মাইক শব্দটি কানে এলেই মাথায় আসে একটি নাম। ‘কল-রেডী’। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নামটি। জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এই ‘কল-রেডী’।
রাজধানীর পুরান ঢাকার ৩৬ ঋষিকেশ দাস লেনে কল-রেডীর প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ত্বই আর অবশিষ্ট নেই। কালো কালিতে ঢেকে দেওয়া সাইনবোর্ডে জমেছে ধুলোর আস্তর। নামানো শাটারে তালা লাগানো হয়েছে এমনভাবে, দেখে মনে হবে, যেন সিলগালা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে পুরোপুরি বন্ধ আছে ঐতিহাসিক মাইক সার্ভিস ও সাউন্ড পরিষেবা কার্যক্রম। তারপর থেকে এভাবেই তালা ঝুলছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্ণধার সাগর ঘোষ, রানা ঘোষ, বিশ্বনাথ ঘোষ ও শিবনাথ ঘোষ। ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনের নিচতলায় কল-রেডীর আদি কার্যালয়। সেখানেই থাকেন চার ভাই।
বাসার গেটে নক করলে ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কতদিন ধরে বন্ধ, জানতে চাইলে বিরক্তির সঙ্গে তিনি জানান, তিনি কিছু জানেন না। নিজের পরিচয় দেন রাজ। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও বলতে চাননি কোনো কথা। পরে স্থানীয়রা জানান, একটু আগে যার সঙ্গে কথা হলো, তিনিই রানা ঘোষ।
কেউ ক্যামেরায় কিছু বলতে চাইছে না। পাশেই একটি দোকানে বসে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা কিশোর চন্দ্র দে বলেন, অনেকদিন দিন ধরেই বন্ধ। শুনছি জুলাইয়ের পর থেকে আর খোলা হয়নি।
মো. আতাউজ্জামান চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, “৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই বন্ধ আছে। এইটুকুই জানি। দেখেন না তালা ঝুলছে!”
ভবনের নিচতলায় কল-রেডীর কার্যালয়ের পাশেই ৩০ বছর ধরে সুবর্ণা টেইলার্সের কার্যক্রম চালাচ্ছেন বিশ্বনাথ ঘোষ। তিনিও জানান, দুই বছর ধরে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ আছে কল-রেডী। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার কারও নম্বর চাইলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
নির্বাচনের সভা-সমাবেশে ‘কল–রেডী’র মাইক্রোফোনের সামনে অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিয়েছেন দেশবরেণ্য রাজনীতিকরা। ছবি: সংগৃহীত
পরে ফোন নম্বর জোগাড় করে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম স্বত্ত্বাধিকারী সাগর ঘোষকে ফোন করলে তিনি কথা বলতে চাননি। অনেক অনুরোধের পর তিনি প্রতিবেদককে শুধু বলেন, “এখন আপাতত বন্ধ আছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।”
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ১৯৪৮ সালে ‘আরজু লাইট হাউস’ নামে একটি দোকান চালু করেন দুই ভাই হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষ। কালের পরিক্রমায় তার নাম হয়ে যায় কল-রেডী। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সভা-সমাবেশে ‘কল-রেডী’র মাইক্রোফোনের সামনে অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিয়েছেন দেশবরেণ্য রাজনীতিকরা। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ কল-রেডীর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’