বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না এভারগ্রান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে চীনের একটি আদালত আজ বৃহস্পতিবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। পাঁচ বছর আগে এভারগ্রান্ডের পতন দেশটির অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এশিয়ার একসময়ের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হুই কা ইয়ান গত এপ্রিলে অর্থের অপব্যবহার, তহবিল সংগ্রহে প্রতারণা, অবৈধভাবে জনসাধারণের আমানত গ্রহণ, বেআইনিভাবে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা, প্রতারণার মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ইস্যু এবং ঘুষসহ আটটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
চীনের শীর্ষস্থানীয় আবাসন নির্মাতা এভারগ্রান্ড তার প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার দায়ের বেশির ভাগই পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সংকট আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী এমন এক সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে টেনে ধরেছে।
‘আমাদের টাকা কোথায়?’
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনে দেওয়া এই রায়ে হুইয়ের ব্যক্তিগত সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তার সাধারণ অবস্থা থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার কাহিনির অবসান ঘটল। তবে এ রায় এভারগ্রান্ডের দেশি-বিদেশি পাওনাদারদের খুব একটা স্বস্তি দেবে বলে মনে করা হচ্ছে না।
এভারগ্রান্ডের অবসায়কেরা রায় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। হুইয়ের আইনজীবীদের সঙ্গেও রয়টার্স যোগাযোগ করতে পারেনি। এভারগ্রান্ড ঋণখেলাপি হওয়ার পর ২০২৩ সালে চীনা কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করার পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
আদালত প্রকাশিত ছবিতে ৬৭ বছর বয়সী ধূসর চুলের হুইকে দুই কর্মকর্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার পরনে ছিল দীর্ঘ হাতার গাঢ় নীল কলারযুক্ত শার্ট। আদালত তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা পড়ে শোনায়।
আদালত এক বিবৃতিতে বলেছে, “এভারগ্রান্ড গ্রুপ, হেংদা রিয়েল এস্টেট এবং হুই কা ইয়ানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ জড়িত ছিল এবং পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। এসব কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং গুরুতর সামাজিক ক্ষতি হয়েছে। তাই আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত।”
এভারগ্রান্ডের বাড়ির মালিকদের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপে দেওয়া মন্তব্যগুলোর মধ্যে ছিল—“সব সাধারণ নাগরিককেই এর মূল্য দিতে হয়েছে,” “কারাদণ্ড আসলে তাকে রক্ষা করারই একটি উপায়। সে বাইরে এলে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে” এবং “আমাদের টাকা কোথায়?”
হুইয়ের সাজা ছাড়াও আদালত এভারগ্রান্ডকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান (১৩১ কোটি ডলার) এবং এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংদাকে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করেছে। এ ছাড়া আরও পাঁচজন শীর্ষ নির্বাহীকে ছয় থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার হুই ছাড়া এভারগ্রান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানিটি কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা পণ্য বা ওয়েলথ-ম্যানেজমেন্ট পণ্যের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে। অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী, যাদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের বিনিয়োগ হারিয়ে ফেলেন।
বছরের পর বছর ধরে চলছে এভারগ্রান্ডের অবসায়ন প্রক্রিয়া
মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের একটি গ্রামে দাদির কাছে বেড়ে ওঠা সাবেক ইস্পাত কারিগরি কর্মী হুই ১৯৯৬ সালে এভারগ্রান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। আগ্রাসীভাবে ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে চুক্তিবদ্ধ বিক্রয়ের হিসাবে চীনের সবচেয়ে বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে হুইয়ের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪৫৩ কোটি ডলার, যা তাকে সে সময় এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি করে তুলেছিল।
২০২৪ সালে হংকংয়ের একটি আদালত এভারগ্রান্ডকে অবসায়নের নির্দেশ দেয়। পরের বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার তালিকাচ্যুত করে। এর মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির উত্থান থেকে পতনের অস্থির অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
তবে অবসায়কেরা জানিয়েছেন, অবসায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল। বিপরীতে পাওনাদারদের দাবি ছিল মোট ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে হুই এবং তার সাবেক স্ত্রীর বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করার জন্য অবসায়কেরা আদালতে লড়াই করছেন। প্রতিষ্ঠাতা ও অন্য সাবেক নির্বাহীদের দেওয়া প্রায় ৬০০ কোটি ডলার লভ্যাংশ ও পারিশ্রমিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন তারা।
২০২৪ সালে চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হুইকে ৬৬ লাখ ডলার জরিমানা করে এবং তাকে আজীবনের জন্য সিকিউরিটিজ বাজারে নিষিদ্ধ করে। সংস্থাটি তখন জানিয়েছিল, এভারগ্রান্ডের প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি আয় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো এবং সিকিউরিটিজ জালিয়াতি করেছিল।