সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বা ‘ওভারক্যাপাসিটি’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়লেও, চীনের নিজস্ব নীতিমালায় এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। বরং এ সমস্যাটি এখন এক গুণগত ও বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন চীনের এই অতিরিক্ত উৎপাদন চেপে রাখার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। এই সীমা অতিক্রান্ত হলে এমন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে, যা মোকাবেলা করার মতো প্রস্তুত অবস্থায় বর্তমানে বিশ্বের সরকারগুলো নেই। বিগত দুই দশকে চীন রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে, যা ২০২৫ সালে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং এটি বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের চেয়ে তিনগুণ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। সূচনাপর্বে এটি চীনের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সাময়িক মূল্যস্ফীতি-বিরোধী ভূমিকা রাখলেও, রাজনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে এটি একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
গত ১৩ আগস্ট ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে চীনের শিল্প নীতির এই নেতিবাচক প্রভাব এবং এর ফলে উদ্ভূত সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে একটি গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল একটি অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশ, যেখানে অন্যান্য দেশগুলো সস্তা পণ্যের বিনিময়ে নিজেদের সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখতে সম্মত ছিল। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি চীনের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। চীনের সস্তা আমদানির ফলে নিজেদের দেশে শিল্পহীনতা বা ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ ঘটা এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। ফলে বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণবাদ বা প্রোটেকশনিজম বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা চীনের আন্তর্জাতিক বাজার প্রবেশাধিকারকে সংকুচিত করছে।
এর মাধ্যমে চীনের ২০২০ সালে ঘোষিত ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ নীতি অর্থাৎ ঘরোয়া স্বনির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সমন্বয়ের যে মূল কৌশল, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া চীনের এই কৌশলটি গাণিতিক হিসাবের দিক থেকেও মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। চীন যখন ছোট অর্থনীতি ছিল, তখন বৈশ্বিক চাহিদার ভিত্তিতে এর রপ্তানি নির্ভর প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশাল আকারের চীনা অর্থনীতির পক্ষে বৈশ্বিক চাহিদার সীমা অতিক্রম করে পণ্য রপ্তানি অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। সহজ ভাষায়, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা মডেলটি নিজেই তার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে চীনা রফতানি ব্যবস্থা যখন থমকে দাঁড়াবে, তখন চীন নিজে যেমন চরম ক্ষতির শিকার হবে, তেমনি এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলসহ যেসব দেশ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে গভীরভাবে যুক্ত, তারাও তীব্র অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়বে।
জাতিসংঘের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট শিল্প উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ বর্তমানে চীনের দখলে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪৫ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সক্ষমতা বাদ দিলে বিশ্ব ইতিহাসে একক কোনো দেশের এমন আধিপত্যের উদাহরণ নেই। এই বিশাল রপ্তানি উদ্বৃত্ত প্রকৃতপক্ষে বেইজিংয়ের সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতি ও ভর্তুকির সরাসরি ফলাফল।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) হিসাবমতে, বিশ্ব শিল্প বাজারে চীনের প্রবৃদ্ধির ৬০ শতাংশই এসেছে সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে। তবে বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় ভর্তুকি হলো তাদের রাষ্ট্রীয় নির্দেশিত ব্যাংক ব্যবস্থা, যা নির্ধারিত শিল্প খাতে প্রচুর পরিমাণে সহজ ঋণ দেয়। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের মতো লাভ-ক্ষতির কথা চিন্তা করতে হয় না। এর ফলে একটি দেউলিয়া প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে চীনা কোম্পানিগুলো উৎপাদনের খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করছে এবং শেয়ার বাড়ানোর জন্য লোকসান মেনে নিচ্ছে।
বর্তমানে চীনের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশ লোকসানে চালিত হচ্ছে, যা মহামারী পূর্ববর্তী সময়ে ছিল ২০ শতাংশ। বেইজিংয়ের ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত উচ্চ প্রযুক্তির খাতগুলোতে এই লোকসানের হার ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ হতে না দিয়ে স্থানীয় সরকার তাদের কর্মসংস্থান ও কর রাজস্ব বজায় রাখার জন্য টিকিয়ে রাখছে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ নবায়ন করে দিচ্ছে। সাথে রেনমিনবির কৃত্রিম অবমূল্যায়ন যুক্ত হয়ে চীনা পণ্যকে বিশ্ববাজারে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সস্তা করে তুলছে।
চীনের স্থানীয় ভাষায় এই অতি-প্রতিযোগিতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘নেইজুয়ান’ বা ‘ইনভোলিউশন’। এর অর্থ হলো এমন এক প্রতিযোগিতা যা ক্রমাগত কমতে থাকা মুনাফার জন্য কোম্পানিগুলোকে ধ্বংসের প্রান্তে ঠেলে দেয়। স্থানীয় সরকারের সহায়তায় কারখানাগুলো সচল রাখতে গিয়ে বেইজিং এমন এক শিল্প দানব তৈরি করেছে, যা থামানোও অসম্ভব। আবার বৈশ্বিক চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে চিরকাল চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব না। এর ফলে চীনা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিজেই নিজের চাপে ধসে পড়তে পারে।
বেইজিং সমস্যাটি কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পেরেছে; তারা ২০২৫ সালে একটি 'প্রতি-ইনভোলিউশন' প্রচার শুরু করে এবং ২০২৬-৩০ সালের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় গ্রামীণ এলাকায় ভোগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়। তবে বেইজিং মূল সমস্যার সমাধান করতে নারাজ, যা হলো অর্থনীতিকে উৎপাদন-কেন্দ্রিকতা থেকে ভোগ-কেন্দ্রিকতায় রূপান্তরিত করা।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ইয়াশেং হুয়াংয়ের মতে, চীন এখন একটি ‘অ্যাবসোলুট অ্যাডভান্টেজ’ বা পরম সুবিধার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এটি একদিকে যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্সে আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতা করছে, অন্যদিকে বস্ত্র ও পোশাকের মতো কম দামি পণ্যে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করছে—যা তুলনামূলক সুবিধার অর্থনৈতিক নীতিকে অস্বীকার করে।
বেইজিংয়ের নেতারা সংস্কারের পথে হাঁটতে চান না। কারণ রপ্তানিনির্ভর মডেলটি একই সাথে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশল। চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং স্পষ্ট বিশ্বাস করেন যে উৎপাদন খাতই অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তবে রপ্তানি ছেড়ে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়াতে গেলে চীনের প্রতিটি প্রদেশ ও পৌরসভার রাজস্ব মডেলে পরিবর্তন আনতে হবে। স্থানীয় সরকারের আয়ের ধস মেনে নিতে হবে এবং ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি নিতে হবে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নির্ভর করে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর। তাই তারা জমি বিক্রি করে, স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভর্তুকি দিয়ে কারখানা তৈরি করেই চলে।
কিন্তু পশ্চিমা ও প্রতিবেশী দেশগুলো এখন চীনা আমদানির জোয়ার বন্ধ করতে শক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে জার্মানিতে চীনের গাড়ি রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী অটোমোবাইল শিল্প চরম সংকটে পড়েছে। সেখানে ফোক্সওয়াগেন প্রায় ১ লাখ কর্মী ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের চিন্তা করছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন তাদের নীতি পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের কথা ভাবছে। এছাড়া চীন যখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের ওপর তাদের আধিপত্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা ‘চীন-মুক্ত’ সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরির উদ্যোগ নেয়।
পণ্য খাতের বৈশ্বিক বৈষম্য এখন চরম আকার ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে মাত্র ৩.১ শতাংশ।
সৌর প্যানেল খাতে চীন একা বছরে ১২০০ গিগাওয়াট সৌর সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা গত বছর পুরো বিশ্বে স্থাপিত মোট সরঞ্জামের দ্বিগুণ। একই অবস্থা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ক্ষেত্রেও। চীন বছরে আড়াই কোটি ইভি এবং সব মিলিয়ে ৫.৫ কোটি গাড়ি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে মোট চাহিদাই ৯ কোটি গাড়ির। এই অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বৈশ্বিক বাজার শেষ পর্যন্ত চীনা পণ্য গ্রহণে অসমর্থ হয়ে পড়বে। যদি এই রপ্তানি মডেল ধসে পড়ে, তবে বেইজিংয়ের পক্ষে ২০০৮ সালের মতো অবকাঠামো খাতে বিশাল প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
কারণ চীনের জনসংখ্যা ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে, নগরায়ণ ধীর হয়ে গেছে এবং আবাসন খাত মারাত্মক মন্দায় রয়েছে। চীন হয়তো তখন জাপানের নব্বইয়ের দশকের মতো দীর্ঘমেয়াদী মন্দার মুখোমুখি হবে, তবে চীনের মাথাপিছু আয় জাপানের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ।
চীনের এই অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা পুরো বিশ্বে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। চীন কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে দিলে ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, চিলি বা আফ্রিকার কঙ্গো ও অ্যাঙ্গোলার মতো দেশগুলো, যারা তাদের মোট রপ্তানির বড় অংশ চীনে পাঠায়, তারা মারাত্মক বিপদে পড়বে। এছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ঋণ দেওয়া বন্ধ বা পুনরুদ্ধারের চাপে পাকিস্তান, ইকুয়েডর, জাম্বিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সার্বভৌম খেলাপি বা ঋণ সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১১০ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায়, ২০০৮ সালের মতো নতুন কোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার ক্ষমতা সরকারগুলোর থাকবে না।এই বিপর্যয় এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একটি পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ও সমন্বিত অর্থনৈতিক ভারসাম্য স্থাপন করা, যা ১৯৮৫ সালের ‘প্লাজা অ্যাকর্ড’-এর আদলে হতে পারে।

বেইজিংকে তাদের মুদ্রার মান বৃদ্ধি করা, ভর্তুকি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে হবে এবং অন্যান্য দেশগুলোকে সাথে নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি-২০ সম্মেলনই বেইজিংয়ের এই অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ। যদি বেইজিং এই সংস্কার এড়িয়ে চলে, তবে চীনে তৈরি হতে যাওয়া পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই এক অভূতপূর্ব ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।