কাবুলের সরকারি চত্বরের ফরেন মিনিস্ট্রি রোডের ক্যাফেগুলো থেকে একসময় আফগান পপ গানের সুর ভেসে আসত। সরকারি কর্মকর্তা ও পথচারীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকত সেই সড়ক। আজ সেখানে কোনো সুর নেই। দেশটিতে গানবাজনা এখন নিষিদ্ধ।
রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী সালওয়ার-কামিজ পরা, লম্বা দাড়িওয়ালা পুরুষদের দ্রুত পায়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। যেখানে একসময় রঙিন দেয়ালচিত্র ছিল, সেখানে এখন দারি ভাষায় লেখা বিশাল এক স্লোগান: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক তালেবান যোদ্ধা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সাঁজোয়া যান ‘হামভি’র ওপর বসে অলস ভঙ্গিতে ভারী মেশিনগান হাতে নিচের যান চলাচল তদারকি করছে।
১৫ আগস্ট আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে চলা যুদ্ধের পর ২০২১ সালে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সমর্থিত সরকার পিছু হটলে তালেবানরা ফের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার নেপথ্যে থাকা আল-কায়দাকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে তালেবানের প্রথম সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে তালেবানের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়েই।
তালেবান শাসকদের ভয়ে অনেক সাধারণ মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। ছবি: রয়টার্স
পশ্চিমের হেরাত থেকে দক্ষিণের কান্দাহার কিংবা পূর্বের কাবুল পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটার পথের যাত্রায় সর্বত্রই এখন তালেবানের সাদা-কালো পতাকার আধিপত্য। যুদ্ধের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার পর সাধারণ আফগানরা এই শান্তিকে স্বাগত জানিয়েছিল। যেসব শহর একসময় আত্মঘাতী হামলায় কেঁপে উঠত, সেখানে এখন নীরবতা। সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তার ভাষায়, “টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কাবুলে পাখিরা ফিরে এসেছে।”
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে এই শান্তি স্বস্তিকর নয়। কাবুলে কয়েকটি দেশের দূতাবাস থাকলেও তালেবানদের ‘ইসলামিক আমিরাত’ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে একমাত্র রাশিয়া। যদিও তালেবানরা আজ সফলভাবে কর ব্যবস্থা, সীমান্ত ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, কিন্তু তাদের মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় দেশটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে, ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের ওপর শিক্ষার অমানবিক নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে তালেবানকে আরও বেশি একঘরে করে ফেলেছে।
১৯৯০-এর দশকের তুলনায় তালেবানরা এখন অপেক্ষাকৃত কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তখনকার নেতাদের অভিজ্ঞতা ছিল কেবল দক্ষিণাঞ্চলীয় পশতুন গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান নেতাদের অনেকেই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোসহ বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
তা সত্ত্বেও দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টানার সুযোগ প্রায় শূন্য। এর ওপর তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা আমির হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ক্ষমতার সর্বময় কর্তৃত্ব নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন। তিনি অপেক্ষাকৃত উদার কাবুল থেকে নয়, বরং কান্দাহার থেকে সরকার পরিচালনা করেন। তালেবানের অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডেও তিনি চরমপন্থী হিসেবে পরিচিত।
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নিজের অনুগত একটি বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছেন। ছবি: রয়টার্স
কয়েক দশকের যুদ্ধের পর অর্জিত এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আখুন্দজাদার নীতি ৪ কোটি ৫০ লাখ আফগানের (যাদের দুই-তৃতীয়াংশেরই জন্ম ২০০১ সালের পর) জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা দিতে পারছে না। দেশের ভেতরে মানুষের (বিশেষত নারী) স্বাধীনতার পরিসর আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত করা হয়েছে।
তবে শাসনব্যবস্থায় তালেবানের কিছু প্রশাসনিক সক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়। তারা পূর্ববর্তী আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ ধরে রাখতে পেরেছে এবং কর, সীমান্ত ও শুল্কসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো চালু রেখেছে (যদিও দাপ্তরিক কাজে স্মার্টফোনের ব্যবহার সম্প্রতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে)। পূর্ববর্তী সরকারের প্রায় অর্ধেক আমলা এখনো স্বপদে বহাল আছেন। এই প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্থানীয় মুদ্রা ‘আফগানি’র মান ধরে রাখতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, তালেবান সরকার বর্তমানে শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার রাজস্ব আদায় করছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি। মূলত কর আদায়ে কড়াকড়ি এবং নিচু স্তরের চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও বৈদেশিক সহায়তার বড় ধরনের শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ২০২০ সালে দেশটিতে বার্ষিক মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২০ কোটি ডলারে, যা দিন দিন আরও কমছে। ফলে দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়। সরকার তার মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক অর্থ নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করায় স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক খাতে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরও তালেবান প্রশাসন নিজেদের একটি ‘জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে’ রয়েছে বলে বিবেচনা করে। তবে এই নিরাপত্তা কৌশলের ফলে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টাল-এর মতে, গত বছর সেখানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা একশরও কম। আল-কায়দা তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে এবং তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট খোরসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি)-কে কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। কিছু সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন হামলা চালালেও সেগুলো সরকারের জন্য বড় কোনো হুমকি হয়ে উঠতে পারেনি।
অবশ্য সীমান্ত নিরাপত্তা ও পাকিস্তান সীমান্তে ‘টিটিপির’ (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) উপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। পাকিস্তান মাঝে মাঝেই আফগান সীমান্তে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে এবং সীমান্ত রুটগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে আফগানিস্তানে খাদ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে এবং রপ্তানি ও স্বাস্থ্যসেবার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
অতীতে যেসব সহিংসতা তালেবানরা নিজেরা ঘটাত, এখন সেই সংঘাতের অবসান ঘটেছে। এর ফলে অর্জিত শান্তি আফগানদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু স্বস্তি এনেছে। কৃষকরা পণ্য নিয়ে বাজারে যেতে পারছেন, পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারছেন এবং ছেলেরা স্কুলে যেতে পারছে।
তবে এই নিরাপত্তা অর্জিত হয়েছে কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে। যেকোনো প্রকাশ্য অসন্তোষ নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। সম্প্রতি হেরাতে ‘সদাচার প্রসার ও পাপ প্রতিরোধ’ মন্ত্রণালয়ের কঠোর নিয়মের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত নারীদের ওপর চড়াও হয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলন দমন করে এবং এক কিশোরীকে গুলি করে হত্যা করে।
অন্যদিকে, সরকারের রাজস্বের বাকি অংশ মূলত সড়ক নেটওয়ার্ক ও ধর্মীয় অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় করা হচ্ছে। কান্দাহার থেকে কাবুল পর্যন্ত হাইওয়ে পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রতি ৭০ কিলোমিটার অন্তর নতুন মসজিদ বানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাবুলে ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন খাত কিছুটা গতি পেলেও বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ধীর।
তবে এসবের বিপরীতে অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশটির মাথাপিছু জিডিপি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) অনুযায়ী দাঁড়িয়েছে মাত্র ২,৩০০ ডলারে, যা ২০০০-এর দশকের মাঝের অবস্থার সমতুল্য। গৃহযুদ্ধকবলিত সাব-সাহারান আফ্রিকার কয়েকটি দেশের পরেই আফগানিস্তানের অবস্থান। দেশটির বিরাট সংখ্যক মানুষ তীব্র খাদ্য ও পানি সংকটে ভুগছে।
আফগানিস্তানে নারী স্বাধীনতার পরিসর আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিবেশী ইরান ও পাকিস্তান থেকে বাধ্য হয়ে ফিরে আসা প্রায় ৬০ লাখ আফগান শরণার্থীর অতিরিক্ত চাপ। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে। নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ করায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আফগান চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এমনকি অনেক তালেবান সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধী হলেও শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তাদের নেই।
অনেক জায়গায় সাধারণ পরিবারগুলো মাদ্রাসা বা বিকল্প উপায়ে মেয়েদের কিছু প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করলেও উচ্চশিক্ষার পথ পুরোপুরি বন্ধ। কাবুলের একটি বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া ১৬-১৭ বছরের শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেলেও ভবিষ্যতে তা কাজে লাগানোর মতো কোনো ক্যারিয়ার বা ক্ষেত্র তাদের সামনে খোলা নেই।
শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতার এই ধ্বংসস্তূপের কেন্দ্রে রয়েছেন কান্দাহারে অবস্থানরত আমির আখুন্দজাদা। তিনি এক চরমপন্থী ধর্মীয় ভাবধারার শরিয়া আইন চাপিয়ে দিয়েছেন, যা বৈশ্বিক মুসলিম বিশ্বের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তার মতে, আধুনিক শিক্ষা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ আফগানদের ধর্মীয় পথ থেকে বিচ্যুত করে। কান্দাহারের এই শাসনগোষ্ঠী মনে করে, আন্তর্জাতিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং কঠোর নিয়ম জারি রাখাই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি। ক্ষমতার শীর্ষস্তরে থাকা এই আমিরের একক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রয়েছে নিজস্ব রক্ষীবাহিনী এবং ‘সদাচার প্রসার ও পাপ প্রতিরোধ’ পুলিশ। কাবুলের তুলনামূলক মডারেট বা বাস্তববাদী তালেবান নেতারা, যারা একসময় উপদলীয় প্রভাব খাটিয়ে নীতিতে পরিবর্তন আনবেন বলে আশা করা হয়েছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত আমিরের সিদ্ধান্তের সামনে নতি স্বীকার করেছেন।
ফলে তালেবান সরকারের এই একগুঁয়ে নীতি ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার মাশুল দিতে হচ্ছে আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণকে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে নারী চিকিৎসকদের ওপর বিধিনিষেধের ফলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। দাতব্য সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বেশ কিছু অঞ্চলে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার এক বছরের ব্যবধানে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
এ ছাড়া চরম মেধা পাচার (ব্রেইন ড্রেন) এবং জীবন বাঁচাতে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দেশ ত্যাগের প্রবণতা আফগানিস্তানকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্জিত শান্তিকে আফগানরা ইতিবাচকভাবে দেখলেও, সমৃদ্ধি এবং মৌলিক অধিকারহীন একটি জীবন তাদের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাঁচ বছর পর আজ আফগানদের একটিই প্রশ্ন–এই স্তব্ধতার শেষ কোথায়?
(ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত)