যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাত বৃদ্ধি করে তবে ইরান ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানোর কথা বিবেচনা করছে।
তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর ভেতরের সূত্রের বরাত দিয়ে লন্ডনের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
জানা গেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সাথে একটি নতুন করে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়াকে ইরানি নীতি নির্ধারকেরা এখন অবধারিত বলেই মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের উত্তাপ ও ঝুঁকি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিরোধ কৌশল পুনর্নির্ধারণ করছে ইরান। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের প্রশাসনের সাথে যুক্ত দুজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন যে ইরানি বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর আঘাত হানার সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে।
বিশেষ করে বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি নজরদারিতে রয়েছে। দেশটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে রিফুয়েলিং বা বিমান জ্বালানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে বেজমির বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
এছাড়া সাইপ্রাসও ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার তালিকায় অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একটি বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল স্থলভিত্তিক সামরিক ঘাঁটিতেই নয়, বরং হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রের তলদেশে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও হামলা চালানোর পরিকল্পনা খতিয়ে দেখছে ইরান।
তেহরানের শক্ত অবস্থানের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দেশটির শাসনব্যবস্থার ভেতরের কট্টরপন্থী অংশের মনোভাব। যারা বিশ্বাস করে মার্কিনদের সাথে আর কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা বাকি নেই।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল তা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সম্প্রতি দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক পদগুলোতে কট্টরপন্থি ব্যক্তিদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, যা যুদ্ধমুখী নীতির দিকে তেহরানের স্পষ্ট যাত্রার বার্তা দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরানের সাথে কোনো আলোচনা বা বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে করারও কোনো পরিকল্পনাও নেই।
এই পরিস্থিতিতে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এবং অন্যান্য সামরিক কমান্ডাররা প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হলে ইরান কেবল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদ, জ্বালানি অবকাঠামো ও আঞ্চলিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ক্ষান্ত হবে না, বরং দূরবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানতে পিছপা হবে না।
যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা শক্তির প্রতি ইরানের তীব্র সতর্কবার্তার বিষয়টিও এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যেসব ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ভূখণ্ডে বা তার স্বার্থের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ পরিচালনা করবে, সেসব ঘাঁটিকে মধ্যপ্রাচ্যে বা ইউরোপে যেখানেই অবস্থিত হোক না কেন, বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট বা আরইউএসআই-এর গবেষণাবিদ সিদ্ধার্থ কৌশলের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ কৌশল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সম্পদের প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার হুমকি একেবারে অবান্তর বা কল্পনাপ্রসূত নয়, তবে এই সক্ষমতার কিছুটা বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তেহরান তাদের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানার জন্য মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যেমন শাহাব সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘ দূরত্বে নিখুঁত আঘাত হানা কিংবা বিধ্বংসী ক্ষতিসাধন করার ক্ষেত্রে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। তা সত্ত্বেও ইরানের এই হুমকি আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরানের পাল্টা আঘাতের পরিধি এবং তীব্রতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে ওয়াশিংটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপর ওপর। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, তেহরানের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে যে, ট্রাম্প যদি পূর্বে দেওয়া হুমকি বাস্তবায়ন করে ইরানের অভ্যন্তরীণ সেতু বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোগুলোতে ধ্বংস করেন, তবে সংঘাতকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ইরান ইতিমধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় সূত্রটি নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন আগ্রাসন যদি চরম সীমায় পৌঁছায় তবে ইরান তার প্রতিক্রিয়ায় কোনো বাধ্যবাধকতা বা সীমারেখা মানবে না।
তাদের স্পষ্ট কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি সীমা অতিক্রম করে তবে ইরান যেকোনো মূল্যে আত্মরক্ষা করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলের মার্কিন স্বার্থে সরাসরি আঘাত হানবে। ইরান যে অনেক দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম, তার প্রমাণ তারা অতীতেও দিয়েছে। বিশেষ করে এই বছরের শুরুতে ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরের মার্কিন-যুক্তরাজ্য যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ এনেছিল।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, তুর্কি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছিল যে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়।
এর পাশাপাশি একই সময়ে সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে যুক্তরাজ্যের সামরিক বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালায় ইরানের সমর্থিত আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনী। মার্কিন ও পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্তাদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান ইতিমধ্যে সংকেত পাঠিয়েছে যে তারা কেবল নিজ অঞ্চলের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। সম্প্রতি জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের সুনির্দিষ্ট হামলাটি ছিল তেহরানের দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে নিখুঁত প্রদর্শনী, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি প্রত্যক্ষ সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরান বার্তা দিতে চেয়েছে যে ইউরোপের সামরিক স্থাপনাগুলো তাদের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের বাইরে নয়, তাই সংঘাতের বিষয়ে তাদের অবস্থান সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত।
কূটনৈতিক পর্যালোচনায় ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক জাহাজ আক্রমণ ও পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের কারণে সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে।
উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, যার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন অবরোধ পুনরায় জোরদার হয়েছে। দীর্ঘ কূটনৈতিক চেষ্টার পরও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ সচল রাখা বা যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, যা ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও হতাশ ও উত্তেজিত করে তুলেছে।
সামরিক বিশ্লেষক কৌশল এটিও উল্লেখ করেছেন যে, ইরান যদি তাদের ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহার করতে চায়, তবে সেগুলোর পাল্লা বাড়াতে বিস্ফোরকের ওজন অনেক কমাতে হবে, যার ফলে বিস্ফোরণের ক্ষতি হবে তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই কারণে সরাসরি নিজস্ব ভূমি থেকে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র না ছুড়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রক্সি বাহিনী বা ছায়া সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা তেহরানের জন্য বেশি কৌশলগত ও লাভজনক হতে পারে।
অন্যান্য আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, দিয়েগো গার্সিয়ার মতো অত দূরের ঘাঁটিতে হামলা চালানোর চেষ্টা প্রমাণ করে ইরানের কাছে দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার বিপজ্জনক অস্ত্র রয়েছে।
তবে তারা বাস্তব ক্ষেত্রে কতটা নির্ভুলভাবে তা প্রয়োগ করতে পারবে বা ইউরোপের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য লাভ করা কঠিন হলেও, রাজনৈতিক বার্তা প্রদান বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির জন্য তারা সীমিত সংখ্যায় এগুলো ব্যবহার করতে পারে। একই সাথে তেহরানের নীতি নির্ধারকদের সবার মধ্যে এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সর্বসম্মত সমর্থন নেই। সরকারের ভেতরের অপেক্ষাকৃত নমনীয় বা বাস্তববাদী অংশ মনে করছে যে, ইরান হয়তো পরিস্থিতি মূল্যায়নে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিচ্ছে।
তবে বর্তমানে কট্টরপন্থীদের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে নমনীয় কূটনীতিকদের প্রভাব কমে গেছে এবং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তায় সামরিক বাহিনীর জেনারেল ও নীতি নির্ধারকদের প্রাধান্য স্পষ্টভাবে বেড়ে গেছে।
সর্বোপরি, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এই বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনটি এটিই স্পষ্ট করে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতার নতুন অধ্যায় উন্মোচন করছে।
তেহরান থেকে ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সাগরের নিচে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলে আঘাত হানার পরিকল্পনা এটিই প্রমাণ করে যে, সংকট আরও ঘনীভূত হলে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সামরিক অবস্থান এবং তেহরানের অনমনীয় প্রতিরোধ নীতির ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন না চাইতেও দুই পরাশক্তি ও সামরিক শক্তির মধ্যকার এই ভয়াবহ ছায়াযুদ্ধে সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।