ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করছে বলেই দেশটির সাধারণ মানুষ এই নতুন প্রযুক্তির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।