২০০৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দল যখন প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল, তখন সেটিকে বিবেচনা করা হচ্ছিল ডেভিড ও গোলিয়াথের লড়াই হিসেবে। বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলে তখন তারকার হাট, আর টেস্ট ক্রিকেটে হাঁটি হাঁটি পা করা বাংলাদেশ লাল বলের ক্রিকেটে শিক্ষানবিশ এক দল। সিরিজ শুরুর আগে ক্রিকেট দুনিয়ায় তোলপাড় ফেলে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডেভিড হুকস কটাক্ষ করেন বাংলাদেশের সামর্থ্য নিয়ে। অস্ট্রেলিয়াকে বাতলে দেন এক দিনের মধ্যেই টেস্ট জেতার কৌশল। দেশটিতে বাংলাদেশের আরেকটি টেস্ট সিরিজের আগে ঘুরেফিরে তাই চলে আসছে হুকসের সেই ঐতিহাসিক সমালোচনা। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাস্তবতা এত বছর পরও আটকে আছে স্রেফ ভালো খেলার মানদণ্ডেই।
দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শুরুতেই সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বাংলাদেশ কেমন খেললে তারা খুশি হবেন। উত্তরটা ‘ভালো খেলা’ আসতেই তিনি হেসে ফেলেন। এরপর নাজমুল ইতিবাচক ক্রিকেট খেলার কথা বলেন। তবে ২৩ বছরে এত এত পরিবর্তনের পরও তিনি জোর দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তাদেরই হারানোর কথা বলতে পারেননি। অথচ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে চলছে ভাটার টান। এমন সময়েও বাংলাদেশ কেন জেতার চিন্তা করতে পারছে না, সেটা বিস্ময়করই।
হুকস যখন বাংলাদেশের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তা খুব একটা ভুলও ছিল না। ম্যাচের পর ম্যাচ ইনিংস ব্যবধানে হেরে যাওয়া বাংলাদেশকে যে স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দেবে, এটা নিয়ে সংশয় ছিল না খেলোয়াড়দেরও। তবে কিছুটা লড়াইয়ের বাসনা ছিল তাদের মাঝে। হুকসের থিওরিকে ভুল প্রমাণ করে দুটি টেস্ট বাংলাদেশ নিতে পেরেছিল যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ দিনে। ইনিংস ব্যবধানে হারলেও সেটাই ছিল সেই সিরিজের ‘জয়’।
তবে এই ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশ দল কি এভাবে চিন্তা করতে পারে বা স্বান্তনা খুঁজতে পারে? অবশ্যই নয়। বিশেষ করে মাসখানেক আগে পাকিস্তানকে ঘরের মাটিতে ধবলধোলাই করার পর নাজমুলের দলকে নিয়ে লাল বলের ক্রিকেটে প্রত্যাশা যে আরও বেশি। গোটা সিরিজ থেকে নাহিদ রানার ছিটকে যাওয়া বড় এক ধাক্কা হলেও, সেটা রাতারাতি বাংলাদেশকে নবিশ দল বানিয়ে দিতে পারে না।
সমস্যা হল, মহা গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজের আগে সেরা অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েতে ভুলে ভরা এই সফরে নাহিদের সঙ্গে চোটে পড়েন বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলামও। তিনি অবশ্য দ্বিতীয় টেস্ট খেলবেন। তবে প্রথম ম্যাচে এই দুজন না থাকায় পেস বোলিংয়ের ধার কমে গেছে অনেকটাই। তৃতীয় পেসার সংকটে অবস্থা এতোটাই বেহাল যে, টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা মুসফিক হাসান এবং ছন্দহীন ইবাদত হোসেনকে নিতে হয়েছে দলে। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে ম্যাচে ২০ উইকেট নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ তাই অনেকটাই বর্তাবে তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও সম্ভবত খালেদ আহমেদদের ওপর।
অধিনায়ক নাজমুল অবশ্য দেশ ছাড়ার আগে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, যারা আছেন তারা ২০ উইকেট নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে বাস্তবতা বলছে, ডারউইনের অনেকটাই বাংলাদেশের কাছাকাছি কন্ডিশনেও কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে বোলারদের। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে এক হাসান বাদে কেউই পারেননি প্রভাব বিস্তার করতে। ইবাদত ও মুসফিকের বোলিং দেখে মনে হয়েছে, তারা বুঝি নেট অনুশীলনে বোলিং করছেন।
মড়ার ওপর খরার ঘা হয়ে এসেছে বিশেষজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলামের চোট। যদিও প্রথম ম্যাচে তার খেলা নিয়ে নেই সংশয়। তবে প্রস্তুতির ঘাটতি প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলার আগে তাকে সমস্যায় ফেলতে পারে। দলের অন্য স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ ব্যাট হাতে প্রস্তুতি ম্যাচে শতক হাঁকিয়ে ভালো কিছুর আভাস দিয়েছেন।
বাদ রইল ব্যাটিং অর্ডার এবং কিপিং। সাদমান ইসলাম ও তানজিদ হাসানের প্রথম টেস্ট খেলা প্রায় নিশ্চিত। এর মধ্যে তানজিদ ক্যারিয়ারে খেলেছেনই মাত্র দুটি টেস্ট। তবে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারণেই প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জস হ্যাজেলউডদের সামনে তিনি রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আরেক ওপেনার সৌম্য প্রস্তুতি ম্যাচে আট ও চার নম্বর পজিশনে ব্যাট করে বলার মত কিছুই করতে পারেননি।
তিন, চার ও পাঁচে মুমিনুল হক, নাজমুল ও মুশফিকুর রহিমই ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ভালো কিছু করতে পারার অনেকটাই নির্ভর করছে এই তিন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের ওপর। তবে প্রস্তুতি ম্যাচের দুই ইনিংসেই তাদের ব্যর্থতা এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়া দলের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে।
আর ছয়ে সব ঠিক থাকলে থাকছেন লিটন দাসই। গত জুন থেকে মাঠের বাইরে থাকা এই ক্রিকেটার নাটকীয়ভাবে শেষ মুহূর্তে যুক্ত হয়েছেন প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে। প্রস্তুতি ম্যাচ না খেললেও তাকে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী দল। ব্যাটিং ও কিপিং দুটিই তিনি করছেন সমানতালে।
ফলে বাংলাদেশের একাদশ দাঁড়াচ্ছে ছয় ব্যাটসম্যান, দুই স্পিনার এবং তিন পেসারের। নাহিদ ও শরীফুল না থাকলেও সম্ভাব্য সেরা দল নিয়েই তাই মাঠে নামছে সফরকারীরা। জয়ের দেখা না পেলেও অস্ট্রেলিয়াকে অন্তত সমানে সমান লড়াই উপহার দেওয়ার রসদ আছে দলে। প্রয়োজন মাঠে সেটা করে দেখানোর।
হুকসের কটাক্ষের জবাব প্রায় দুই যুগ আগে বাংলাদেশ দিয়েছিল টেস্ট ম্যাচকে একদিনের বেশি নিয়ে যেতে পেরে। এবার অবশ্য শুধু ভালো খেলে প্রশংসা কুড়ানোর বাস্তবতা নেই নাজমুলদের। নিজেদের প্রমাণ করার একমাত্র হাতিয়ার প্রতিপক্ষকে নাড়িয়ে দেওয়া, তাদের সম্মান আদায় করে নেওয়া এবং জয়ের লক্ষ্যে খেলা।
বাংলাদেশ কি পারবে ইতিহাস গড়তে? নাকি হারার আগেই হার মেনে লড়বে কেবল সম্মান রক্ষার জন্যই?