ইরান যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা আরও ফিকে হয়ে আসার মধ্যে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতিরা জাহাজ চলাচলে পৃথক হামলার খবর জানিয়েছে। অন্যদিকে তেহরান বলেছে, ওয়াশিংটন তাদের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
বিশ্বের তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রবেশপথ—হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়া ওমান উপসাগর এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে এই হামলা হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার শিগগিরই চুক্তি হওয়ার কথা বললেও যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে হতাশা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৯১ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৩ দশমিক ২০ ডলারে লেনদেন শেষ হয়েছে।
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে মঙ্গলবার একটি ছোট কার্গো জাহাজে হুতিদের সন্দেহভাজন হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন বলে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। হুতিবিরোধী একটি সামরিক গোষ্ঠীর দুই ইয়েমেনি উদ্ধারকর্মীও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কোস্টগার্ড।
মিশরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ জাহাজে হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত হলে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের হামলায় জাহাজ চলাচলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।হুতিদের পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, গত মাসে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়া গোষ্ঠীটি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। হুতিরা দাবি করেছে, জাহাজটিতে সামরিক সরঞ্জাম ছিল। তবে তারা জাহাজটির নাম জানায়নি এবং এ বিষয়ে সৌদি আরবের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অচল করতে আমেরিকান নৌবাহিনীর একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ লঙ্ঘন বন্ধ করতে দেওয়া একাধিক সতর্কবার্তা জাহাজটি উপেক্ষা করেছিল। সামুদ্রিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পাকিস্তানের উপকূলের কাছে ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়।
বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য তীব্র
গত দুই দিনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই তাদের বক্তব্য আরও কঠোর করেছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই মঙ্গলবার বলেছেন, যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ইরানের শর্তের মধ্যে রয়েছে দেশটির জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলের সংঘাতের অবসান।
এর এক দিন আগে সোমবার ট্রাম্প নতুন করে দাবি করেন, গত ৫০ বছরের যুদ্ধ, হামলা ও বিক্ষোভে নিহতদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সংঘাতজুড়ে ট্রাম্প কখনো উত্তেজনা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো বলেছেন শান্তিচুক্তি আসন্ন।
সোমবার রাতে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন চলতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হতে দিয়ে তিনি হয়তো শুধু চলতে দেবেন, অথবা তাদের ওপর খুব, খুব কঠোর আঘাত হানবেন।’’
রিয়েল আমেরিকাস ভয়েসকে ট্রাম্প বলেন, “আমি এক ধরনের আলোচনা করছি। তারা খুব ধূর্ত আলোচক।”
মঙ্গলবার ওহাইও সফরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “ইরান ভালোই চলছে, একেবারেই ভালো চলছে।”
তিনি বলেন, “আমরা পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করি... আর কেউ নয়, শুধু আমরা।”
ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “কোনো একসময় হয়তো তারা কিছু করবে এবং তখন তাদের উড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এখন আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “৫০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে দেশটি দাদাগিরি করেছে, ভেবে দেখলে ৫১ বছর, তারা আর মধ্যপ্রাচ্যের দাদাগিরি করছে না।”
গত মাসে ইরানের সম্ভাব্য হত্যার হুমকির খবরের কারণে তুরস্কে বিমান বদলের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, বিকল্প বিমানটিই হয়তো বেশি ঝুঁকিতে ছিল।
ওয়াশিংটন পোস্ট তার গোপন সামরিক ফ্লাইটের খবর প্রকাশ করার পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয়, ওই বিমানটিকেই বেশি লক্ষ্য করার সম্ভাবনা ছিল।”
ওই অভিযানে এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহার না করে খাবারের ট্রাকে করে ট্রাম্পকে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে গোপনে নেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প আরও বলেন, “যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্টের জন্য অনেক হুমকি থাকে। আমি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করি না।”
এদিকে আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি রেজাইকে উদ্ধৃত করে বলেছে, “আমেরিকা যতক্ষণ পর্যন্ত তার আচরণ পরিবর্তন না করবে এবং ইরানের শর্ত মেনে না নেবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।”
ইরানের সর্বশেষ বক্তব্যের বিষয়ে ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে চলমান সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) কমান্ডারের এক উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, বাহিনীটি শত্রুর ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর সক্ষমতা তৈরি করছে।
তিনি বলেন, “যখনই প্রয়োজন হবে এবং নির্দেশ দেওয়া হবে, তখন অভিযান শত্রুর ভূখণ্ডে নিয়ে যেতে সক্ষম হতে হবে। এটিই আক্রমণাত্মক সামরিক নীতির বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের অর্জন করতে হবে।”