পাঁচ বছর আগে এই আগস্টেই তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হয়েছিল। কাবুল বিমানবন্দরে মানুষের ঢল, কাঁটাতারের ওপর দিয়ে শিশুদের তুলে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা কিংবা উড়ন্ত বিমানের গায়ে মানুষের ঝুলে থাকার দৃশ্য আজও আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতার চিত্র আর বিমানবন্দরের সেই দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এবার তার প্রভাব পড়ছে আরও নীরব, অথচ ভয়াবহ জায়গায়—স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। মার্কিন সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে আফগান নারী ও শিশুদের জীবন যে ঝুঁকির মুখে পড়েছে, সেটিই সামনে এনেছেন প্রিয়ালি সুর ও হার্ডিন ল্যাং তাদের ১৮ আগস্ট ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধে।
লেখকদের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি সহায়তা কাটছাঁটের সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। অথচ ২০২৫ সালের মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, সহায়তা কমানোর কারণে কেউ মারা যায়নি। এমনকি তিনি কংগ্রেসে বলেছিলেন, তার দায়িত্বে কোনো শিশু মারা যাচ্ছে না। কিন্তু রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের ছয় মাসের তদন্ত সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ৩০টিতে কর্মরত ৫৫৫ জন সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর জরিপ চালানো হয়। তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ ছিলেন ধাত্রী। পাশাপাশি ছয়টি প্রদেশের ৩২০টির বেশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মৃত্যুর তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্যগুলো আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার ছবি তুলে ধরে। সহায়তা কমে যাওয়ার পর কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গর্ভবতী নারীরা সময়মতো চিকিৎসা পাননি। কোথাও দক্ষ চিকিৎসকের অভাবে গর্ভেই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আবার কোথাও অক্সিজেনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নবজাতক ও শিশু মারা গেছে। অর্থাৎ এখানে মৃত্যুর কারণ শুধু যুদ্ধ, দারিদ্র্য বা রোগ নয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা নাগালের বাইরে চলে যাওয়াই মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন আফগানিস্তানের জন্য ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা বন্ধ বা স্থগিত করে। এর মধ্যে প্রায় ৭৩৬ মিলিয়ন ডলার ছিল মানবিক সহায়তা। এটি আফগানিস্তানের মোট বৈদেশিক সহায়তার প্রায় অর্ধেক। এর প্রভাবও দ্রুত দেখা দেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দেশটির ৪২০টির বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত হয়। এর ফলে ৩০ লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশে এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। দীর্ঘ যুদ্ধ দেশটির অবকাঠামো দুর্বল করেছে। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও রয়েছে। ফলে বিদেশি সহায়তা অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছিল। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি ভবনের দরজা বন্ধ হওয়া নয়। এর অর্থ হলো আশপাশের মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ হারিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে প্রসূতি নারী, নবজাতক এবং গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
হাসপাতালগুলোর তথ্য সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে পরিণত হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছে। হেরাতে ২০২৫ সালের পর মাতৃমৃত্যু পাঁচ গুণ বেড়েছে। নানগারহারে ২০২৫ সালে নবজাতকের মৃত্যুহার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কুনারে শ্বাসরোধজনিত নবজাতকের মৃত্যু বেড়েছে ১৫৬ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান দেখায়, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অর্থায়ন বন্ধের প্রভাব কতটা সরাসরি মানুষের জীবনে পড়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরে। জরিপে অন্তত ১৬১টি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৮০ জন মা, ৩০ জন নবজাতক, ১৪ জন শিশু এবং ২৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে দুজন এমন একজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন, যিনি সহায়তা কমে যাওয়ার পর চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন। আরও তিনজনের মধ্যে দুজন এমন রোগীর কথা জানতেন, যিনি চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছিলেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জালালাবাদের একটি অক্সিজেন প্ল্যান্টের ঘটনাটি এর বাস্তব উদাহরণ। ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে কাজ করা চিকিৎসক শাহ মোহাম্মদ জানান, সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহকারী প্ল্যান্টটি অচল হয়ে যায়। তার হিসাবে, এরপর হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ৩ থেকে ৪ শতাংশ সরাসরি এর কারণে মারা গেছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু এবং অক্সিজেন প্রয়োজন এমন নবজাতকরাও এর শিকার হয়েছে।
কাবুলের আহমাদ শাহ বাবা হাসপাতালের ঘটনাও একই বাস্তবতার প্রতিফলন। সহায়তা কমানোর আগে হাসপাতালের মাতৃসেবা ইউনিটে ৫২ জন ধাত্রী ছিলেন। পরে প্রায় ১০০টি প্রসব সামলানোর জন্য এক শিফটে মাত্র এক বা দুজন ধাত্রী অবশিষ্ট ছিলেন। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা এক নারীকে অন্যত্র পাঠাতে হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসা পাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। নিমরোজে যমজ সন্তানসম্ভবা এক নারীকে পরিবার নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ দেখতে পায়। পরে কয়েক ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেও কর্মীসংকটের কারণে চিকিৎসায় আরও বিলম্ব হয়। দুই ঘণ্টা পর ওই নারী মারা যান এবং তার দুই সন্তানও মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ আফগান নীতির একটি বড় বৈপরীত্যও সামনে আসে। দুই দশকে মার্কিন অর্থায়নে আফগানিস্তানে ৬০০টির বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বিপুলসংখ্যক ধাত্রীকে। তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র মৌলিক মাতৃ ও শিশুসেবা এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তা চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনেছে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, মানবিক সহায়তা বন্ধ রাখলে তালেবানকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি কমবে। কিন্তু এই নীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এর মূল্য কে দিচ্ছে? সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত রিনা আমিরির বক্তব্য অনুযায়ী, সহায়তা কাটছাঁট তালেবানের চেয়ে আফগান নারী ও মেয়েদের ওপর বেশি চাপ তৈরি করছে। তালেবান শাসনে নারীরা এমনিতেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে নানা বিধিনিষেধের মুখে। স্বাস্থ্য খাত ছিল তাদের কাজ করার শেষ কয়েকটি ক্ষেত্রের একটি। একই সঙ্গে নারী রোগীদের নারী স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও ছিল।
এটি শুধু স্বাস্থ্য সহায়তার প্রশ্ন নয়; যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আফগানদের আস্থার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত। মার্কিন বাহিনী ও কূটনীতিকদের সঙ্গে কাজ করা ৭০ হাজারের বেশি আফগানকে যুক্তরাষ্ট্র সরিয়ে নিয়েছিল। তাদের মানবিক পারোল দেওয়া হয়েছিল এবং স্থায়ী মর্যাদা পাওয়ার পথের প্রতিশ্রুতিও ছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই নীতিতেও পরিবর্তন আনে। আফগানদের মানবিক পারোল ও সাময়িক সুরক্ষার ব্যবস্থা শেষ করা হয়। কিছু আফগানকে তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে এবং কেউ কেউ তালেবানের হাতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
তবে আফগানিস্তানের বর্তমান সংকটের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা যায় না। দীর্ঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, তালেবানের কঠোর শাসন এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা—সবই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। কিন্তু ফরেন পলিসির বিশ্লেষণের মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন মার্কিন অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই অর্থায়ন হঠাৎ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কি আরও বড় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে? বিশেষ করে যখন এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে, তখন রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য মানবিক সহায়তা বন্ধ করার নীতি কতটা কার্যকর বা নৈতিক—সেটিই বড় প্রশ্ন।
এই মৃত্যুগুলোর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—অনেকগুলোই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকলে কোনো নারী হয়তো সময়মতো চিকিৎসা পেতেন। একজন প্রশিক্ষিত ধাত্রী থাকলে কোনো প্রসবের পরিণতি অন্যরকম হতে পারত। অক্সিজেন সরবরাহ চালু থাকলে কোনো নবজাতক হয়তো বেঁচে যেত। তাই এসব মৃত্যু শুধু আফগানিস্তানের দারিদ্র্য বা যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি নয়। এর কিছু অংশ স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখার মাধ্যমে ঠেকানো সম্ভব ছিল।
কাবুল পতনের পাঁচ বছর পর তাই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার চেহারা বদলে গেছে। এবার তা বিমানবন্দরের বিশৃঙ্খলায় নয়, হাসপাতালের শয্যায়, বন্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, অক্সিজেনের অভাবে এবং চিকিৎসা না পাওয়া মায়ের মৃত্যুর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। লেখকদের মতে, পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ এখনো রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ধাত্রী প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল ও অক্সিজেন প্ল্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির অর্থায়ন পুনরায় চালু করতে পারে। কংগ্রেসও লক্ষ্যভিত্তিক মানবিক ও স্বাস্থ্য সহায়তা ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে সহায়তা কাটছাঁটের কারণে মৃত্যুর ঘটনা পদ্ধতিগতভাবে নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
হারিয়ে যাওয়া জীবন আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া বা না দেওয়ার নয়; প্রশ্ন হলো, তালেবানবিরোধী নীতির মূল্য কেন আফগান নারী ও শিশুদের জীবন দিয়ে দিতে হবে? দুই দশক ধরে যে জনগোষ্ঠীর পাশে থাকার দাবি করেছে ওয়াশিংটন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর পর সেই জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া শেষ পর্যন্ত মার্কিন নীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।