কিছুদিন আগেও বড় ঋণের খেলাপির হার বেশি থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের খেলাপি কম ছিল। তবে এই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) ঋণের মোট স্থিতি আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে। অর্থাৎ, ঋণ বিতরণ কমলেও খেলাপি বেড়েছে।
চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৬০টি তফসিলি ব্যাংক ও ৩০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিএমএসএমই অর্থায়ন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঋণের মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি এই খাতে নতুন অর্থায়নের প্রবাহও কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএমএসএমই ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের স্থিতি ছিল এর চেয়ে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। মোট ঋণের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের অংশ এখন ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকেই এসেছে প্রায় ৫২ শতাংশ ঋণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই খাতে ঋণ-মানও কমেছে। মার্চ প্রান্তিকে সিএমএসএমই ঋণের খেলাপির হার বেড়ে হয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক প্রান্তিকের ব্যবধানে সিএমএসএমই ঋণে খেলাপির হার প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএমএসএমই খাতকে অর্থনীতির কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। এই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়লেও যদি তার বড় অংশ ফেরত না আসে, তাহলে একদিকে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিও বাড়বে।
এই প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ চরচাকে বলেন, “সম্প্রতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর কারণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আয় ও নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর পড়ছে। এ কারণে ছোট ঋণে খেলাপির হার বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রাধিকার অনুযায়ী, সিএমএসএমই ঋণের বড় অংশই ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে যাচ্ছে। মোট বকেয়া ঋণের ৬৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ রয়েছে এসব উদ্যোক্তার হাতে। খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ গেছে সেবা খাতে। এর অংশ ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে উৎপাদন খাত। এই খাতে গেছে ৩৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর ব্যবসা খাতে গেছে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ।
নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নেও কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। মার্চ শেষে সিএমএসএমই ঋণের ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অংশ ছিল ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। জামানত ছাড়া অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। জামানতবিহীন ঋণসহ অন্যান্য ধরনের সিএমএসএমই অর্থায়ন মোট বকেয়া ঋণের ১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে পৌঁছেছে। নতুন উদ্যোক্তাদের দেওয়া ঋণের অংশ ছিল ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপির হার বেশি
প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী সিএমএসএমই ঋণ-মানেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি সিএমএসএমই ঋণের অনুপাত সবচেয়ে বেশি। এই খাতের ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ, এসব ব্যাংকের সিএমএসএমই ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশই খেলাপি।
নএরপরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের সিএমএসএমই ঋণে খেলাপির হার ৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ, রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংক–এই দুই শ্রেণির ব্যাংকেই সিএমএসএমই ঋণের বড় একটি অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সিএমএসএমই ঋণে খেলাপির হার তুলনামূলক কম। এসব ব্যাংকে এ ধরনের খেলাপি ঋণ আছে মোট ঋণের ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এ হার সবচেয়ে কম–মাত্র ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ ও ২২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, সিএমএসএমই খাতে সামগ্রিক শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও প্রতিষ্ঠানভেদে ঝুঁকির মাত্রায় বড় ব্যবধান রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এই হার ৪০ শতাংশের ওপরে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের সিএমএসএমই ঋণ-মান নিয়ে তুলনামূলক বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর জন্য কিছু নীতিমালা রয়েছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করি। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের যেসব নির্দেশনা দেবে, আমরা তা পালন করব। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে ঋণ বিতরণ করলে সেই ঋণ উঠে আসবে।”
আদায় বেড়েছে তবে…
চলতি বছরের প্রথম তিন মাস; অর্থাৎ, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার কথা ছিল। তবে এই সময়সীমার মধ্যে আদায় করা সম্ভব হয়েছে ৬৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, যতটা ফেরত আসার কথা ছিল, তার মধ্যে প্রায় ৫৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ ফেরত এসেছে।
ঋণ আদায়ের এই চিত্র আগের সময়ের সাথে তুলনা করলে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। গত বছর; অর্থাৎ, ২০২৫ সালের এই একই সময়ে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) ঋণ আদায়ের হার ছিল ৪২ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেই হিসাবে এবার আদায়ের গতি বেশ কিছুটা বেড়েছে।
তবে আবার ঠিক আগের তিন মাসের (২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক বা ডিসেম্বর পর্যন্ত) হারের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় আদায় কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো বছরের হিসাবে দেখা যায়, ঋণ আদায়ের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সেখান থেকে নতুন বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসে আদায় কিছুটা কমে ৫৫ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, ঋণ আদায় শেষ তিন মাসে কিছুটা কমেছে।
তবে এই খাতে ঋণ আদায় ও খেলাপির মধ্যেও একটা আলাদা চিত্র পাওয়া গেছে। দেখা যায়, কিছু ‘ভালো উদ্যোক্তা’ ব্যাংকে গিয়ে ঋণ পান না। আবার কিছু ‘খারাপ উদ্যোক্তা’ বারবার ঋণ নেয় এবং খেলাপি হয়। তারপরও তাকে ঋণ দেওয়া হয়।
এমন একজন ভুক্তভোগী হলেন আনিসুর ইসলাম মাসুদ। তিনি চারচাকে বলেন, “আমার একটা ছোট খামার আছে। আমি এটাকে বড় করতে চাই। এর জন্য ব্যাংকে গিয়েছিলাম ঋণ নিতে। ব্যাংক আমার কাছে ১০ থেকে ১৫ রকমের কাগজ চায়। আমি এতগুলো কাগজ জোগাড় করে ঋণ নিতে চাই না।”
এই উদ্যোক্তা আরও দাবি করেন, “আমার চোখে দেখা কিছু মানুষ আছে, তারা ঋণ নিচ্ছে, কিন্তু শোধ করতে পারছে না, বা করছে না। তারপরও ব্যাংক তাকে ঋণ দিচ্ছে। আর আমার মতো অনেক ছেলে আছে, যারা ঋণ নিতে পারছে না। সরকার এক্ষেত্রে ব্যর্থ।”